চাকমা ভাষার বিতর্কিত তিনটি বর্ণের ব্যবহার ও প্রতিবর্ণীকরণের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

ভাষার মূল উপাদান হচ্ছে ধ্বনি। অথচ অনেকেই এই ভাষার মূল উপাদান এবং ব্যাকরণের প্রধান আলোচ্য বিষয় ধ্বনিতত্ব নিয়ে ওয়াকিবহাল নয়। প্রকৃতপক্ষে এই ধ্বনি থেকে বর্ণ, বর্ণ থেকে শব্দ, শব্দ থেকে বাক্যের সৃষ্টি। ধ্বনির লিখিত রূপকে বলা হয় বর্ণ। এ বর্ণের সাহায্যে শব্দ এবং বাক্য তৈরি করে মনের ভাব লিখে প্রকাশ করি।

দ্রুত বলা,  অসচেতনতা আরো অনেক কারণে ধ্বনির পরিবর্তন হয়ে থাকে। আমি সে দিকে না গিয়ে মূল আলোচনায় আসি। আমার আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চাকমা ভাষার বিতর্কিত তিনটি বর্ণের (চুচ্যাঙ্যা-𑄇, গুজঙ্যা-𑄈, উবোরমুও-𑄦) ব্যবহার ও প্রতিবর্ণীকরণের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা।

সংবিধান মানুষ দ্বারা তৈরি করা হলেও মানুষ চলে সংবিধানের নিয়মানুসারে, ঠিক তেমনি ব্যাকরণ ভাষার দ্বারা তৈরি হলেও ভাষা চলে ব্যাকরণের বিধি অনুসারে। তাই ব্যাকরণকে ভাষার সংবিধান বলা হয়। সুশৃঙ্খলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান প্রয়োজন আর ভাষাকে সঠিকভাবে ব্যবহার উপোযোগী করার জন্য ব্যাকরণ অত্যাবশ্যাক।

তাই ব্যাকরণ বাদ দিয়ে বর্ণের সঠিক উচ্চারণ করা তথা শুদ্ধভাবে পড়া, লেখা ও বলা সম্ভব নয়। যেমন- ক আর খ’কে ‘ক’, গ আর ঘ’কে ‘গ’, চ আর ছ’কে ‘চ’, জ আর ঝ’কে ‘জ’ উচ্চারণ করে গুলিয়ে ফেলে অনেকে।

যার ফলশ্রুতিতে বাংলা বর্ণে চাকমা শব্দ লিখতে গিয়ে ধরা খাই। গাঝর (গাছের) বুঝাতে লেখে ‘গাজর’ (মূলা জাতীয় খাদ্য) , মাহ্জন (ধনী) বুঝাতে লেখে ‘মাজন’ (দাত মাজার জন্য ব্যবহার করা হয়)।

ফলে, একটি অর্থ বুঝাতে গিয়ে ভিন্ন আরেকটি অর্থ প্রকাশ পাচ্ছে। এরকম ভুল বানান প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা/চর্চা হচ্ছে। যার একমাত্র কারণ হচ্ছে ধ্বনি জ্ঞানের অভাবে বর্ণের যথাযথ ব্যবহার না করা।

আবার মাঝে মাঝে বানানের ভিন্নতা নিয়ে ওঠে সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক। সেটাকে অবশ্যই আমি নেগেটিভ বলব না বরং একে অপরের যুক্তি তর্কের মাধ্যমে শুদ্ধ বানান চর্চা হোক সেটাই আমি চাই।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেকে শুধু আত্নপক্ষকে সমর্থন করে যায় কিন্তু অন্যের মতামতকে বুঝার চেষ্টা করে না। সাধারণতঃ যারা চাকমা বর্ণমালা ভালোভাবে আয়ত্ব করেছে তারা অপেক্ষাকৃত বানানে ভুল কম করে। আর যারা ব্যাকরণ তো দূরের কথা চাকমা বর্ণমালার ধারে কাছেও যায় নি তারা নিজেদের মতো করে লিখতে থাকে।

চাকমা বর্ণমালা পারলে যে একেবারে শুদ্ধ বানান লিখতে পারে তাও বলছি না, কিন্তু অন্যদের চাইতে তারা সচেতনভাবে বানান লিখে বলে তাদের ভুলের পরিমাণটা কম । বানানের সকল সমস্যা দূর করতে হলে আগে চাকমা বর্ণগুলির সঠিক উচ্চারণ, ব্যবহার ও অন্য ভাষায় প্রতিবর্ণ কি হবে তা বিহিত করতে হবে।

আমি নিম্নে বিতর্কিত তিনটি বর্ণের (চুচ্যাঙ্যা-𑄇, গুজঙ্যা-𑄈, উবোরমুও-𑄦) ব্যবহার ও প্রতিবর্ণকরণের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি-

১. চুচ্যাঙ্যা-কা (𑄇) এর বাংলা প্রতিবর্ণ ‘কা’ কেন? ‘হা’ নয় কেন?

প্রথমতঃ  চুচ্যাঙ্যা-কা (𑄇) হচ্ছে অল্পপ্রাণ, বাংলা বর্ণ ‘ক’ও অল্পপ্রাণ। কিন্তু ‘হ’ হচ্ছে মহাপ্রাণ। যারা অল্পপ্রাণ আর মহাপ্রাণ বর্ণের সংজ্ঞা জানেনা তাদের জন্য বলছি- যে বর্ণসমুহের উচ্চারণ কম দীর্ঘ হয় অর্থাৎ  ফুসফুস তাড়িত বাতাস কম প্রবাহিত হয় সেগুলো অল্পপ্রাণ বর্ণ  আর যে বর্ণসমুহের উচ্চারণ দীর্ঘ হয় অর্থাৎ  ফুসফুস তাড়িত বাতাস অধিক প্রবাহিত হয় সেগুলো মহাপ্রাণ বর্ণ।

এখানে আরেকটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে যে, দ্রুত বলার সময় অনেকে চুচ্যাঙ্যা-কা (𑄇)টিকে ‘হা’ কিংবা ‘হাআ’ উচ্চারণ করে। যা কিন্তু ব্যবহারে বা প্রয়োগের ক্ষেত্রে একেবারে অযৌক্তিক।

একটা সহজ উদাহরণ দিই, ‘চাক্কা’ চাকমাতে লিখলে হয় চাককা (𑄌𑄇𑄴𑄇)। এখানে মধ্যে এবং অন্ত্যে দুইটি ‘𑄇’ বা ‘ক’ রয়েছে আর এদের উচ্চারণ একদম বাংলা ‘ক’ এর ন্যায় স্পষ্ট। চুচ্যাঙ্যা-কা না হয়ে যদি চুচ্যাঙ্যা-হা হতো তাহলে এর বানান নিশ্চয় চাহ্’হা দাড়াতো। যারা সবসময় ‘হা’ এর পক্ষে সাফাই গাইছেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, চুচ্যাঙ্যা-কা (𑄇) কে যদি আমরা ‘হা’ ধরি তাহলে ‘চাককা’তে ক্/কা উচ্চারণের জন্য কোন বর্ণকে দিয়ে লিখব?

চুচ্যাঙ্যা-কা (𑄇)কে ‘হ’ এর কাছাকাছি উচ্চারণ করি ঠিক, কিন্তু ‘হ’ এর মতো দীর্ঘস্বরে উচ্চারণ করি না। তাই প্রথমে বলেছি, বাংলার ‘হ’ মহাপ্রাণ আর চুচ্যাঙ্যা-কা (𑄇) অল্পপ্রাণ। যদিও সহজে ধরা পড়ে না; কিন্তু একটু সচেতনভাবে কাজা (𑄇𑄎) আর খাজা/হাজা (𑄈𑄎) উচ্চারণ করলে তা বোঝা যায়।

চুচ্যাঙ্যা-কা(𑄇)কে  আমরা ‘হা’এর কাছাকাছি উচ্চারণ করি শুধুমাত্র স্বাধীন অবস্থাতে। যেমন- 𑄇𑄎𑄧𑄢𑄴 = কাজর (ময়লা), 𑄃𑄧𑄟𑄧𑄇𑄧𑄘𑄧 = অম’কদ (অত্যন্ত) শব্দদ্বয়ে কা (𑄇) বর্ণটি আদি এবং মধ্যে স্বাধীন অবস্থায় রয়েছে বিধায় ‘হ’এর কাছাকাছি বা কোমল স্বরে উচ্চারিত হয়েছে।

চাকমা ভাষাভাষীদের এ কোমল উচ্চারণ তাদের আদি বৈশিষ্ট্য নাকি কোনকালে স্পষ্ট ‘ক’ এর উচ্চারণ হারিয়ে ফেলেছে তা গভীর গবেষণার বিষয়। তবে চাকমাদের এ কোমল উচ্চারণের জন্য কথ্যভাষার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা থেকে চাকমা শব্দগুলি পার্থক্য করা সহজ।

তবে, এ কথা বলা সঙ্গত যে,  বাংলা বর্ণ দিয়ে চাকমা শব্দ লেখার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভাষাভাষীদের উচ্চারণের তারতম্য ঘটার সম্ভাবনা থাকলেও শব্দের উৎস জানার সুবিধার্তে প্রচলিত এ নিয়মে বানান লেখা উচিত। তারতম্য ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে বিকৃতি রোধে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

২. চুচ্যাঙ্যা-কা(𑄇) এর স্থলে না হয় ‘কা’ লিখবো কিন্তু গুজঙ্যা-খা (𑄈) এর স্থলে ‘হা’ নয় কেন?

ধ্বনিগত বিষয়টা বাদে বাকিটা ঐ চুচ্যাঙ্যা-কা এর মতো। ধ্বনিগত বিষয়টা বাদে বলছি একারণে- গুজঙ্যা-খা (𑄈) এবং বাংলা বর্ণ ‘হা’ উভয়ই মহাপ্রাণ। তাহলে এর মূল পার্থক্যটা কোথায়? তা জানতে হলে আরো গভীরে যেতে হবে। ধ্বনিগত আর উচ্চারণগত এক হলেও গুজঙ্যা-খা (𑄈) এর প্রতিবর্ণ ‘হা’ নয়।

এর উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় বর্ণ ব্যবহারে। তাই দেখার আর ভাবের বিষয়টি এখানে সম্পূর্ণ আলাদা। দীর্ঘকাল ধরে অনেক চাকমা সাহিত্যিক ও ভাষা গবেষকরা গুজঙ্যা-খা (𑄈) এর প্রতিবর্ণ হিসেবে ‘খা’কে ব্যবহার করে আসছে।

সেটা আপাতদৃষ্টিতে ভুল মনে হলেও বহু আগে তারা এই সমস্যার সমাধান দিয়ে গেছেন। অথচ আমরা অধিকাংশই প্রতিবর্ণ হিসেবে ‘হা’এর জোর দাবি জানিয়ে ব্যবহার করছি।

বুঝার সুবিধার্তে উদাহরণ দিই- অকখর (𑄃𑄧𑄇𑄴𑄈𑄧𑄢𑄴), লকখন (𑄣𑄧𑄇𑄴𑄈𑄧𑄚𑄴) শব্দদ্বয়ে ‘𑄈𑄧’ এর উচ্চারণ ‘খ’এর ন্যায়। কিন্তু যখন আদিতে গুজঙ্যা-খা (𑄈) বসে তখন কোলম স্বরে ‘হা’ এর ন্যায় উচ্চারিত হয়। যেমন- খানা/হানা (𑄈𑄚), খলা/হলা (𑄈𑄧𑄣)।

আবার যখন হলান্ত অবস্থায় থাকে তখন এটি ‘খ্’ এর মতো ব্যবহৃত হয়। যেমন-  আখ (𑄃𑄈𑄴)। গুজঙ্যা-খা(𑄈) এর প্রতিবর্ণ যদি ‘হ’ ধরা হয় তাহলে উপরোক্ত শব্দগুলোর বানান- অকহর, লকহন, হলা, আহ্ হতো। তাই চাকমাদের উচ্চারণভঙ্গী কোমল হওয়াতে প্রকৃতপক্ষে উচ্চারণ ‘খা’ হলেও তা স্বাধীন অবস্থাতে ‘হা’ উচ্চারণ হয়। অপরপক্ষে কিন্তু খ/খা হিসেবেও ব্যবহার করে থাকি।

৩. উবোরমুও-আহ্ (𑄦) নাকি উবোরমুও-হা?

চুচ্যাঙ্যা-কা (𑄇) ও গুজঙ্যা-খা (𑄈) বর্ণগুলোর (একক) প্রতিবর্ণ যথাক্রমে ক ও খ থাকলেও উবোরমুও-আহ্ এর (একক) প্রতিবর্ণ বাংলা বর্ণমালায় না থাকাতে অনেকে ‘হ’এর নিচে হসন্ত চিহ্ন (হ্) দিয়ে অহ্ (𑄦𑄧), আবার সেই সাথে আ-কার (া) জুড়ে দিয়ে ‘আহ্’ (𑄦) প্রকাশ করে থাকেন।

আবার অনেকে শুধু ‘হ’ এবং ‘হা’ লিখে যথাক্রমে ‘অহ্’ এবং ‘আহ্’ প্রকাশ করেন। সে যাই হোক, যে যেভাবে বানান লিখুক না কেন অধিকাংশই এ বর্ণটিকে উবোরমুও-আহ্(𑄦) হিসেবে গ্রহণ করেছেন তা তাদের শব্দের অর্থ প্রকাশের উদ্দেশ্য দেখে বোঝা যায়।

উপরোক্তভাবে বানান লিখার ক্ষেত্রে আমি একমত কিংবা দ্বিমত কোনটিই নই। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘আহ্’ উচ্চারণের যথার্থতা বিশ্লেষণ করা। তাহলে দেখা যাক-

চাকমা শব্দের আদিতে এবং মধ্যে ‘আহ্’ সহকারে উচ্চারিত বহুল ব্যবহৃত শব্দ রয়েছে। শব্দের আদিতে ‘আহ্’ দিয়ে উচ্চারিত শব্দের মধ্যে রয়েছে- আহ্’ত (𑄦𑄖𑄴) = হাত, আহ্’ত্যার (𑄦𑄖𑄴𑄳𑄠𑄢𑄴) = হাতিয়ার, আহ্’দুরু (𑄦𑄘𑄪𑄢𑄪) = হাতুড়ি, আহ্’জার (𑄦𑄎𑄢𑄴) = হাজার , আহ্’বা (𑄦𑄝) = হাওয়া ইত্যাদি।

এখানে লক্ষ্যনীয় যে, উল্লেখিত যে সকল বাংলা শব্দগুলির আদিতে ‘হা’ রয়েছে সেসকল চাকমা শব্দগুলিতে ‘আহ্’ (𑄦) রয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উবোরমুও-হা নয় বরং আহ্ (𑄦) হিসেবে এটি চাকমা ভাষায় ব্যবহার হয়ে আসছে।

অতএব, চাকমা শব্দ লেখার ক্ষেত্রে এ বর্ণটি ‘আহ্’ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে অন্য ভাষার শব্দ লেখার ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই ‘হা’ এবং প্রয়োজনে ‘আহ্’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ চাকমা উবোরমুও-আহ্ বর্ণটি ইংরেজি এইচ (H)এর মত কখনো হা আবার কখনো আহ্ হিসেবে ব্যবহার হয়।

তবে এটা ঠিক যে, চাকমা ভাষার নিজস্ব শব্দ এবং বিকৃতি হয়ে চাকমাতে ঢুকে পড়া শব্দগুলোর ক্ষেত্রে ‘আহ্’ হিসেবেই থাকবে। এবং বিভাষী শব্দের ক্ষেত্রে উভয়ভাবে ব্যবহার হতে পারে। যেমন- হাতি (𑄦𑄖𑄨), হাসপাতাল (𑄦𑄥𑄴𑄛𑄖𑄣𑄴), হিউম্যান (𑄦𑄨𑄃𑄪𑄟𑄳𑄠𑄚𑄴), অনার (𑄦𑄧𑄚𑄢𑄴), আওয়ার (𑄦𑄤𑄢𑄴) ইত্যাদি𑅁

আমি আশা করি, এ প্রবন্ধটি পড়ে বিতর্কিত এ তিনটি বর্ণ ব্যবহারে আপনার সংশয় কিছুটা হলেও দূর হয়েছে। পরিশেষে সকল চাকমা ভাষাভাষীদেরকে নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা শেখা এবং সঠিকভাবে চর্চা করার জন্য সবিনয়ে অনুরোধ জানাচ্ছি। এ বিষয়ে আপনার কোনো মূল্যবান মতামত থাকলে ‍sujanchangma.cht@gmail.com -এ ঠিকানায় জানাতে পারেন।

✍ লেখক: সুজন চাঙমা জুম্মোধন

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *