চাকমা ভাষা ও বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা

ভূমিকা:

চাকমা ভাষা চাঙমা হধা/চাঙমা ভাজ নামে পরিচিত। এটি ইন্দো-ইউরোপিয়ান পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং এর নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। বিবর্তন অনুসারে চাকমা ভাষার উৎপত্তি ক্রম হল ইন্দো-ইউরোপিয়ান>ইন্দো-আরিয়ান>মাঘধী(ইস্টার্ন জোন)>প্রাকৃত>চাকমা।

চাকমা ভাষাভাষী সম্পর্কে সাম্প্রতিক কোন তথ্য না থাকলেও জনসংখ্যার ভিত্তিতে বর্তমানে চাকমা ভাষাভাষীর সংখ্যা ৬-৭ লাখের মধ্যে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে চাকমাদের সংখ্যা বাংলাদশে ৪৮১০০০ জন(তঞ্চঙ্গ্যা ৫১০০০ জন), ভারতে ২৩০০০০ জন এবং মায়ানমারে ৮০০০০ জন। বর্তমানে চাকমা ভাষা বা চাঙমা ভাজ ৩টি ভাগে বিভক্ত ১। চাকমা(আনক্যা) ২।ডাইংনেট/দৈনাক ৩। তঞ্চঙ্গ্যা ।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে তঞ্চঙ্গ্যা এবং চাকমাদের পৃথক করা হয়েছে ১৯৮৯ সালে। কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবেই তঞ্চঙ্গ্যা এবং চাকমারা একই জাতির অংশ। চাকমারা মায়ানমারে দৈনাক নামে পরিচিত আর তঞ্চঙ্গ্যারাও ১৮০০ সালের পূর্বে দৈনাক নামেই পরিচিত ছিল। চাকমারা ১৪০০ সালের দিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আসলেও তঞ্চঙ্গ্যারা আসে চাকমা রাজা ধরম বক্স খানের সময়(১৭৯৪-১৮৩১) , ধরম বক্স খান তাদের তৈন নদীর তীরে থাকার জন্য জায়গা দিলে পরবর্তীতে তারা জায়গার নাম অনুসারে তঞ্চঙ্গ্যা নাম ধারণ করে। ভারতে বসবাসরত তঞ্চঙ্গ্যাদের মধ্য মিজোরামের তঞ্চঙ্গ্যারা নামের শেষে তঞ্চঙ্গ্যা লিখলেও জাতি হিসেবে এখনো চাকমা লিখেন আর ত্রিপুরা রাজ্যের তঞ্চঙ্গ্যারা নাম ও জাতি উভয়ই চাকমা হিসেবে লেখেন, পরিচয় দেন। অন্যদিকে মায়ানমার সরকার চাকমাদের দৈনাক হিসেবে অভিহিত করলেও তারা নিজেদের চাকমা হিসেবে পরিচয় দেন এবং ৭ জানুয়ারি দিনটি চাকমা জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করেন।

চাকমা ভাষা বিভক্তির কারণ:

চাকমা ভাষার বিভক্তির মূলেই রয়েছে দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতা। চাকমাদের একটি অংশ ১৪০০ সালের দিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আসলে তারা ক্রমশ উত্তরপূর্ব দিকে সরে আসে এবং অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে আর নতুন অঞ্চলে প্রবেশের সাথে সাথে ভাষার ধর্ম অনুসারেই স্থানীয় ভাষার অনেক শব্দ যুক্ত হতে থাকে। অন্য দিকে মায়ানমারে অবস্থানরত চাকমাদেরও স্বাভাবিক ভাবেই নিজ ভাষার সাথে বার্মিজ শব্দ যুক্ত হতে থাকে। যার কারনে দুটি অংশের মধ্য দূরত্তের সৃষ্টি হয়। এর পর চাকমা রাজা ধরম বক্স খানের সময়ে চাকমাদের আরেকটি অংশ (যারা পরবর্তীতে তঞ্চঙ্গ্যা নাম ধার করে) মায়ানমার থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমন করে। আর ধীরে ধীরে তাদের ভাষাও মূল ভাষা থেকে বিচ্যুত হয়। তা সত্তেও চাকমা ভাষার তিনটি অংশই (চাকমা, দৈনাক এবং তঞ্চঙ্গ্যা) পরস্পরের সাথে বোধগম্য এবং সংগত কারনেই চাকমা-দৈনাক অপেক্ষা চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যা এ দুটি শাখার নৈকট্য বেশি। এখানে তঞ্চঙ্গ্যা শাখাটি হল চাকমা এবং দৈনাক এই দুইয়ের মধ্যবর্তী বা সংযোজক শাখা। চাকমা এবং তঞ্চঙ্গ্যা এ দুটি শাখার মধ্য উচ্চারণ গত পার্থক্য ছাড়া অন্য তেমন কোন পার্থক্য নেই! উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি বের হওয়া একটি তঞ্চঙ্গ্যা গানের পঙক্তিটি বলা যায়-

তঞ্চঙ্গ্য:

আমি মোইনত পরং উবংগোই
সিধি গেলে মৈন ঘরত
জুর-অ জুর-অ বৈয়ারত
মন কধা মনত তুলি
ভাঙি ছুড়ি কোই লুবংগই।

চাকমা:

আমি মৌনত পরং অবংগোই
সিধু গেলে মৌন ঘরত
জুর-অ জুর-অ বৈয়েরত
মন কধা/হধা মনত তুলি
ভাঙি ছুড়ি হোই লবংগোই।

অপর দিকে দৈনাকদের ভাষার মধ্যে অধিক বর্মী শব্দ এবং উচ্চারনও বর্মী ঘেঁষা হওয়ায় চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার সাথে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।

চাকমা ভাষার বর্তমান অবস্থা:

কোন ভাষার ব্যাবহারকারী যখন কমে যায় তখন সেটি বিপন্ন হয়ে পড়ে! আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যাবহারকারী বেশি হলেও ভাষা বিপন্ন হতে পারে যদি নতুন প্রজন্মের মধ্য সে ভাষা গ্রহন করার প্রবণতা না থাকে। কোন ভাষার ব্যাবহারকারীর সংখ্যা যখন কমতে কমতে শূন্যর কোটায় চলে আসে তখনোই ভাষার মৃত্যু হয়।

বিপন্ন ভাষা চিহ্নিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক একটি পদ্ধতি প্রনয়ন করা হয়েছে। এ পদ্ধতি অনুসারে ভাষা কতটুকু বিপন্ন তা চিহ্নিত করার জন্য চার স্তরের একটি স্কেল ব্যাবহার করা হয়।

১। সুরক্ষিত নয়: অধিকাংশ শিশুরা ভাষা ব্যাবহার করে থাকেন কিন্তু তা শুধু বাড়ি বা কিছু ক্ষেত্রের মধ্য সীমাবদ্ধ।

২। নিশ্চিত ভাবে বিপন্ন: শিশুরা বাড়িতে মাতৃভাষা হিসেবে আর ভাষাটি ব্যাবহার করেনা/শিখেনা।

৩। অত্যান্ত বিপন্ন: দাদা-দাদী এবং পুরোনো প্রজন্মের দ্বারা ভাষা কথিত হয়, পিতা বা মাতা প্রজন্ম এটি বুঝতে পারে কিন্তু তারা এটি নিজেদের মধ্যে বা শিশুদের সাথে বলতে পারেন না।

৪। চরম বিপন্ন: যখন শুধু মাত্র দাদা-দাদী এবং পুরোনো প্রজন্মের দ্বারা ভাষাটি আংশিক বা বিরল ভাবে ব্যাবহৃত হয়।

এ স্কেল অনুসারে চাকমা ভাষা নিশ্চিতভাবে বিপন্ন না হলেও সুরক্ষিত নয়! কারণ চাকমা ভাষা নিজেদের মধ্য ব্যবহৃত হলেও এর ব্যাবহারের ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ। এখনো পর্যন্ত চাকমা ভাষায় কোন টিভি বা রেডিও স্টেশন নেই, নেই কোন দৈনিক সংবাদপত্র! ত্রৈমাসিক বা বাৎসরিক বিভিন্ন ম্যাগাজিন সীমিত আকারে বের হলেও জনসাধারনের অংশগ্রহন সেখানে খুব সামান্যই। আর বাংলা ভাষার আগ্রাসনের কারনে চাকমা ভাষায় বাংলায়ন ঘটেছে প্রচুর পরিমানে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বাবা-মা নিজ সন্তানকে ছোটবেলা থেকে বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত করার জন্য নিজ সন্তানকে মাতৃভাষা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করেন। আর এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয় তা হল,
ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউট এর তথ্য মতে বাংলাদেশে বাংলা ব্যাথিত আরো ৩০টি ভাষা রয়েছে। যার মধ্যে ১২-১৮টি ভাষা নিশ্চিত থেকে চরম বিপদাপন্ন।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা:

বাংলাদেশে চাকমারা সংখ্যা গরিষ্ঠ হলেও নিজ ভাষা ও বর্ণমালায় শিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে তারা ভারতীয় চাকমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে সবচেয়ে পশ্চাদপদ হচ্ছে মায়ানমারে বসবাসরত দৈনাক চাকমারা। আমাদের দেশে এ বছর (২০১৬)  থেকে বাংলাদেশ সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা সহ ছয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে মতৃভাষায় শিক্ষা দানের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রনয়ন করে। যা কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ, অপ্রতুল হলেও উদ্দ্যগটি প্রশংশার দাবী রাখে। এর বাইরে কিছু মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশে বসবাসরত চাকমাদের মধ্য নিজ বর্ণমালা শেখার প্রবণতা যথেষ্ঠ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যগে গড়ে ওঠা চাকমা বর্ণমালা শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর সাফল্য চোখে পড়ার মত যা ৫-৬ বছর আগেও হয়ত ভাবা যেত না।

অন্যদিকে ভারতের মিজোরামে অবস্থিত চাকমা স্বায়ত্তশাসিত ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলে অনেক আগে থেকেই ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত চাকমা ভাষা ও বর্ণমালায় শিক্ষা দেওয়া হয়। সেখানে চাকমা ভাষার বিষয়বস্তু হিসেবে চাকমা কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, চাকমা ভাষার ব্যাকরণ প্রভৃতি শেখানো হয়। কিন্তু এইসব সুবিধা শুধুমাত্র চাকমা স্বায়ত্ত শাসিত জেলার (CADC) মধ্যই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে অনেক চাকমা বাস করলেও তারা নিজ মাতৃভাষা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। আর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে সরকারও সেখানে বসবাসরত চাকমাদের জন্য চাকমা অধ্যুষিত ৬২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১২ সাল থেকে চাকমা ভাষা শিক্ষা চালু করে। তবে সরকারের এ ঘোষণা সত্তেও শিক্ষকের অভাবে সবগুলো বিদ্যালয়ে চাকমা ভাষায় শিক্ষাদান এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ত্রিপুরা রাজ্যে চাকমা ভাষা শিক্ষার জন্য ১ম থেকে ৫ম শেণী পর্যন্ত যে বইটি প্রনয়ন করা হয় তার নাম রানজুনি। বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্য বসবাসরত চাকমাদের তরফ থেকে প্রতিটা বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং রানজুনি বা চাকমা ভাষা শিক্ষার বইটিকে শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যান্য বিষয়গুলোর মতই একটি বিষয় হিসেবে ঘোষনার জন্য রাজ্যে সরকারের কাছে দাবী জানানো হচ্ছে।

উপসংহার:

বহু পূর্ব থেকে চাকমাদের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা থাকলেও এর এলিট শ্রেনী কখনোই এর পৃষ্টপোষকতা করেনি। চাকমা রাজাদের মধ্য সম্ভবত শুধু ভূবন মোহন রায়(১৮৭৬-১৯৩৪) তার সময়ে চাকমা ভাষা বিস্তারের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এর বাইরে এত শত বছর পরেও যে চাকমা বর্ণমালাগুলো ঠিকে আছে তা একান্তই চাকমা কবিরাজ(বৈদ্য) এবং ধর্মীয় গুরুদের(লুরি) অবদান।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে চাকমা ভাষাকে বিপন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এর নতুন প্রজন্মের নিজ ভাষা ও বর্ণমালা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার কোন বিকল্প নেই। চাকমা ভাষা বিস্তারে যে বাঁধাগুলো রয়েছে সেগুলো ভাঙতে হবে এখনোই। আধুনিক প্রযুক্তি, আকাশ সংস্কৃতি এবং অন্যান্য প্রতিষ্টিত ভাষাগুলোর সাথে পাল্লা দেওয়ার জন্য যদি সংস্কারের প্রয়োজন হয় তবে তাই করতে হবে। তা নাহলে অন্য অনেক ভাষার মত হারিয়ে যাবে আমাদের এ ভাষাটিও।

লেখক: বাসু দেব চাঙমা

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

3 thoughts on “চাকমা ভাষা ও বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *