বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিনটি আধুনিক চাকমা কবিতা

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্রথম যে তিনজন চাকমা ভাষায় তিনটি কবিতা রচনা করেন তাঁরা হলেন যথাক্রমে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী চুনিলাল দেওয়ান,শ্রী মুকুন্দ তালুকদার এবং কবি সলিল রায়। প্রথম আধুনিক চাকমা কবিতাটি রচনা করেন শ্রী চুনিলাল দেওয়ান। এটি গৈরিকা পত্রিকার একটি সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য চাকমাদের রাণী বিনীতা রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম দ্বিভাষিক সাহিত্য পত্রিকা গৈরিকা প্রকাশিত হয়েছিল এবং সবার প্রশংসা অর্জন করেছিল। প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পাচার্য মরহুম জয়নুল আবেদীনও শ্রী দেওয়ান সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে শ্রী দেওয়ানের পুত্র বন্ধুবর দেবী প্রসাদ দেওয়ান সহ একবার শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের বাসায় গেলে শ্রী দেওয়ান সম্পর্কে তাঁর মনোভাব জানার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে শ্রী দেওয়ান কেবল একজন সফল চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, তিনি কবি এবং গীতিকারও ছিলেন। তিনি বহু বাংলা কবিতা ও গানও রচনা করেছিলেন। এখানে তাঁর রচিত প্রথম চাকমা কবিতাটি অনুবাদসহ প্রকাশ করা হবে। শ্রী দেওয়ানের পরে শ্রী মুকুন্দ তালুকদার ‘পুরান কদা’ কবিতাটি রচনা করেন। এটি গৈরিকা পত্রিকায় ১৩৫৪ বাংলা সনের (১৯৪৮ সালের) অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় (বড়গাঙ, খাগড়াছড়ি, ১৪০৭ বাংদ্রঃ)।

অতঃপর কবি সলিল রায় রচিত ‘দূরত ন যেইচ সোরি’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। চাকমা রাজ পরিবারের সদস্য কবি সলিল রায় ছিলেন একাধারে কবি, গবেষক এবং গীতিকার। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রী অরুণ রায়ও ছিলেন কবি এবং গৈরিকা পত্রিকার সম্পাদক। কবি সলিল রায় বাংলাতেও বহু কবিতা রচনা করেন এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এবার নিম্নে প্রথম তিনটি আধুনিক চাকমা কবিতা বঙ্গানুবাদ সহ প্রদান করা হলো।

প্রথম আধুনিক কবিতা:

ঘর দুয়ারত এইনেই ডাগের সিবা কন্না মরে
– চুনিলাল দেওয়ান (রচনা কাল: আনুমানিক ১৯৪০ – ১৯৪৫)

ঘর’ দুয়ারত এই নেই ডাগের
সিবা কন্না মরে ?
মুয়ান চিনং নাঙ ন জানং
কুধু দেখ্যং তারে ?
ডাক শুনিনেই পুরি ফেললুং
যেধককানি মর কাম্,
পরানে কত্তে তারে চেইনেই
পুঝার গোত্তুং নাঙ্।
পুঝার গরি চিন পরিচয়
তালোই যদি হোই,
হাওচ গোরি ভিদিরে বোজি
দ্বিজনে কধা কোই।
কধা কোইনেই মনত পলে-
থেবাত্যেয় কোম্ তারে,
জনমত্যেই মিলিমিঝি
থেবং আমি সমারে।

অনুবাদ:
ঘরের দ্বারে এসে কেগো ডাকছে আজি মোরে
ঘরের দ্বারে এসে কেগো
ডাকছে আজি মোরে?
মুখটি চিনি নাম জানি জানিনা
কোথায় দেখলুম তারে?
ডাক শুনে যে ভুলে গেলুম
আমার যত কাম,
ইচ্ছে করে তাকে ডেকে
জিজ্ঞেস করি নাম।
জিজ্ঞেস করে চিন পরিচয়
দুজনে যদি হই,
সাধ কয়ে ভিতরে ডেকে
দুজনে কথা কই।
কথা বলে মনে ধরলে
থাকতে বলবো তারে,
সারা জনম মিলে মিশে
রইবো সমাহারে।

[মিঃ দেবী প্রসাদ দেওয়ানের নিকট থেকে সংগৃহীত।
পুনঃমুদ্রণ জুভাপ্রদ : রঙগীত, রাংগামাটি ১৯৭৭।
কবিতাটির অনুবাদক- সুগত চাকমা ।]

পুরান কদা
-শ্রী মুকুন্দ তালুকদার

পুরান কদা ইদত তুলে মনান কেজান গড়ে,
পরাণে কয়দে সে ধক্যা গরি রাগেদুং জনম ভরে।
চিগোন কালর সে সব খেলা, সে সব সঙ্গি ভেই,
জীবন সাগরত ডুবি যিয়ন- ইক্ষুনে কিচ্ছুনেই!
বেইল্যা হলে “গুডু খেলা” আর কদক কি?
দ্বিবর কাল্যা নাদেং হেলা মনত পড়েনি?
সে কদানি মনত তুল্লে মস্ত সুখ লাগে,
স্যানি ভাবি ইম্ফিনেঅ খেলদুং পরানে মাগে।
মুড়া উবরে “মোনঅ-ঘরত’ বাঁঝি’ একুয়া লই,
দগিনঅ বুয়্যার এজেরস্যা – গায় গায় রয়স বই।
ধানুন উন্দি লুঙি এত্তন, তদেগ ধাবা পড়ে,
সিদ্যায় বিলি ম’ মা-বাপে ফেলি জিয়ন মরে।
পেগ এলেস্যা ‘বাদোল’ মারর, বাঁঝি বাজর উন্দি,
সময় সময় থিয়েন্যায় চর পেগে খাদন কুন্দি।
একঝলকা স্যা বুয়্যার গেল ধানুন লারিন্যায়,
নুয়া গরিন্যায় বাজর বাঁঝি পরাণ ধরিন্যায়।
পুনং চানর জুন পরত সঙ্গী-সমার লই,
ত’মন কদা করস্যা তুই এক্কান জাগাত বই।
সে কদানি ইদত তুলে পরাণ কানি উদে,
পুরান-কালর সুখঅদিনত মনান ধাবা ছুদে!
সেক্কে দিনর সে হাজি-গীত, সে সব সঙ্গী-ভেই
কুদু গেলাক-ইক্ষিনেদঅ মত্তুন কেঅ নেই॥

[কৃতজ্ঞতা স্বীকার – গৌরিকা ১২শ বর্ষ, ১৩ শ বর্ষ, ১৩শ সংখ্যা হতে পুনঃ মুদ্রিত ।
অগ্রহায়ণ ১৩৫৪ বাংলা সন। পুনঃ মদ্রন মিনু চাকমা সম্পাদিত “বড়গাঙ”
বৈ-সা-বি/১৪০৭ রেগা’র স্মরণিকা। রেগা ফাউন্ডেশন, মিলনপুর, খাগড়াছড়ি।]

অনুবাদ:
পুরান কথা

পুরান কথা মনে পড়লে মন যে কেমন করে,
ইচ্ছে করে সে সব স্মৃতি রাখতুম জনম ভরে ।
ছোট্ট বেলার সে সব খেলা, সঙ্গী সাথী যারা
কালের স্রোতে হারিয়ে গেল এখন কোথায় তারা?
বিকাল হলে হাডুডু আরো কত কি
দুপুর বেলা লাটিম খেলা কত খেলেছি!
সে সব কথা মনে পড়লে খুবই সুখ লাগে,
আজো তাইতো তাদের ভেবে খেলার ইচ্ছে জাগে।
পাহাড় ‘পরে মোনঘরে বাঁশী নিয়ে একা,
দখিন হাওয়া বইছে তখন একলা তুমি সেথা।
ধানের শীষ নুয়ে এলে টিয়া তাড়াবো বলে,
তাইতো সেথায় পিতা মাতা রেখে গেল মোরে।
পাখি এলে গুলি ছুঁড়ছ, বাঁশীও বাজাও সুরে,
কখনও তুমি দাঁড়িয়ে দেখ, কোথায় পাখি উড়ে?
এক ঝলকা বাতাস গেলে ধানে পড়লো সাড়া,
নতুন করে বাজাও বাঁশী পরান মাতোয়ারা।
আকাশ ভরা জোছনা রাতে সঙ্গী সাথী সাথে
মনের কথা বলছ তখন একটু কোথাও বসে।
সে সব কথা মনে পড়লে প্রাণ যে কেঁদে ওঠে,
হারানো দিনের সুখের পিছে মন যে আবার ছুটে
সে সব দিনের হাসি রঙ্গ, সঙ্গী সাথী ভাই,
কোথায় গেলে হারিয়ে সবে আমার যে কেউই নাই।
[অনুবাদক- সুগত চাকমা]

দূরত ন যেইচ সোরি
– সলিল রায়
(আনুমানিক ১৯৫৫-৫০ সন)

এই জীবনত চেইয়োং তরে ন পাং তু-য়া-দ চাং,
তরেই ভাবি জন্ম ভোরি দুঘর গীদ গাং।
‘চেলেই ন পায়’ কোই ন পারং,
হারেইন্যায় তে বুঝি পারং,
ত’ নাঙ্ ধোরি কানং কধক, কানি কানি থাঙ, থাং
এই জনমত্‌ ন পেইম তরে তৃয়া-দ তরে চাং।
সিন্যা বেল্যে চান উধের স্যা আগাচ্ ভারী দৌল,
আদাম পার, হোই ত’ সমারে পধত দেঘা হোল।
বুক ভরা তর ফুল ছরা
মিদে হাঝি গাল ভরা
এক ছরালোই পিনেই দিলে পরান বানা পোল,
দ্বিবা তারা সেই মিলনত সাক্ষী হোইনেই রোল।
আর একদিন্যা স্যা গাঙ’ পারত কুম্মুয়া ভোরি থোই,
গাঙত্ লামি হাদ ধোরিন্যায় শব্দ গোরি কোই,
“দিলং ভাদ জরা গঙারে
মল্লে মোরিবোং সমারে
চন্দ্র সূর্য সাক্ষী গৌরি দ্বিজনে থেবংগোই”
শব্দ ফেলেই কুধু গেলে পরান কারি লোই?
সে কধানি পুরি ফেল্যুচ্ দুরোত্ যেইয়োচ্ সোরি,
সে পত্থান-দ এ- ঝ আঘে গাঙান্ ন যায় ভোরি।
ফুল’ ছরাবুয়া গলাত্‌ বেরেই
গাঙ’ ঘাদত বেরেই বেরেই
সে শবদ লই সারা জনম মোরিম বুগোত্ গোরি
আর জনমত্ বুগোত এন্যেই দূরত ন যেইচ্ সোরি।
[পুনঃ মুদ্রণ জুভাপ্রদ। রঙগীত। রাংগামাটি, ১৯৯৭]

অনুবাদ:
দূরে যেও না সরে

এই জীবনে তোমায় চেয়ে পাই নি তবুও চাই,
তোমায় ভেবে জনম ভরে দুখের গীত গাই।
চেয়েও পায় না বুঝতে নারি
হারায়ে তবে বুঝতে পারি
তোমায় ডেকে কাঁদি কত, অশ্রু ঝরে হায়!
এই জীবনে পাবো নাকো তবুও তোমায় চাই।
সেদিন রাতে চাঁদ উঠছে, আকাশ ভরা আলো-
গ্রাম পেরিয়ে তোমার সাথে পথেই দেখা হলো।
বুক ভরা তোর ফুলের মালা
মধুর হাসি নয়ন ভরা
একটি মালা পরিয়ে দিতে প্রাণটি বাঁধা হলো,
দু’টি তারা সেই মিলনে সাক্ষী হয়ে র’লো।
আর যে একদিন নদীর পারে কলস রেখে ভরি
নদীর জলে দু’হাত ধরে শপথ করে বলি,
“দিলুম ভাত জোড় নদীর স্রোতে
মরলে মরবো এক সাথে
চন্দ্র সূর্য সাক্ষী করে থাকবো দুজনে”
শপথ ফেলে কোথায় গেলে কেড়ে পরাণে?
সে সব কথা ভুলে গিয়ে দূরে গেছো সরে,
সে পথ তো আজো আছে, নদী আছে পড়ে।
ফুলের মালা বুকে করে
নদীর ঘাটে মরি ঘুরে
সে শপথ যে বুকে নিয়ে যাবো আমি মরে,
আর জীবনে বুকে এসো দূরো যেওনা সরে।

[কবিতাটির অনুবাদক- সুগত চাকমা]

লেখক: সুগত চাকমা (ননাধন)

সূত্র: বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *