চাকমা অমর কবি শিবচরণ ও তাঁর রচিত গোঝেন লামা

চাকমাদের আদি বা প্রথম কবি হলেন শিবচরণ। তার রচিত কবিতা বইয়ের নাম ‘গোঝেন’ লামা। এতে সাতটি ‘লামা’ ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এক একটি গীতি কবিতাকে এক্ষেত্রে এক একটি ‘লামা’ বলা হয়। কবি শিবচরণের ‘গোঝেন লামা’র রচনা কাল অষ্টাদশ শতাব্দীতে মনে করা হয় (ননাধন চাকমা ১৯৭৫, যামিনী রঞ্জন চাকমা ১৯৯৩)। শিবচরণ তাঁর বইয়ের রচনাকাল এগার হাজার চুরাশি সন লিখেন। চাকমা সমাজে কবি শিবচরণ অনেকের কাছে সাধু শিবচরণ নামেও পরিচিত ছিলেন। শিবচরণের জন্মস্থান হলো (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার) বর্তমান রাজস্থলী (থানার) বাজারের নিকটবর্তী ঙারাওয়াহ্ নামক গ্রামে। সেই গ্রামখানি ছিল তখনকার সময়ের চাকমা রাজার (?) রাজধানী শুকবিলাস থেকে আনুমানিক ৭/৮ মাইল দূরে। গ্রামবাসীরা জুম চাষের উপর জীবিকা নির্বাহ করতো। শিবচরণের পিতার নাম ধুংগি; কাম্বে—এর গোছা (গঝা), দ্যায়া গোষ্ঠীর লোক ছিলেন। মাতার নাম ধর্মপুদি। (যামিনী রঞ্জন চাকমা, ১৯৯৩ঃ১১)।

তিনি পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন। “শিবচরণ বাল্যকাল হইতেই ভাবুক ছিলেন।” (বিরাজ মোহন দেওয়ান ১৯৬৯ : ২৫৮)। এক সময়ে তারা নাড়াই পাহাড় হতে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে তৈনমুড়ী নদীর তীরে আসিয়া বসতি স্থাপন করেন। (দেওয়ান, ১৯৬৯)। অতি শৈশবে শিবচরণ পিতৃহারা হন। মা ও (কালীচরণ) দাদার আদর যত্নে পিতৃহারা শিবচরণ বড় হন। (যামিনী রঞ্জন চাকমা, ১৯৯৩)।

পূর্বে এখানকার বিভিন্ন সমাজে সাধু, দরবেশ, ফকীর, কবি ইত্যাদি ব্যক্তিদের সম্পর্কে যে রকম নানা ধরনের জনশ্রুতি প্রচলিত হতে দেখা যায়, তেমনি শিবচরণ সম্পর্কেও চাকমা সমাজে নানা ধরনের জনশ্রুতি রয়েছে। যেমন – “বালক শিবচরণ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে ২/৩ দিন পরে আবার হঠাৎ দেখা দিতেন। শুকনো কাপড়ে পায়ে হেঁটে নদী পার হয়ে যেতেন। তাঁর বালক বন্ধু চীদংকে চোখ বন্ধ করায়ে হঠাৎ একস্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতেন।” (যামিনী রঞ্জন চাকমা, ১৯৯৩)। “আহারের সময় মাতা পুত্রকে না পেয়ে তার নিমিত্ত (ভাতের পুটলী) ‘ভাতমোচা’ ফুলবারেঙের মধ্যে রাখিয়া দিতেন। আশ্চর্য্যের কথা, ২/৩ মাস পরে শিবচরণ আসিলেও নাকি সেই ভাত গরম পাওয়া যাইত, এমন কি কোন কোন বারে সেই ভাত হইতে বাষ্পও উঠিত। অবশেষে তিনি সন্যাসব্রত গ্রহণ করিয়া গৃহত্যাগ করেন।” (ঘোষ ১৯০৯ : ৩৭০)। উপরে কবি শিবচরণের আলৌকিক ক্ষমতা ও বৈরাগ্য সম্পর্কে যে সকল জনশ্রুতির কথা বলা হয়েছে তা থেকে এই ধারণা পাওয়া যায় যে, তিনি চিরকুমার ছিলেন এবং হঠাৎ করে সমাজ জীবন থেকে অন্তর্হিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ শিবচরণের এক প্রিয় শিষ্যের নাম চীদং ছিল বলে মনে করেন। চীদং শিবচরণের সাথে তাঁর শেষ যাত্রায় ছিলেন। জনশ্রুতি মতে শিবচরণ আকাশ পথে অন্তর্হিত হন। এক সময় তাঁকে আর দেখা পাচ্ছিল না বলে সে (চীদং) সব ঘটনা প্রকাশ করেছে।

উল্লেখ্য যে, চাকমা সমাজে ‘গোঝেন’ লামা’র পাণ্ডুলিপিগুলো চাকমা বর্ণে লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়। ‘গোঝেন’ লামা’র শুরুতে কোন কোন লেখায় নিম্নলিখিত লাইনগুলো পাওয়া যায় –

আরেঙ মিদিঙা ফরা যার জনম
আগে সালাম দ্যং তার চরণ।
মানেই কুলে জরমেলুং।
‘গোঝেন’ সাধনা নিঘেলুং॥

বৌদ্ধদের বিশ্বাস মতে পৃথিবীতে ভাবী বুদ্ধ হয়ে যিনি জন্মগ্রহণ করবেন তিনি হলেন ‘আৰ্যমিত্র’ বুদ্ধ। তাই কেউ কেউ মনে করেন যে, কবি শিবচরণের রচিত ‘গোঝেন’ লামা’র ‘আরেঙ মিদিঙা’ বলতে ‘আৰ্যমিত্র’ বুদ্ধকেই বন্দনা করা হয়েছে এবং প্রভু অর্থে ‘ফরা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে ‘গোঝেন’ (গোঁসাই) বলতে আর্যমিত্র বুদ্ধকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ কবি শিবচরণের রচনা সম্পর্কে বলেছেন, গোঝেনের লামা অর্থাৎ “গোঁসাইর (পরমেশ্বরের) স্রোত্র সৰ্ব্বাপেক্ষা হৃদয়াকর্ষক। ইহার আগা গোড়া উদাসী ভক্তের মরম কথায় পরিপূর্ণ। উহার রচয়িতা শিবচরণ সংসারাসক্তি বিরহিত ছিলেন” (ঘোষ ১৯০৯ : ৩৭০)।

‘গোঝেন লামা’র শুরুতে প্রথম দিকে সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে কিছু কথা, তৎপরে গোঝেনের প্রতি আরাধনা বা বন্দনা এবং সবশেষে বর প্রার্থনা বা মুক্তি লাভের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। “বলিয়া রাখা উচিত যে, এই ‘লামা’ গুলি বস্তুত সঙ্গীত নহে। যে হিসাবে বেদকে গান বলা হয়, আমরা সেই হিসাবে তাল লয় সহকারে গীত হয় বলিয়া ইহাদিগকেও সঙ্গীত শ্রেণীভুক্ত করিলাম” (ঘোষ ১৯০৯ : ৩৭৮)।

‘গোঝেন’ লামা’য় বলা হয়েছে প্রথমে মহাবিশ্বে কেবল স্রোতপূর্ণ জলধারা ছিল, পরে তাতে যখন জগত হলো তখনই স্বয়ং প্রভু দেখা দেন এবং জলের উপরে বসে ধ্যানমগ্ন হয়ে দিব্য জ্ঞান লাভ করেন। অতঃপর তিনি হুংকার দিয়ে এ জগতের সৃষ্টি করেন। তিনি প্রথমে স্বর্গপুরী, দেবলোক ও মর্ত্যলোক সৃষ্টি করলে সূর্য ও চন্দ্ৰ উদিত হয়। ফলে রোববার থেকে শনিবার পর্যন্ত সাতটি বারের জন্ম হয়। এগুলোর ড়মধ্যে পিতার দিন হলো চারটি দিন এবং মাতার দিন হলো তিনটি দিন। লক্ষ্যণীয় বিষয় যে ‘গোঝেন’ লামা’য় সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে উপরে বর্ণিত কথাগুলোর সাথে কোন কোন ক্ষেত্রে শূন্য পুরাণে বর্ণিত –

“নহি ছিল রেক নহি রূপ নহি ছিল বন্ন চিন
রবি সসী নহি ছিল নহি রাতি দিন”

উপরোক্ত কথাগুলোর ভাবের মধ্যে কিছুটা সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। এ বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত এ মূহুর্তে খুব বেশী বলার উপায় নেই। নিম্নে “গোঝেন’ লামা” থেকে আমার অনুবাদকৃত কিছু অংশ তুলে ধরা হলো। প্রথমে গোঝেন’ লামা থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় লামার অংশ বিশেষ –

উজানি ছরা লামনি ধার।
ন এল সিরিত্তি জলত্কার॥
জল’ উবুরে গোর্জ্যে থল।
গোঝেনে বানেল জীবসকল॥
আরেয়ে মানেয়ে যার জনম।
আগে সালাম দ্যং তার চরণ৷
মরে বিধির দয়া হোক।
তিন দেব’ চরণত সালাম থোক॥
মা স্বরস্বতী সালামত।
যোগেই দিদগি গীদপদ॥
যে বর মাগে সে বর পায়।
গোঝেনে বর দিলে ন ফুরায়॥
ঘুরি চেলুং চোখ ভরি।
মা বাব’ পারা নেই দেচ ভরি॥
শুনরে পন্দিত পোর্বুয়া ভেই।
দিভা অক্খরে তরি যেই
অপার পানি’ সাগরে।
তিরিচ-তিন জাদি ভাচ পার্তুং মুই আঘরে॥

বঙ্গানুবাদ:
উজান হতে স্রোত নিম্নে বহে যায়-
ছিল না সৃষ্টি, শুধু জল উছলায়;
জলের উপর যবে হইল স্থল,
গোঝেন সৃজিলেন তবে এই জীবসকল।
যেথা হ’তে এ মানব লভিল জনম,
সর্বাগ্রে প্রণাম জানাই তাঁহার চরণ।
মোর লাগি বিধির দয়া তবে হোক ।
ত্রি- দেবের চরণে আমার প্রণাম থাকুক।
মাগো স্বরস্বতী, প্রণাম তব পদ,
যুগিয়ে দাও গো মা মোরে গীতপদ।
যে বর চাহে সে বর পায়,
গোঝেনে বর দিলে কভু না ফুরায়।
ভ্ৰমিলাম কত দেশ কত ভূমি কত গ্রাম,
নাহি কেহ কভু কোথা মা বাপেরও সমান।
শুন হে পণ্ডিত পড়ুয়া ভাই,
দু’টি অক্ষরে তরিয়া যায়।
অপার পানির সাগরে-
ত্রিশ-তিন জাতির ভাষা পারি যেন আখরে।

[৩য় ও ৪র্থ লামা থেকে]

তদাত বেরেই কাবরে।
আরাধনা গরং হাত জোরে॥
হীন কূলে ন যেদুং।
দুখ্যা কূলে ন হোদুং॥
হাদে না গোত্তুং জীব-বধ।
যুগে যুগে ন পোত্তুং দোজগত॥
হারন্দি রাজার দেচ লাগ ন পাং।
অঘাদে অপধে যেই ন পাং॥
সাত ভোই বোন লাগ পেদুং।
ননেয়া খুলাভুয়া মুই হোদুং॥
সনার ধুলনত ধুলেদাক।
দেবর ভঙানি ভঙেদাক॥
সমারে বন্ধু পাং পারা।
লোগে কুদুমে সব্‌ পুরা॥
মাধা জঘা চুল ধরোক।
মধুর হদ দিভা চোখ
তদাত পেদুং দেব গরন।
বাহ্রা অঝার বুক ভরন॥
ছানে শিক্যায় গরনে।
রূবে রঙে পেদুং গোই সপ্‌পানে॥

বঙ্গানুবাদ:

কন্ঠে জড়ায়ে শুভ্র কাপড়ে-
আরাধনা করি আমি হাত জোড়ে।
হীন কূলে নাহি যেন যাই,
দুঃখ যেন কভু নাহি পাই।
হাতে যেন নাহি করি জীববধ,
যুগে যুগে সাক্ষাৎ না হয় যেন দোজখ।
পড়ুয়া পণ্ডিত রয় যেই দেশে,
জন্ম লাভ করি যেন সেই দেশে।
পরাজিত রাজার দেশ সাক্ষাৎ যেন নাহি হয়।
অঘাটে অপথে যেন যেতে নাহি হয়॥
সাত ভাই সাত বোন মাঝে।
সকলের ছোট হবো আমি যে॥
সোনার দোলনায় দোলাবে।
স্বর্গ হাওয়ায় উড়াবে॥
সঙ্গে বন্ধু ইষ্ট যারা।
নিত্য রবে গৃহে ভরা॥
শিরে চুল শোভা হোক
মধুর হোক দু’টি চোখ
কণ্ঠে হোক দেবের গড়ন।
প্রশস্ত বাহু আর বক্ষ ভরণ॥
শান শওকতময় জীবনে।
শোভা রবে সব খানে॥

অতঃপর আরও কিছু লাইন নিম্নে প্রদান করা হলো-

সর্ব লোগে পুজিদাক।
দেলে শত্তুরে ভজিদাক॥
হাদত পেদুং লেঘা বর।
কেয়াত পেদুং রূপবর॥

(৫ম লামা থেকে)

দেনে মাগং ধন বর।
বাঙে মাগং জন বর॥
ধনে সম্পদে সবপুরা
জুরি পার্তুংগোই এইত্ ঘরাহ্॥
হাল্যা আবুজিলে ‘লেই’ সাধি।
জুম্মুয়া আবুজিলে ‘টং’ সাধি॥
দেবান আবুজিলে ‘বীর’ সাধি।
রাজা আবুজিলে ‘চক্ৰবৰ্ত্তী’ সাধি॥

উপরোক্ত লাইনগুলির অনুবাদ নিম্নে প্রদত্ত হলো-

সর্বলোকে পুজিবে।
শত্রু হলেও ভজিবে।
হাতে হবে লেখার বর।
দেহে হবে রূপের বর।
ডানে চাহি ধন বর।
বামে চাহি জন বর॥
ধনে সম্পদে সব পুরা
সাথে রবে হাতী ঘোড়া॥
চাষা হলে ‘লেই’ সাধি।
জুমিয়া হলে ‘টং’ সাধি॥
‘দেবান’ হলে বীর সাধি।
‘রাজা’ হলে চক্রবর্ত্তী সাধি॥

[বর্মী শব্দ ‘লেই’ = জমি। ‘টং’ = পাহাড়]

কবি শিবচরণ তাঁর রচিত ‘গোঝেন লামা’-তে অহিংসা, মৈত্রী, পিতামাতার প্রতি ভক্তি, ছোটদের প্রতি স্নেহ, জ্ঞানার্জন, ধনার্জন, জনবল, স্বাক্ষরতা ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। সব শেষে তিনি এই বলে তাঁর অনুসারীদের যুগে যুগে উৎসাহ যুগিয়েছেন-

যে বর মাগে সে বর পায়,
গোঝেনে বর দিলে না ফুরায় ।

রেফারেন্স:

Raja Devasish Roy, 1981 Chakma Literature’ এটি বরেণ ত্রিপুরা কর্তৃক সম্পাদিত পুব ই রাবাইনি সাল (পূর্ব দিগন্তের সূর্য) গ্রন্থে প্রকাশিত। চট্টগ্রাম : জনতা প্রেস।
ননাধন চাকমা সম্পাদিত (১৯৭৫) : ‘গোঝেন’ লামা। রাঙ্গামাটি। সরোজ আর্ট প্রেস।
বিরাজ মোহন দেওয়ান, ১৯৬৯
যামিনী রঞ্জন চাকমা, ১৯৯৩ : চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত। রাঙ্গমাটিঃ সরোজ আর্ট প্রেস।
: চাকমা দর্পণ । ১ম খণ্ড রাঙ্গামাটি সরোজ আর্টপ্রেস।
সতীশ চন্দ্র ঘোষ ১৯০৯ : চাকমা জাতি : (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত)। কলিকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাবলী ২৪শ’ খণ্ড ।
সুগত চাকমা ১৯৮৩ঃ চাকমা পরিচিতি। রাঙ্গামাটি : বরগাঙ পাবলিকেশন্স।
দৈনিক বাংলার বাণী ২৮শে মে ১৯৯৯ ইং সংখ্যা।

(ব্যবহৃত পাণ্ডুলিপি : কবি শিবচরণ রচিত ‘গোঝেন’ লামা’ বইয়ের বহু পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। চাকমা বর্ণে লিখিত এর একটি অনুলিপি হরধন চাকমা, ১২৯ নং কাইন্দ্যা মৌজা, গ্রাম বাদলছড়ী,থানা : কোতোয়ালী, জেলা পার্বত্য চট্টগ্রাম কর্তৃক অনুলিপিকৃত করা হয়েছে বলে একটি পান্ডুলিপিতে পাওয়া যায় । বাংলা বর্ণেও এর একটি অনুলিপি করেছেন ফুলমোহন কাব্বারী (হেডম্যান), ১৭৪
নং রামখ্যাছড়ি মৌজা, ঠেগা আন্দার মানিক, বরকল পার্বত্য চট্টগ্রাম ।

লেখক: সুগত চাকমা (ননাধন)

সূত্র: বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *