চাকমা লিপির প্রতি ছেলেবেলাকার কৌতুহল ও নামহীন তিনটি চাকমা হরফের নামকরণ

চাকমা লিপির সাথে পরিচয়:

বিগত শতকের পঞ্চাশ দশকের কথা, ১৯৫৮ কী’ ৫৯ সালের দিকের কথা। তখনও রাঙ্গামাটি শহরের চারিপাশে কাপ্তাই হ্রদের জলের পানি আসেনি। আমরা একটি সবুজ পাহাড়ে থাকতাম। এর উত্তর পার্শ্ব মানে ডান পার্শ্ব ঘেষে রাঙ্গামাটি থেকে ধূ ধূ বালুময় একটি সড়ক পশ্চিম দিকে চট্টগ্রামের দিকে চলে গেছে।

আবার ঐ পাহাড়ের পূর্বপার্শ্ব ঘেষে আরাে একটি সড়ক রাঙ্গামাটি থেকে দক্ষিণ দিকে মুখ করে চন্দ্রঘােনার দিকে চলে গেছে। সে সময় দু’ ঘন্টা পর পর রাঙ্গামাটি থেকে বাসগুলি ধূলি উড়িয়ে চট্টগ্রাম শহরের দিকে চলে যেত। যে পাহাড়টির কথা বলছি সে পাহাড়টি ঝগড়াবিল মৌজার উত্তর সীমানা রেখা বরাবর অবস্থিত।

এখন এগ্রিকালচার ফার্ম এলাকার সাথে এটিকে এদের মধ্যবর্তী স্থানে মাটি ভরাত করে রাস্তা তৈরি করে সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি বর্তমানে ট্রাইবেল অফিসার্স কলােনীর দক্ষিণ দিকে, তবলছড়ির পার্শ্বস্থ মাস্টার্স কলােনীর পশ্চিম দিকে এবং এগ্রিকালচার (ফার্ম) অফিসের পূর্ব দিকে অবস্থিত। এ পাহাড়টি স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ আমার পিতামহ কৃঞ্চ কিশাের চাকমা তার চাকুরী জীবনকালীন সময়ে তার নামে বন্দোবস্তি নিয়েছিলেন।

এ পাহাড়টি আমার জন্মস্থান এবং আমার শৈশবের সবচেয়ে ভালােলাগা স্মৃতিময় স্থান। এর সাথে আমার শৈশবের বহু স্মৃতি ও ভালােলাগা জড়িয়ে আছে। সেই পাহাড়ে আমাদের বাড়ির পাশাপাশি ও কাছাকাছি বড়জ্যেঠা এবং মেঝজেঠার বাড়ি ছিল। পরে
আমাদের পীসাবাবুও একটি বাড়ি নির্মান করে ছিলেন। এ সব বাড়ির মধ্যখানে ছিল এক বিরাট উঠান। আমরা জেঠুতাে এবং খুড়তাে ভাইবােনেরা সেই বিরাট উঠানে হেসে খেলে দিন কাটাতাম।

কখনাে বা রাতে জোছনা নামতো। বাইরে উচু বেঞ্চ ছিল। বাবা তাতে শুয়ে শুয়ে কখনাে বা খাতায় লেখা কী সব মজার বারমাসী, কবিতা, কিংবা গান অথবা অপরিচিত আখরে অন্য কিছু পড়তেন। বাবার খাতায় হিজিবিজি কী সব লেখা ছিল। মাঝেমধ্যে সে সব খাতার লেখাগুলির প্রতি তাকিয়ে দেখেছি, একটি বর্ণও চিনতে পারিনি কি সব দুর্বোধ্য লিপি।

সেই ছােট্ট বয়সেও জানতাম সেগুলি চাকমা লিপি বা বর্ণে লেখা, বাবার হাতে লেখা বাবার নিজ হাতে অনুলিপি করা কোনাে বারমাসী, কবিতা কিংবা অন্য কোনাে বিষয় হবে? আমাকে চাকমা লেখা শিখানাের জন্য সেই ছােট্ট বয়সেও বাবাকে বলেছি। বাবা বলতেন- আরাে একটু বড় হও, তখন চাকমা লেখা শিখাবাে ।

সে সময় বাবা দেবব্রত চাকমা একজন কৃষি অফিসার হিসেবে রাঙ্গামাটি থেকে দূরে কাউখালী রানীর হাট, শিয়ালবুক্যা(বেত বুনিয়া) এসব এলাকায় গিয়ে (সাইকেলে চড়ে) কাজ করতেন। কাউখালী এলাকায় ইছামতি নদী তীরে রাঙ্গীপাড়ায় এক অবস্থাপন্ন গৃহস্থের বাড়িতেও (কখনও কখনও) থাকতেন।

তার সংগৃহীত ‘চান্দবী বারমাস’ নামক বারমাসীর কপিটিও (হয়তাে) সেখানেই তিনি নিজ হাতে কপি করে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। তার সেই অনুলিপিকৃত ‘চান্দবী বারমাস’ বারমাসীটি আমি রাঙ্গামাটিস্থ উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ( বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃ-গােষ্ঠির সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট) জমা দিয়ে দিয়েছি।

বাবা তার বহু ব্যস্ততার মাঝে আমাকে চাকমা লেখা শিখনাের সময়ই পাননি। এর মাঝে ১৯৬০-৬১ সালের দিকে পুরাতন রাঙ্গামাটি শহর কর্নফুলী নদীর উপর নিমির্ত কাপ্তাই হ্রদের জলে ডুবতে শুরু করেছিল। পুরাতন রাঙ্গামাটি শহরে আমার মাতামহ বলভদ্র তালুকদার (তখন এডিশনাল এসডিও) সরকারী কোয়ার্টারে থাকতেন।

পূর্ব পাশেই কর্ণফুলী নদী ও দক্ষিণ দিকে সন্নিকটে ছিল পুরাতন রাঙ্গামাটি বাজার। ডুবার আগেও পুরাতন রাঙ্গামাটি শহর দেখতে গিয়েছিলাম। মাঝে মধ্যে ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল। নানাদের বাড়ির উত্তর দিকে অবস্থিত বিশাল খেলার মাঠটির চারিপাশের পাকা রাস্তার উপর দিয়েও পানি গড়িয়ে গড়িয়ে পার হচ্ছিল।

এর কিছুদিন পরে পুরাতন রাঙ্গামাটি শহরটি ডুবে গেল। ডুবার কিছুদিন আগেও নানারাও আমাদের উত্তর দিকে ট্রাইবেল অফিসার্স কলােনীতে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে এসেছিলেন। এর কিছুকাল পরে আমাদের বাড়ির পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর পার্শ্বের সব এলাকা কাপ্তাই হ্রদের অতল জলের তলায় তলিয়ে গেল।

আরাে কিছুকাল পরে আমরা আমার শৈশবের পাহাড়টি ছাড়লাম। সেই সাথে হারিয়ে গেল আমার শৈশবের স্মৃতিময় দিনগুলি। একসময় আমরা খাগড়াছড়ি এলাম। তার আগে বাবা খাগড়াছড়ি জেলাতে বদলী হয়ে এসেছিলেন খাগড়াছড়ি সদরের মহাজন পাড়ায় পাহাড় চূড়াটি বাদ নিয়ে একটু নিচে বাবা বাড়ি করার জন্য ঠিক করে একটু একটু মাটি কেটে সমান করতেন তখন বালক বয়সে আমি তার পাশে ঘুর ঘুর করে বেড়াতাম। সেখানে আমাদের দ্বিতীয় বাড়িটি হলাে ।

চাকমা বর্ণমালা শেখা:

১৯৬০ এর দশকের কথা, তখন মহকুমা সদর ছিল রামগড়ে আর খাগড়াছড়িতে থানা ও হয়নি খাগড়াছড়ি হাইস্কুলে ভর্তি হলাম। ক্লাশ ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা হয়। এতে মেধাবৃত্তিতে বৃত্তি পেয়ে শিক্ষকদের স্নেহ ও সুদৃষ্টি পেয়ে গেলাম। মহাজন পাড়ায় সুরথ্যা বাপ নামে এক বৈদ্য ছিল যৌবনকালে সে বেশ বলী ছিল বলে শুনেছি।

পিতৃকুলে তার আত্মীয় স্বজন দেওয়ান ছিল বলে শুনেছি। তবে কিন্তু সে ছিল গরীব। গ্রামে বয়সে আমার সিনিয়র কিছু ছাত্র ছিল। যুব বয়সের এসব ছাত্রদের কারোর কারোর কাছে একবার ঝােক চাপলাে, তারা সুরথ্যাবাপের কাছে চাকমা লেখা শিখবে। তারপর তারা কয়েকদিন অবসরের সময় তার কাছে চাকমা লেখা শিখার জন্য হাটাহাটি শুরু করে দিল।

সুরথ্যাবাপের বাড়িটি আমাদের বাড়ি থেকে তিন চার শ” গজ দুরে ছিল। ঐ সব যুবকদের কেউ চাকমা হরক শিখতে পেরেছিল কিনা জানি না। তাদের বেশির ভাগ যে চাকমা লেখা শেখার কাজে ভদ দিয়েছিল এতে কোনাে সন্দেহ নেই। তবে তাদের গল্প গুজব, তন্ত্রমন্ত্র, ভূত-দেও চালান, থামানাে, বশীকরন ইত্যাদি আমাকে মনে মনে কৌতূহলী করে তুলছিল।

এমন সময় চাকমা লেখক নােয়ারাম চাকমার লেখা ‘চাকমার পত্থম শিক্ষা’ (১৯৫৯ খ্রিঃ) বইটি পেয়ে গেলাম। এই বইটি থেকে আমি চাকমা লেখা (বর্ণমালা) নিজে নিজে শিখলাম। নােয়ারাম বাবুর প্রতি আমি এজন্য খুব কৃতজ্ঞ।

তিনটি নামহীন বর্ণের নামকরণ ও গবেষণা:

১৯৭২ সালে আমরা জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর (জুভাপ্রদ) গঠন করে যখন চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় নতুন নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করে প্রচারে নেমেছিলাম তখনও তিনি চিঠি দিয়ে জুভাপ্রদের লেখক ও কর্মীদের উৎসাহিত করেছিলেন।

সে সময় একবার তিনি তিনটিলার দিক থেকে রাঙ্গামাটি এলেন তার লেখা বইটির দ্বিতীয় সংস্করন প্রকাশের ব্যাপারে আর্থিক সহযােগিতা লাভের জন্য। রাঙ্গামাটিস্থ বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর উত্তর দিকস্থ মাঠটিতে আমাদের দেখা হয়েছিল। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরে তাকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেছিলাম।

আমাদের আলাপের সময় তিনি একজন মাছ ধরে জীবন নির্বাহ করা লােকের গল্প করেছিলাম। দুঃখের কথা তার বইটির দ্বিতীয় সংস্করন বের হয়নি। জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর ১৯৭৩ সালে আমার (ননাধন চাকমা) সম্পাদনায় চাকমা বর্ণে ‘চাকমা নাদা’ (চাকমা বর্ণমালা) এবং ‘চিজির বই’ নামক একটি শিশুপাঠ্য বই প্রকাশ করেছিল।

বইটিতে চাকমা লিপির নামহীন তিনটি হরকের নাম প্রথমবারের মত করা হয়েছিল। সেগুলি হলাে, “লেজউভা এ(𑄆)”, “বচ্চি উ(𑄅)” এবং “ডেলভাঙা ই(𑄄)”। সেই সময়ে এই বইটি সাইক্লোস্টাইন্ড করে প্রকাশ করা হয়েছিল, চাকমা তরুন ও সুধীসমাজকে এই বইটি ‘চাকমা লেখা শিখার জন্য নাড়া দিয়েছিল।

জুভাপ্রদের আন্তরিক প্রচেষ্টা পরবর্তীকালে লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছিল। অতঃপর ক্রমে ক্রমে বিখ্যাত ব্রিটিশ ভাষাবিদ ও পন্ডিত ড. জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সনের Linguistic Survey of India, Vol-V চাকমা ভাষা ও লিপির ব্যাপারে Part-1 – Chakma Sub-dialed শিরােনামে তার মূল্যবান লেখাটি পড়লাম।

তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স বিষয় নিয়ে অনার্স পড়ি। ১৯৭০ সালে সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ছাত্র হলেও পরবর্তীকালে বাংলা বিভাগের দু’তিন জন খ্যাতনামা (পরবর্তীতে স্বনামধন্য) অধ্যাপকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল।

তাদের মধ্যে অন্যতম অধ্যাপক মনিরুজ্জামান সাহেব (পরবর্তীতে ভারতে PHD) আমাকে স্নেহ করতেন। তার লেখাতে ড. গ্রিয়ার্সন চাকমা বর্ণমালার গুরুত্ব নিয়ে বিস্তৃত আলােচনা করেছিলেন। ঐ সময় তৎকালীন চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস ডিস্ট্রিক্টের এসিস্টেন্ট কমিশনার J.A. Cave Brown সে সময়কার চাকমা সমাজের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি কৃষ্ট চন্দ্র দেওয়ানের মাধ্যমে চাকমা বর্ণগুলি (ভারতের গয়াতে চাকুরীরত?) ড. গ্রিয়াসনের নিকট পাঠিয়েছিলেন।

এগুলিই ১৯০৩ সালে গ্রিয়ার্সনের ঐ বইটিতে ১৯০৩ সালে কলিকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। আমার জানা মতে ড, গ্রিয়ার্সনই সর্ব প্রথম চাকমা বর্ণমালাকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মন-খেমর দলের অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন।

তিনি ইংরেজীতে এ সম্বন্ধে যা লিখেছেন তার বঙ্গানুবাদ করলে দাড়ায় -” টানা (হাতের) লেখায় এগুলি এমন এক বর্ণমালায় লিখিত যা খেমার (কেম্বােডিয়ান) বর্ণমালার সাথে প্রায় একেবারে সাদৃশ্যপূর্ন যেগুলি কিনা অতীতে কেন্দোডিয়া, লাওস, আনাম (দক্ষিণ ভিয়েতনাম) , শ্যাম(থাইল্যান্ড) এবং দক্ষিণ বার্মা (মিয়ানমার) তে ব্যবহৃত হয়েছিল।

ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত বর্ণমালার সাথে খেমার বর্ণগুলি লেখার (টানের) দিক থেকে মূলত একই ধরনের। বর্মী বর্ণগুলি (Burmese character) তা থেকে উদ্ভূত হয়েছে তবে চাকমা বর্ণগুলির চেয়ে অধিকতর বিকৃত অবস্থায়, “ড. গ্রিয়ার্সনের উপরােক্ত মন্তব্য থেকে এ কথা প্রতিভাত হয় যে, মৌলিকত্বের বিচারে চাকমা বর্ণগুলির বৈশিষ্ট্য বর্মী বর্ণগুলির বৈশিষ্ট্যের চেয়ে অধিকতর ঐতিহ্যবাহী।

প্রকৃতপক্ষে চাকমা বর্ণগুলি কখন এবং কোত্থেকে কি অবস্থায় উদ্ভূত হয়েছিল তার উত্তর পেতে হলে এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করতে হবে। যা এই মূহুর্তে এক কথায় বলা সম্ভব হচ্ছে না। চাকমা রাজা হরিশচন্দ্র নাবালক থাকাকালীন সময়ে তার সাহায্যার্থে ব্রিটিশ সরকার ২৩/১১/১৮৮৪ খ্রি: থেকে ২২/১/১৮৮৫ খ্রি: পর্যন্ত পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট যে একটি কাউন্সিল গঠন করেছিলেন তাতে কৃষ্টচন্দ্র দেওয়ানও সদস্য ছিলেন।

তিনি নিজে স্বহস্তে কিংবা কারাের দ্বারা লিখে চাকমা বর্ণগুলি এসিস্টেন্ট কমিশনার জে. এ. কেভ ব্রাউনের মাধ্যমে ড. গ্রিয়ার্সনের নিকট পাঠিয়েছিলেন তা এখন আর জানার সুযােগ নেই। শ্রী কৃষ্টচন্দ্র দেওয়ান আত্মীয়তার দিক থেকে আমার প্রয়াত মাতামহ বলদ্র তালুকদার (প্রাক্তন এডিশনাল এস.ডি.ও, ১৯৫৬) এর কনিষ্ঠ শ্বশুর শ্রী আশুতােষ দেওয়ানের পিতা। তার একটি ছবি দেখলাম অস্ট্রেলিয়ায় স্টেট লাইব্রেরী অব সিডনীতে গিয়ে।
(অসমাপ্ত)


লেখক: সুগত চাকমা (ননাধন)

সূত্র: সবুজ অরণ্য (সাহিত্য প্রকাশনা), ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ২০১৯

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *