চাকমা ভাষা

‘চাকমা ভাষা’ সম্পর্কিত কোন তথ্য বা তত্ত্ব বলতে গেলে ‘চাকমা জাতির ইতিহাস’ সম্বন্ধে প্রচুর জ্ঞান আবশ্যক। যদিও ভাষার নিজস্ব একটা গতি থাকে তবুও দু’টোই ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। বরঞ্চ, জাতির ইতিহাস ভাষার ইতিহাসকে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে। কিন্তু চাকমা জাতির ইতিহাস এমন আলো-আধারিতে পরিপূর্ণ যে, এর একটা সামান্য স্পষ্ট রূপরেখা প্রনয়নও সহজ নয়। বসবাস করতো মোন-কেমারের প্রাগ-ঐতিহাসিক যুগে* চীন-ভিয়েতকং-কম্বোডিয়াঞ্চলে ‘চাম’ (CHAM) নামে এক জাতির সন্ধান ইতিহাস দেয়। মঙ্গোলিয়ান (Mongoloid) গোষ্ঠীভুক্ত এই চামরা চম্পকনগরে (Champaknagar) (Mon-Khmer) লিপির আকৃতিতে লিখতো এবং কথা বলতো চীন-শ্যামীয়-শান (Sino-Siames – Shan ) ভাষায়। এই শ্রেণীর ভাষা পরিবারের উৎপত্তি বা আদিস্থান মঙ্গোলিয়ার দক্ষিণে, চীনের মধ্যভাগে। এই স্থানটিকে ইয়াং-সিকিয়াং এবং হোয়াং-হো উৎপত্তি স্থান বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এখান থেকে মূল চীনের উৎপত্তি হয়ে ব্রহ্মপুত্রের ধারা অনুসরণ করে একটি হিমালয়ের পাদদেশে তিব্বতে প্রতিষ্ঠিত হল। অপর শাখা ব্রহ্মপুত্রের ধারা বেয়ে পূর্বদিকে আসামে গেল। এর অবশিষ্টাংশ গেল ইরাবতী ও চিন্দউইনের ধারায় ব্রহ্মদেশে। এ ভাষার প্রভাব চাকমা ভাষায় কতগুলো বর্ণমালার ধ্বণি উচ্চারণে আরও সুস্পষ্ট হয়। যেমন, চীনীয়-শ্যামীয় উচ্চারণের ন্যায় চ (cha), এর চাকমা উচ্চারণ ৎস (Tsa), এবং জ (ja), এর উচ্চারণ ত্য (Tja) হয়। চীন এবং কোরিয়া ভাষা উচ্চারণে যেমন- চীন Tsin, তেতঙ্ Tsee-Tung, চাকমা উচ্চারণেও চাক্‌মা-ৎসাক্মা- Tsakma, চান-ৎসান-Tsan, জুনি-ৎযুনি -Tjuni শোনায়।

ঐতিহাসিক বা জীবিকার কারণে এ চাম জাতির কিছু অংশ স্বদেশ থেকে বিছিন্ন হয়ে মেকং (Makong) নদীর উৎস বেয়ে হিমালয়ের পাদদেশ বা তৎসংলগ্ন উর্বরভূমি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তখন কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে আর্য (Aryan) জাতির আগমন হয়নি। খুব সম্ভব চাম জাতির ঐ বিছিন্ন অংশটি ভারতীয় উপমহাদেশে শাক্য (sakya) নামে নিজেদের পরিচয় দেয়। একথা যদিও ঐতিহাসিকেরা সম্পূর্ণ স্বীকার করেন নি তবুও শাক্যরা যে অনার্য (Non-aryan) তা ঐতিহাসিক V.A. Smith এর Early History of India গ্রন্থ ছাড়াও জাপানের Dharma world পত্রিকার Nikkya Niwano এর প্রবন্ধ An introduction to Buddhism সাক্ষ্য দেয় The prevailing opinion that the Sakya tribe was not desended from the people of Aryan who occupy the larger part of present India, but that it was desended from the people of Mongolian origin. This tribe was mainly peaceful, hard working and engaged in the cultivation of rice. It is also said that as this tribe was clearheaded and proud, it sometimes ncurred the ill will of other tribe around it ( vol 4 no 6, 1977).

শাক্যরা এখানে বসতি স্থাপনের সময় এখানকার ভাষা ও সাহিত্যের ওপর অধিকতর আকর্ষিত হয়। অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের পূর্বের মাতৃভাষা বিসর্জন দিয়ে ‘ভারতীয় আর্য’ (Indo-Aryan) ভাষা গ্রহণ করে। তারা যখন এ ভাষা পুরোপুরি আত্মসাৎ করে সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশে আর্য প্রভাব সম্পূর্ণ স্বীকৃত হয়েছে। ক্রমে শাক্যরা শক্তিশালী আর্য আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে সেখান থেকে বহু দলে বিভক্ত হলো ( খৃঃ পূঃ ৩০০-২০০ অব্দে? এই পরাজিত একদল বার্মায় প্রবেশ করে এবং সেখানকার রাজশক্তিকে পরাস্ত করে। সেখানে তাঁরা ‘চ্যাংম্যান’ (CHANGMAN) বা চাংমা (CHANGMA) নামে চিহ্নিত হয়। [* নৃতত্ত্বে খৃঃ পূঃ ৩০০০ সালের আগের সময়কে ‘প্রাগ-ঐতিহাসিক যুগ’ ধরা হয় কিন্তু এখানে খৃঃ পূঃ ১০০০/৫০০ সালের মাঝামাঝি সময়কে বোঝানো হয়েছে।] কিন্তু এখানে এসে আবার তাঁদের ভাষার গতি ব্যাহত হয়। স্বাভাবিক কারণে তাঁদের ভাষায় বেশ কয়েকটি বর্মী (Burmese) শব্দ অনুপ্রবেশ করার সাথে কিছু লোকাচারও (Social practices) প্রবেশ করে। এ প্রসঙ্গে চাকমাদের ‘চাংফী’ ও ‘মাংফী’ এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বর্মী ভাষায় ‘চাং’ অর্থ হাতী এবং ‘মাং’ অর্থ রাজা। কোনো হাতী কারো বাড়ী ভেঙ্গে দিলে
কিংবা সাধারণ প্রজার বাড়ীতে দৈবাৎ রাজার পদার্পণ ঘটলে এসব ফী বা অসূচী উৎপন্ন হয়।

অপরদিকে বর্মীরাও তাদের কাছ থেকে কিছু আত্মসাৎ করার দাবী রাখে। ১৩৩৩ খৃস্টাব্দ (৬৯৫ মগী) ব্রক্ষ্মদেশীয় রাজা মেঙ্গাদি উত্তর ব্রহ্মের চাকমা রাজা অরুণযুগের (ব্র°ইয়ংজ) রাজধানী মনিজগিরি আক্রমণ করেন। তাতে ব্রহ্মরাজ লক্ষাধিক সৈন্য নিয়োগ করা সত্ত্বেও সম্মুখ সংগ্রামে সাহসী না হয়ে বিশ্বাসঘাতকতার কূটকৌশলের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন (আরাকানের ইতিহাস : দেঙ্গা ওয়াদি আরেদ ফুং; পৃঃ ১৭, শ্রী সতীশ ঘোষের ‘চাকমা জাতি’, পৃঃ ২০, মাধবকর্মী চাকমার ‘শ্রী শ্রী রাজনামা, পৃঃ ২৭, ‘বর্মার ইতিহাস’ ঃ সুই মং ক্যা তং, পৃঃ ১৮১)। এর ফলে আবারো চাকমারা সেখান থেকে বিতাড়িত হয় এবং কিছু অংশ বাংলাদেশের সিলেট হয়ে চাদিগাঙে (চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম, ১৪৫০-১৫০০ খৃঃ ) প্রবেশ করে। এখানে তারা ‘চাকমা’ (CHAKMA) নামে পরিচিত হয়। এখানে এসে তাদের ভাষা বিভিন্ন পরিবারের ভাষা : আরবী, ফারসী, পর্তুগীজ, হিন্দী, ইংরেজী এবং বিশেষ করে নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা বাঙলা ও উপভাষা সিলেটী, চট্টগ্রামীর সাথে প্রচন্ড ডাক্কা খায়। এর ফলশ্রুতিতে ঐসব ভাষার প্রচুর শব্দ চাকমা ভাষায় ঢুকে পড়ে এবং আজো এর গতি অব্যাহত রয়েছে। চাম, শাক্য, চাংমা, চাকমারা বর্ণে (Racely) নব্য এশিয়াটিক মঙ্গোলয়েড (Neo Asiatic Mongoloid) কর্মে স্ত্রী-পুরুষ সমান পরিশ্রমী, জন্মে দারুণ জাত্যাভিমানী, ধর্মে বৌদ্ধ মতানুসারী, স্বভাবে সহজ সরল শান্তি প্রিয়।

অনার্য শাক্যরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশের কিছু অঞ্চল শাসন করে তখন আর্য আক্রমণের শেষ পর্ব চলছিল এবং ভাষার ইতিহাসে প্রাচীন ভারতীয় আর্য (Old Indo Aryan : 1500-600B.C.?) ও মধ্যে ভারতীয় আর্য (Middle Indo Aryan : 600B.C. 600A.D.?) ভাষার সন্ধি যুগ চলছিল। কিন্তু শাক্যরা যখন স্বদেশ থেকে নির্বাসিত হয় এর কিছু আগে হতেই মমধ্যভারতীয় আর্যভাষা পালি- প্রাকৃত, অপভ্রংশ, কথ্য ভাষারূপে জনপদে বিশিষ্ট আসন দখল করে এবং টিকে থাকার ক্ষমতাও অর্জন করে। প্রসঙ্গত, চাকমাদের ধর্মগ্রন্থ ‘আগরতারা’র (Agartara) কথা বলা যেতে পারে।

জার্মানীর গবেষক অধ্যাপক Dr. Heinz Bechert তাঁর The Chakmas A Buddhist Community in Bangladesh বলেন : Buddhism of to Chakmas had been quite different from orthodox Theravada before this reform initiated by the Sangharaja. The Chakmas had no Bhikkhus but Buddhist village Priests called Rari (usually spelt Raulee). These Raris are today considered a lower order of Buddhist priests in relation to the Bhikkus; but they still perform traditional religious rites. They wear a yellow robeslightly different from the robes of Bhikkhu, and Raris are initiated by a Rariguru. During the performence of the traditional rites, they read out the ancient Holy Scriptures called Akhar Tara or Agar Tara from palm leaf or paper manuscripts. The language of these books is not understood today, and they are written in the Chakma alphabet, which shows similarities to Shan, and earlier Burmese alphabets. From an analysis of this texts, it becomes clear that they consist of excerpts from Pali texts and passages in an unknown language which seems to belong to the Sino-Tibetan groups of languages. The extreme distortion of texts in the maenuscripts available today has made it impossible so far to classify this language beyond doubt. From the Pali passeges we can conclude that these texts represent Pali parittas with a commentary of the type represented by Burmese nissayas or Sinhalese sannayas. Thus, e.g. Sil-magal-tara is based on the Sigalovadasutta and it is read out during marriage ceremonies like the corresponding Pali text in other Buddhists countries. We can definitly reject the suggestions of some scholers that Agar Tara represent texts of triditions of Tantric Buddhism. Chakma Buddhism has always been of Theravada type, and the texts of the Agar Tara collection must have adopted from the collection of Parittas current in upper Burma and Arakan when the ancestors of the Chakmas had still lived there. [“JAGAJJYOTI”, A BUDDHA JAYANTI ANNUAL, 1973, INDIA.]

(ড. হেইঞ্জ বেচার্ট চাকমা বৌদ্ধধর্মকে থেরীবাদী বা হীনযান বলে ভূল মন্তব্য করেছেন। চাকমাদের ধর্মীয় গুরু ররি (Rori) বা পুরোহিতদের আচার-আচরণ, ধর্মীয় চিন্তা ভাবনা “আগরতারা” পাঠ করলে (চাকমা অনুবাদ) উপলব্ধি করা যায়। এতে কয়েকটি চীনা-তিব্বতীয় শব্দ থাকা যদিও স্বাভাবিক, আমার মনে হয় তা আসলে সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত মিশ্রিত সংকর ভাষা, যে ভাষা উত্তর ভারতের মহাযান (Mahaynism) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা চর্চা করতেন।) চাকমা ভাষাকে ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology), বাক্যতত্ত্ব (Syntex), এবং রূপতত্ত্ব (Morpology) এর বিচার ও সাদৃশ্যে মধ্যভারতীয় আর্যভাষা পালি প্রাকৃতের সমগোত্রীয় বলা হয়। বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে এখন আমরা বর্তমান চাকমা ভাষার (এখানে স্মরণীয় যে, পূর্বের চীন-শ্যামীয় পরিবারের চাকমা ভাষা লুপ্ত বলে ধারণা নিতে হবে।) সম্ভাব্য উৎপত্তির কালসীমা ও স্থান নির্নয়ে প্রয়াসী হতে পারি। চাকমা ভাষা হিমালয়ের পাদদেশ বা মগধের (সমগ্র উত্তর ভারতসহ) কাছে পিঠে খৃঃ পূঃ ৬০০- খৃঃ পূঃ ৬০০ অব্দের(?) ভেতরেই হওয়া উচিত।

চাকমা ভাষা বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশের প্রায় চার লক্ষাধিক লোকের মুখের ভাষা যা Lingua Franca বা আন্তর্জাতিক ভাষা মানের চাইতে বেশী। অবশ্য, এ হিসেব থেকে বর্তমানে অশান্ত থাইল্যান্ড ও তিব্বতের ‘চাকমিউ’ (CHAKMIU) উপজাতি এবং আপার বার্মার দৈনাক চাংমা’ (DOINAK CHAKMA)-দের বাদ দেয়া হয়েছে। কৃষ্টি-সংস্কৃতি যদি জাতির মহত্তম পরিচয় বহন করে থাকে তবে তারা এখনও অতীতের চাকমা কৃষ্টি-সংস্কৃতি লালন করে আসছেন। গভীর জঙ্গলে বাঁশ কাটার একটি দৃশ্য- থাই উপজাতি চাকমিউ তিনটি মেয়ে, যাদের মাথায় এখনো হবং বা হোবোই, পরনে পিনোন এবং হাতে একদায্যে তাগল বা দা প্রচলিত আছে। (দেখুন Encyclopadia Britannica, vol. 1. Agriculture plate XV, Frist print 1768)।

চাকমা লিপি বা বর্ণমালা (CHAKMA SCRIPT OR ALPHABET):

চাকমা ভাষার বর্ণমালাগুলোর চরিত্র ও কাল বিচারে Dr. Grierson তাঁর Linguestic Survey of India বইতে স্বীকার করেন যে- ” It is written in an alphabet which, allowng for its cursive form, is almost identical which the KHMER character, which was formerly in use in Cambodia, Laos, Annam, Siam and at least the southrern parts of Barma. The Khmer alphabets is, in its turn, the same as that which was current in the south of India in the Sixth and Seventh centuries. The Burmese character is derived from it, but is much more curupted than the Chakma.” (Vol.1. Part 1. P. 321 )

চাকমা বর্ণমালাগুলো ‘আ’ মাত্রা। যদিও ‘শান’ (Shan), আহোম (Ahom), খামতি (Khamti), বার্মিজ (Burmese), বর্ণমালাগুলোর সাথে চাকমা বর্ণমালাগুলোর সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যায় তবুও চাকমা বর্ণমালাগুলো ঐসব বর্ণমালাগুলোর উচ্চারণুযায়ী পৃথক । এই বৈসাদৃশ্যে ড. গ্রীয়ারসন আবার বলেন- “The most important point to notice in this alphabet is that the vowel inherent in each consonant is not a as in other Indian languages, but a. Note also that a (Chakma original alphabet a) the initial from ( there is, of course no not initial form) of a is treated as a consonant, much as the letter alif is treated as a consonant in Arabic.” (Vol. V. p. 322); ”এ ব্যাপারে Ashok Brahmi, Sham Chakma, Ahom, Khamti, Burmese, Thai, Arabic & Bengali লিপির একটি চার্টসহ আমার সম্পাদিত ‘ব প্রক’ ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত “বনফুল” এ ‘The Chakma Script’ প্রবন্ধে আলোচনা করেছি।

তামিল বর্ণমালা (Tamil Alphabet) সাথে চাকমা বর্ণমালার আশ্চর্য রকমের সাদৃশ্যতা গবেষক, কবি সুগত চাকমা স্বীকার করে আরও বলেন : “ শুধু বর্ণেই নয়, ‘গিরি’ উপাধিতেও। যেমন দক্ষিণাত্যে আজও বরাহগিরি, ভেঙ্কটগিরি অথবা মুঙ্গেদগিরি প্রভৃতি নামগুলি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ‘গিরি’ উপাধিটির ব্যবহার বিষ্ণুপ্রিয়াদের ওখানেও হতে দেখা যায় এবং কবি আলাওলের আরাকান প্রবেশের বছর দুই আগে ১৬৩৮-১৬৪৫ খৃষ্টাব্দে নৃপতিগিরি ৩ বছর রাজত্ব করেছিলেন” (ট্রাইবেল কালচারাল ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি থেকে আমাকে লিখিত সহ-পরিচালক সুগত চাকমার ১৫.৯.৭৮-এর চিঠির অংশ)।

চাকমা বর্ণমালায় মোট ৫ টি স্বরবর্ণ (Vowel) এবং ২৮টি ব্যঞ্জনবর্ণ (Consonant)। শোনা যায় (এমনকি অনেকে লেখার সময় প্রয়োগও করেন), এগুলো ছাড়াও ৫টি দন্তমুলীয়-মূর্ধন্য বর্ণ (alveolo-retraflex) ট, ঠ, ড, ঢ, ণ আছে। কিন্তু এ বর্ণগুলো চাকমা ভাষার উচ্চারণে একটিও নেই ।

হসন্তশব্দ: বাঙলা ভাষার চে’ হসন্তশব্দ বা হসচিহ্ন বা হসচিহ্ন ( ্) চাক্‌মা ভাষাতে প্রচুর। মুলতঃ হসন্ত না হলে চাক্‌মা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণই অসম্ভব। সবদিক দিয়েই হস্ চিহ্ন চাকমা ভাষায় উল্লেখযোগ্য দিক পালন করে। যেমনঃ ‘ৎসদক’ [ ৎস+দ+ক+অ]- চাকমা ভাষায় যার যথার্থ কোন শব্দ এবং অর্থ কোনটাই নহয় না। কিন্তু ‘ৎসদক’ বললে আমরা একটি শুদ্ধ চাকমা শব্দ পাই যার অর্থ রশ্মি। তদ্রুপ, কোৎসপানা- কোৎস্পানা (ভালোবাসা), লন্ডন-লন্দন, রমেশ-রমেস, লোবিয়োত-সোবিয়োত (আদর- আপ্যায়ন), ঘুনত্যিমুনত্যি-ঘুত্যিমুত্যি (সুসম্পর্ক) ইত্যাদি।

ফলাশব্দ: চাকমা ভাষায় মাত্র তিনটি ফলা শব্দের উচ্চারণ বেশী পাওয়া যায়। র-ফলা : ‘এব্রে’, বাবালোই মামাৎসুউলোং গত্তনে ‘যক্রে যক’ (হবিধবি রূপকথা), ‘তেঙ ক্রক্ ক্রক্ গরেল্লে মামা পেলে বেক পায়’ (মনবিলাত্য রূপকথা) ইত্যাদি।

য-ফলা: ‘মানেই কুলোর বোত্তিয়ান ৎসম্পকনগর ভিলি নাং। বাগে তেগে গাঙ যিয়্যে, বিত্যয়গিরি নাঙ হোইয়্যে৷-চাদিগাং ছারা ব্যালড। (মানব কূলের আলোর শিখা, চম্পকনগর সেই রাজ্যের নাম। অজস্র-বাঁকে তীরে সহস্র নদী ফল্গু ধারায় প্রবাহিত, এর সাথে চাকমা রাজা বিজয় গিরির নাম এক হয়েছে): ‘বাদদ্যে পুত্যো’, ‘যেস্যেক’, ‘এককান্যা’, ‘একগঙ্যা’ ইত্যাদি।
ন-ফলা: ‘আত্যুরী পিত্যুরী বান্যে ৎসুল সুন্দর সান্দ’ (চান্দবী বারমাসী): (মেঘবরণ চুল আচড়িয়ে খোপা করে বেঁধেছে সুন্দরী চান্দবী)’ ‘ত্ন- স্ন’ (মতিহীন), ‘ঘ্ন ঘ্ন ৎেসাগত্ব ‘র’ ( ঘন ঘন চোখের ইশারা) ইত্যাদি ।

ধ্বনি পরিবর্তন ( changing of sound) :

শ্ৰুতি ধ্বনি (glide) : স° শৃগাল> চা° সিআল, স্যাল; স° নাব > প্রা° নাও > চা° ন।
বিষমীভবন (dissimilation) : চা° যাগাগান> যাগায়ান; স° মর্মর লা° marmor ই° marble চা° মার্পেল; স° মুকুল > প্রা° মউল > বউল > চা° বোহ্’ল্ ।
বর্ণবিপর্যয় বা বিপয়াস (metathesis) : চা° মামরা > মার্মা (লক্ষনীয় যে, রা-এর অ ধ্বনি ম-এতেও পরিবর্তন হয়েছে।)
স্বরাগম ( Prothesis) : হি° হদিশ > চা° উদিস; চা° কধা > অকধা >; ই° সিভিল > চা° অসিভিল; আ° হজম > চা° অৎযম।
সমাক্ষরলোপ(haplology): পর্তু° annanas > চা° আনাস; চা° হানেক্‌খন >হাক্কন ।
সমীভবন ( assimilation) : ১. প্রগত ( Progresive ) – চা° ইনৎেযব > ইৎেযব ; স° পদ্ম > চা° পদ ; বোভো° গাম (good) > চা° গম’; স° বন্ধু > চা° বন্ ।
২. পারস্পারিক (mutual)— স° উধ্ব > প্রা° উব্ভ > চা° উবা, উবো।
৩. পরাগত (regresive)- চা° অক্ত > অক্’ত > অত্ত।
স্বরসংগতি ( vowel harmony) : ১. প্রগত – স° তুলা > চা° তুলো।
২. মধ্যগত— আ° বান্দা > চা° বন্দা।
আদিস্বরলোপ (ophesis) : স° উদ্ধার > চা° উধার > চা° ধার ।
মধ্যস্বরলোপ  (syncope) : স° মৎস্য > পা° মচ্ছ > চা° মাৎস।
ফার° তনখা (সৈন্যদের বেতন) > ম° বা° তঙ্কা > চা° তেঙা।
অন্তস্বরলোপ (apocope) : স° চন্দ্ৰ > পা’চন্দ > চা° ৎসান্।
নাসিক্যভবন (nasalization) : স° বক্র > চা° বেঙা ; চা° গঙ্ (গতি) > চা° গাঙ্ ( নদী) > চা° গঙা ( জলদেবী) ? গদগদ শব্দ > গগ্গা > গঙা ?
অভিশ্রুতি (umlaut) : স° হউক > চা° হোক; স° রাত্রি > প্রা° রাত্তি, রাতি, রাইত > চা° রেত্, রেইত্‌।
ব্যঞ্জনাগম : স° বানর > চা° বান্দর।
ঘোষীভবন (vocalization) : স° শাক > চা° সাগ্।
র-কারীভবন (rho-faction): স° পঞ্চদশ > প্রা° পনডহ >চা° পন্দর> বা° পনর।
লোক-ব্যুৎপত্তি (folk-etymology ) : ই° injection > চা° ইনিসন্, ইনিসন্ ; ই° headmaster > চা° হে্দ মাস্তর।

লেখক: সুহৃদ চাকমা

সূত্র: সুহৃদ চাকমার স্মারকগ্রন্থ (২০০৫)

আরও পড়ুন- “চাকমা ব্যাকরণ”

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

One thought on “চাকমা ভাষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *