চাকমা সমাজের সামাজিক ক্রম বিবর্তন

ভুমিকা:

যে কোন সমাজ উন্নতি লাভ করে ক্রম বিবর্তনের মাধ্যমে। চাকমা সমাজ এখন এক কঠিন ক্রান্তিকাল সময় অতিক্রম করছে। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারনে চাকমা জাতি আজ তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে বিভক্ত। তাই এক সজ্ঞায়, এক স্তরে এবং এক বর্ণনায় চাকমা সমাজ ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। চাকমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা আলোচনা করতে গেলে অন্ততঃ তিন ভাগে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের চাকমাদের সামাজিক অবস্থানকে চাকমা সমাজের মূলধারা হিসাবে ধরে নিলে ভারত ও মিয়ানমারের চাকমাদের অবস্থান আলাদাভাবে আলোচনা করতে হবে। তাছাড়াও বিশ্বায়নের কারনে উন্নত জীবনের সন্ধানে বেশ কিছু সংখ্যক চাকমা পশ্চিমা দেশে বসবাস শুরু করেছে। বর্তমানে তারা যুক্তরাস্ত্র, যুক্ত্ররাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, অষ্ট্রেলিয়া ও দক্ষিন করিয়ায় বসবাস করছে। ভবিষ্যতে আরো অন্যান্য দেশে যাবে। একবিংশ শতাব্দীতে চাকমা সমাজ এক জটিল পরিবেশে ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ভবিষ্যতে সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে কঠিন বাস্তবতাকে মোকাবেলা করতে হবে। আমাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও আদান প্রদান করতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা চাকমারা বর্তমানে তিন দেশের তিন রাজনৈতিক পরিবেশে বসবাস করছি। ন্যুনতম কিছু কিছু বিষয়ে আমাদর মধ্যে পরস্পরিক আদান প্রদান, আলোচনা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্ম আমাদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব বিষয়ে আমাদেরকে আরো ঘনিষ্ট হয়ে কাজ করতে হবে।

এই প্রবন্ধে আমি চাকমাদের সামাজিক অবস্থানকে নিম্নের চার ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করবো-
১। বৃহত্তর পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা সমাজ
২। মিয়নমারের চাকমাদের সামজিক অবস্থা
৩। ভারতীয় চাকমাদের সামাজিক অবস্থা
৪। অভিবাসী চাকমাদের সামজিক অবস্থা

বৃহত্তর পার্বত্য অঞ্চলের চাকমাদের সামাজিক অবস্থা:

যেহেতু পার্বত্য অঞ্চলের চাকমারা হলো আমাদের মূল ধারা তাই তাদের সামাজিক ক্রম বিবর্তনটি আমি একটু পিছন থেকে আলোচনা করবো। ইতিহাস থেকে জানতে পারি অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত চাকমারা মূলত চট্টগ্রামের দক্ষিন অঞ্চল ও উত্তর আরাকানে বসবাস করছিল। তখন সমাজ ছিল আদিম ও সরল, অনেক টা আদিম সাম্য নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে গোত্র স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হতো। সমাজের সুখ দূখঃ বিপদ আপদ সকলে মিলে সামাল দিতো। সমাজে ধনী দরিদ্রের মাঝে ব্যবধান ছিল কম। সমাজে শ্রেণী ছিল রাজা, গোত্র বা দল পতি ও সাধারণ মানুষ। অষ্টাদশ শতকে উন্নত জাতি মোঘল ও ইংরেজদের সংস্পর্শে এসে চাকমা সমাজ ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারন করে। সমাজে শ্রেণীভেদ দেওয়ান, তালুকদার, খিসা, কারবারি শ্রেণী সৃষ্টি হয়। রাজারা উপাধি নেয় খান। গোত্র পতি, দল পতিরা রাজার কাছ থেকে দেওয়ান, তালুকদার উপাধি নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। এভাবে চাকমা সমাজে অভিজাত শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। চাকমা সমাজের নব্য সৃষ্ট এই অভিজাত শ্রেণী বা পরিবার গুলি নিজেদের মধ্যে বিবাহ বন্ধন সহ সকল আদান প্রদানে সীমাবদ্ধ থেকে নিজেদের আভিজাত্য বজায় রাখতে চেয়েছিল। রাজার পরেই ছিল ক্ষমতাশালী দেওয়ানদের স্থান। তারা ছিল অঞ্চলের জমিক মালিক। প্রজাদের থেকে তারা খাজনা নিতো এবং বিনা বেতনে শ্রম [বেগার] নিতো। দেওয়ানদের এই সামাজিক নিপীড়ণের মাত্রা বেড়ে গেলে মাঝেমধ্যে প্রজা বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। ১৮৯৫/৯৬ সালে ধামাই তালুক থেকে প্রায় ২০০ পরিবার তুলাবান [বর্তমান লংগদু উপজেলা] এলাকায় পালিয়ে গিয়েছিল। তথাপি দুএক বার কুকিদের আক্রমন ছাড়া সাধারণ চাকমারা সুখে শান্তিতে ছিল। তখনো সমাজে চাহিদা ছিল কম। জুম চাষে উত্পাদন ছিল প্রচুর। জনসংখ্যার তুলনায় তা ছিল পর্য্যাপ্ত। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে চাকমারা কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ অষ্ণল থেকে উত্তর অঞ্চলে চলে আসে। ধীরে ধীরে বর্তমান রাঙ্গুনিয়া, রাউযান ফটিকছড়ি, রাজস্থলি সহ কর্ণফুলী নদীর উপত্যকায় বসতি গড়ে তুলে। এই সময় চাকমারা বাঙ্গালীদের কাছ থেকে নীচু জমির চাষ (wet land cultivation) শিখে ছিল। চাকমা রাজা সের মস্ত খান মোঘলদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেন এবং রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলের জমিজারী লাভ করেন। অষ্টাদশ শতকের চাকমাদের উল্লেখযোগ্য পাওয়া হলো ১৭৬১/৬২ সালে সাধক কবি শিব চরন চাকমা সাহিত্যের প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘গোজেন লামা’ প্রণয়ন করেন। গোজেন লামা চাকমা সাহিত্যের মাইল ফলক। গোজেন লামা গ্রন্থে কবি শিব চরন ঈশ্বর (গোজেন)কে বন্দনা করেছেন। এটি চাকমা অক্ষরে লেখা চাকমা ভাষায় প্রথম কাব্য গ্রন্থ।

১৭৬০ সালে বাংলার নওয়াব মির কাসেম চট্টগ্রাম অঞ্চলের শাসন ভার ইংরেজদের নিকট হস্তান্তর করে। ১৭৭০ দশকে ইংরেজরা মোঘলদের সঙ্গে সম্পাদিত কারপাস চুক্তি অগ্রাহ্য করে চাকমা রাজ্য গ্রাসের নীতি গ্রহন করে। ফলে ইংরেজদের সঙ্গে চাকমাদের সংঘাত শুরু হয়। এই সময় রাঙ্গুনিয়া জমিদারী ছিল চাকমা রাজার নায়েব [মন্ত্রি] রানু খান দেওয়ানের। ইংরেজ সরকার হঠাৎ কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়া রানু খান দেওয়ানের পরিবর্তে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জমিদার দুর্গদাস চৌধূরীকে নিয়োগ দেয় এবং তুলার পরিবর্তে নগদ টাকায় খাজনা পরিশোধের আদেশ জারী করে। চাকমারা তখনো নিচু জমি চাষ ভাল করে শিখেনি। ইংরেজ সরকার খাজনা বৃদ্ধির জন্য চাকমা দেওয়ানদের জমিদারীতে বাঙ্গালী প্রজাদের জমি বন্দোবস্তী দেওয়া শুরু করে। চাকমারা ইংরেজদের এ অন্যায় আদেশ মেনে নিতে পারেনি। ফলে ইংরেজদের সঙ্গে চাকমাদের সংঘাত অনিবার্য হয়ে পরে। চাকমাদের সঙ্গে ইংরেজদের এই অসম যুদ্ধ ১৭৭২ সালে শুরু হয় এবং ১৭৮৭ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়। শান্তিচুক্তির সময় চাকমা রাজা ছিলেন জান বক্স খান। এই দীর্ঘ ১৫ বছর ইংরেজদের অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক অভিযানের ফলে চাকমারা অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশায় কাটাতে হয়। শুনেছি এই সময় কেরসিনের অভাবে চাকমারা গর্জন গাছ থেকে তৈরী তেল দিয়ে বাতি জ্বালিয়ে ছিল। পাহাড়ি ছড়া থেকে খনিজ লবন দিয়ে রান্না করতে হয়েছিল। এই সময়ে চাকমারা সমতলের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, ফটিকছড়ি ছেড়ে পার্বত্য অঞ্চলে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল। ১৮৩২ সালে চাকমা রাজা ধরম বক্স খানের মৃত্যু হলে ১৮৪৪ সাল পয্যন্ত চাকমাদের কোন রাজা ছিল না। ১৮৪৪ সালে ইংরেজ সরকার রাণী কালিন্দীকে চাকমা রাজ্যের সরবরাহ কারী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। ইংরেজদের চাকমা রাজ্য দখলের নীতি রাণী কালিন্দী কখনো মেনে নিতে পারেননি। ইংরেজ সরকারের সঙ্গে কালিন্দী রাণীর এই দ্বন্দ্ব চাকমা জাতি এবং সমাজকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছিল। ইংরেজ সরকার রাজার ক্ষমতা কমিয়ে District Superintendent এর নীচে সার্কেল চীফ পদবী দেয়। চাকমা রাজ্যকে ভেঙ্গে দক্ষিনের অংশ বোমাং সার্কেলে দিয়ে দেয় এবং মহালছড়ি ও রামগড় থানা নিয়ে নতুন মং সার্কেল সৃষ্টি করে। .চাকমা রাজ্যের সমতল এলাকা রাংগুনিয়া, রাউজান, ফটিকছাড়ি ও সীতা কুন্ডকে চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। দেমাগ্রী ও তইজং এলাকাকে চাকমা বসতি এলাকা হওয়া সত্তেও লুসাই হিলের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। মোঘলদের দেয়া সীমানা [উত্তরে ফেনী নদী, দক্ষিনে সংখ নদী, পুবে কুকি রাজ্য এবং পশ্চিমে নিজাম উদ্দীন রোড] সংকুচিত করে চাকমা রাজ্য চাকমা সার্কেলে রুপান্তর করা হয়। বলতে গেলে রাজার বিচারিক ক্ষমতা সীমিত করে শুধু মাত্র সামাজিক বিচারের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এর পরও অবশিষ্ট চাকমা রাজ্যে জমিদারী বিক্রি করে চাকমা রাজার ক্ষমতা সীমিত করার চক্রান্তকরা হয়। এই সময় ক্ষমতাশালী দেওয়ানরা কালিন্দী রাণীর অনুগত ছিল বলে কেউ জমিদারী কিনতে রাজী হয়নি। তথাপি কাপ্তাই ওয়াগ্গায় এক হিন্দু এবং জীবতলী মৌজায় একজন বড়ুয়া জমিদারী কিনে নেয়। আস্তে আস্তে চাকমারা আরো উত্তরে চেঙ্গী এবং কাচালং উপত্যকায় ছড়িয়ে পরে।

প্রথম চাকমা সমাজের লিখিত বর্ণনা পাওয়া গেছে ফ্রান্সিস বুকাননের লেখায়। তিনি ১৭৯৮ সালে চাকমা রাজ্য ভ্রমন করেছিলেন। তখনো রাঙ্গুনিয়া, কাপ্তাই, চিৎ মরমে চাকমা বসতি ছিল। তিনি দেখেছিলেন চাকমা রাজ্যে যুদ্ধ শেষ হলেও পুরাপুরি শান্তিআসেনি। নিরাপত্তার অভাবে রাজা তখনো রাজবাড়ীতে থাকতেন না। চাকমা রাজা শান্তিচুক্তি করলেও সেনাপতি রণু খান তা মেনে নেয়নি। আত্মহত্যার আগ পর্যন্তলড়ে গেছেন। ঊনবিংশ শেষ ভাগ পর্যন্তচাকমা সমাজ ছিল মূলত স্থবির, অন্তরমূখী ও আদিম। জুম চাষ ছিল জীবিকার বাহন। বাঙ্গালীদের সংস্পর্শে আসলেও এখনো তারা ব্যবসা বানিজ্য শিখতে পারেনি। সমাজে উদ্যোগ ও প্রতিযোগিতা মনভাব ছিলনা। চাকমা চারন গীতি [Ballad] গেংগলি গান ও বারমাসি পালা ছাড়া তেমন কিছু ছিলনা। সেগুলি ছিল সব মুখে মুখে। চাকমা লেখার ব্যবহার শুধু বৈদ্য ও রুলীদের মাঝে সীমিত ছিল। ঊণবিংশ শেষ ভাগে এসে চাকমারা প্রথম আধুনিক শিক্ষার সংস্পর্শে আসে। চাকমাদের মধ্যে প্রথম entrance পরীক্ষা পাশ করেন চাকমা রাজা ভূবন মোহন রায় ও অবিনাশ চন্দ্র দেওয়ান ১৮৯৩। জীতেন্দ্র তালুকদার ১৮৯৫ এবং রাজার ছোট ভাই রমণী মোহন পাশ করেন ১৮৯৭ সালে। উণবিংশ শতকে আর একটি উল্লেখ যোগ্য ঘটনা হল ১৮৭০ দশকে রাজা হরিশ চন্দ্র লুসাই অভিযানে ইংরেজকে সাহায্য করে রায় বাহাদুর উপাধী লাভ করেন। সেই থেকে চাকমা রাজ বংশের পারিবারিক উপাধী রায় হয়ে যায়।

প্রকৃত পক্ষে বিংশ শতকের প্রথম চতুর্থাংশে [First Quarter] চাকমারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে শুরু করে। ইংরেজরা [তাদের প্রয়োজনে] রাঙ্গামাটিতে হাই স্কুল [১৩৯০] প্রতিষ্ঠা করে। মহাপুরুম, খাগড়াছড়ীতে এম ই স্কুল প্রতিষ্ঠা করে [১৯২৩] এবং তুলাবান ও মগবানে ইপি স্কুল স্থাপিত হয় [১৯২২]। স্বাভাবিকভাবে প্রথমে সমাজে উচ্চ শ্রেণীর ছেলেরা সুযোগ পায়। চাকমাদের মধ্যে প্রথম বিএ পাশ যামিনী দেওয়ান (১৯১৮ সালে)। প্রথম এম এ পাশ কুমার কোকনা দাক্ষ রায় [১৯৩৭] ২য় এমএ বাবু মুকুর কান্তিখীসা [ ১৯৫৭ ]। ৩য় দশক থেকে সাধারণ চাকমা ছেলেরা আসতে শুরু করে। চাকমাদের শিক্ষা বিস্তারে ২ জন জন দরদী ও দূর দৃষ্টি সম্পন্ন কৃতি সন্তানের নাম স্মরণ করতে পারি। এরা হলেন স্কুল পরিদর্শক প্রয়াত বাবু কৃষ্ণ কিশোর চাকমা [বিএ পাশ ১৯১৮]ও বাবু ভূবন চন্দ্র চাকমা [বিএ পাশ ১৯২৮]। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে শিক্ষার জন্য প্রচার করে চাকমাদের উদ্বুদ্ধ করে। ৫০ দশকে গিয়ে চাকমারা এর সুফল লাভ করা শুরু করে।

চাকমা সমাজকে সবচেয়ে আলোরিত এবং ক্ষতিগ্রস্থ করে দুইটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর একটি হল ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ। ইংরেজ সরকার সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, অন্যায় ও অযোক্তিক ভাবে তত্কালীন পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করে দেশ বিভাগ করেছিল। চাকমা জাতির জন্য এর ক্ষতির দিক বহু মাত্রিক। বস্থুগত ও মনস্তাত্তিক [Matetial and psychological] এবং সুদুর প্রসারি। ঐতিহাসিক ভুল শুধরানো খুবই কঠিণ। বহু যুগ ধরে এর ফল আমাদের ভোগ করতে হবে। একমাত্র তখনকার ভারতীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্ধ ইংরেজদের এই সর্বনাশা পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে পারত তা তারা করেননি। এই দেশ বিভাগের জন্য চাকমা জাতি আজ বিভক্ত। চাকমা সমাজের অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা চির দিনের জন্য চাকমা সমাজের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতে চলে যায়। এক দেশে থাকলে হয়ত আজ অরুনাচলের চাকমাদের নাগরিকত্ব হীন হয়ে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা ভোগ হতো না। বিভক্ত হওয়ায় আজ চাকমারা রাজনেতিক ভাবে দেয়ানেয়া খেলায় [game of bargaining] শক্তিহীন ও দুর্বল। এখন আমাদেরকে বড় জাতির চাপিয়ে দেয়া শর্ত নিজ স্বার্থের প্রতিকুল হলেও মেনে নিতে হচ্ছে ।

অন্য ঘটনাটি হলো আমাদের মরন ফাঁদ ১৯৬০ সালে নির্মীত কাপ্তাই বাঁধ (জল বিদ্যুৎ প্রকল্প) এই বাধঁ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে আলোকিত করলেও চাকমা সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এই বাধঁ থেকে আমরা ন্যুন্তম সুবিধাও লাভ করিনি। এই বাধেঁর ফলে ৫৪ হাজার সবচেয়ে উর্বর আবাদী জমি ডুবে যায়। এক লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয় যার ৮০ ভাগ ছিল চাকমা। কাপ্তাই বাঁধ চাকমাদের আর্থিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়। এর ফলে প্রায় দুই শত বছরের গুষ্ঠি ভিত্তিক গ্রাম গুলি ভেঙ্গে য়ায়। তারা চেঙ্গি, মাইনি, কাচালং সহ বিভিন্ন জায়গায় বসতি করতে বাধ্য হয়। ক্ষতিপূরণ ছিল অপ্রতুল ও নাম মাত্র। ক্ষতি পূরণের জন্য ৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্ধ থাকলেও মাত্র ২.৬ মিলিয়ন প্রদান করা হয়। জৈনক উচ্চ পদস্থ পাকিস্তানী কর্মকর্তা বলে ছিলেন উপজাতিরা জঙ্কলে গাছের নীচে বাস করতে পারে, তাই এত ক্ষতি পূরণের দরকার নেই। তার একটি বাক্যই আমাদের প্রতি পাকিস্তানীদের মনোভাব বুঝা যায়। নতুন জায়গায় বসতি করতে গিয়ে বহু শিশুর মৃত্যু হয়। শত বছরের বংশপরস্পরা অর্জন করা সম্পত্তি হারিয়ে পুনরায় নতুন জীবন শুরু করা কত কঠিণ ছিল তা একমাত্র ভুক্তভোগীরা বুঝে। অনেক ধনাধ্য পরিবার একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রধান কারন হল কাপ্তাই বাধঁ।

১৯৬০ দশক আমার মতে চাকমা সমাজের পূনর্জাগরনের দশক। দুই দশকের পর পর দুই ঐতিহাসিক ঘটনায় হতাশাগ্রস্থ চাকমা সমাজকে এই দশকে চাকমা যুব সমাজ প্রথম আশার বাণী শুনিয়েছে। সদ্য ডিগ্রী পাশ করা ২/৩ জন চাকমা ছেলে মিলে এক এক টা হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। এই ভাবে দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি, কমলছড়ি, মারিশ্যা, রুপকারী, শিশজ, লংগদু, নানিয়াচড়, তবলছড়ি, মাটিরাঙ্গা, বাবুছড়া প্রভৃতি বড় বড় চাকমা গ্রামে হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ফলে ক্রমেই চাকমাদের শিক্ষার হার বেড়ে যায়। চাকমা সমাজ এখন জুম ও জমির উপর নির্ভর না করে শিক্ষার উপর প্রাধান্য্ দেয়। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরা শিক্ষায় এগিয়ে আসে। ষাটের দশকে ৪ জন চাকমা মেয়ে এম এ পাশ করে। এতদিন পর্যন্তবাঙ্গালী সংস্কৃতির প্রভাবে শাড়ি পরতে পারলে চাকমা সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মহিলারা গর্ব করতো। দেওয়ান তালুকদার পরিবারের মেয়েরা নিজ ঐতিহ্যবাহী পোষাক ছেড়ে শাড়ি পরা শুরু করে। শিক্ষিত চাকমা সমাজ প্রথম বুঝতে পারে বাঙ্গালীর পোষাক পরার মধ্যে গৌরবের কিছু নেই। তারা নিজ পরিচয় [Identity] নিজেদের পোশাকের মধ্যে খোঁজ পেতে শুরু করে। চাকমা ছাত্র সমাজ ডাক দেয়, ‘পিনন পিন, হাদি বান‘। চাকমা কবি ও গায়ক রা চাকমা গান কবিতা লেখা শুরু করে। রচিত হয়, “উত্তন পেগে মেঘে মেঘে মিগিলো দেবা তলে; রেত্য জনম্য ন থেব, বিন্যামায় বেলআন উদিব, আমিও ইক্ক দিন জাগিবং।

চাকমা কবি ননাধনর কবিতা-

যদি কনদিন এ জনম কায়কুই বই
একবনা দোল কবারোন ফুল লই
ত’ হাদত গুজে তরে কং পরানী
জনমান এ জনম ম’ কুরে থেবেনি।

দীপংকর শ্রীজ্ঞান লিখেন-

ঝর’ফুদা ধক লামিবার দিচ্ লামি যোক্
চিদত যুদি পুড়ানা সমায় চিত্ পুড়োক।

ফেলাজেয়্যা লিখেন-

সাগরর পানি তর চোগভর
এভ যে এধক আঘে
ন-অদ জানং মুই

ডাঃ ভগদত্ত লিখেন-

তনুরাম চাকমা দেচ তার বাঙলা
নাক তার চেবেদা কি জ্বালা কি জ্বালা

ষাটের দশকে মিজো বিদ্রোহ (১৯৬৪) এবং পূর্ব পাকিস্তানে আয়ুব খাঁন বিরোধ ছাত্র আন্দোলন (১৯৬৯) চাকমা ছাত্র সমাজকে আরো সাহসী করে তুলে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চাকমা নেতৃত্ত সিদ্ধন্তহীনতায় ছিল। ৭০দশকে জন সংহতি সমিতি নেতৃত্ব চাকমাদের স্বাধীকার আন্দোলন আরো বেগবান, আরো দুর্বার হয়। শেষ পর্যন্তসশ্স্ত্র সংগ্রামের রুপ নেয়। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত চাকমা সমাজকে কঠিণ সময় অতিক্রম করতে হয়েছিল। কারো জীবনের কোন নিরাপত্তা ছিল না। প্রায় এক লক্ষ লোক ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়ে ছিল। দেশের ভিতরে আরো লক্ষধিক লোক জমিজমা সহায় সম্পত্তি হারিয়ে বাস্তুুচ্যুত হয়েছিল। এখনো অনেকে তাদের জমি ঘর ফিরে পায়নি। অনেক মা-বোন ইজ্জত হারিয়ে ছিল। অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়ে ছিল। এই সশস্ত্র আন্দোলনের সময় সব পাহাড়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু প্রধান আঘাত নিঃসন্দেহে চাকমাদের উপরে ছিল। কারন আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল চাকমাদের হাতে। এই সময়ের দুঃখ দুর্দশা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। ১৯৪৭ সালে আমরা ৯৭.৫ ভাগ ছিলাম। এখন মাত্র ৫০ ভাগ। অনুমান করা যায় আর কয়েক বছরের মধ্যে আমরা সংখ্যা লঘু হয়ে যাবো। এত কিছুর পর ও চাকমারা এখনো টিকে আছে। চাকমারা শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। প্রায় ৭২%। অনেক ধনাধ্য চাকমা আছেন রাজধানী ঢাকায় বাড়ী ঘর আছে। অনেক শিক্ষিত চাকমা বিদেশে অবস্থান করছে। সমাজে এখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর ও উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা সংখ্যা অনেক। মেয়েদের শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। নিজেকে নিয়ে এখনো আমরা গর্বিত। আমাদের রাজা আছে, ডক্তরেট ডিগ্রী ধারী আছে, আছে জেনারেল, আছে সচিব। প্রয়াত শ্রদ্ধেয় বন ভান্তের জন্য আমরা এখন অনেক ধর্ম পরায়ন। তবে আমি মনে করি এখনো অনেক দৈন্য দুর্বলতা আছে। রাজনীতিতে আমরা খুব বেশী বিভক্ত। আত্ম কলহে রক্তাক্ত। সমাজে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। আগের যুগের সরলতা চাকমাদের মধ্যে আর নেই। নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে অনেক। মৈত্রী করুনার বদলে হিংসা বিদ্বেষ ভাব বেশী। বাঙ্গালীদের থেকে শিখে শিখে আমাদের মধ্যে এখন সততার বড় অভাব। দুর্নীতিকে কেউ যেন অপরাধই মনে করেনা। বাঙ্গালীদের মত ব্যক্তি স্বার্থে প্রাধান্য দিচ্ছি। সমাজের তথাকঠিত বাবুরা সমাজের প্রতি উদাসিন, ভোগ বিলাসে মত্ত। They hardly have any positive commitment to the society. আত্ম অহংকারের জন্য চাকমা সমাজে প্রথমে পতন হয়েছিল উচ্চ বংশের লোকদের। এখন পতন শুরু বাবুদের। বাংলাদেশে চাকমা সাহিত্য চর্চা শুরু হয়েছে বাংলা অক্ষরে। চাকমা অক্ষরে লেখা নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কমই পড়তে পারে। পুরনো চাকমা অক্ষর চর্চার অভাবে প্রায় যাদুঘরে বন্দী। তবে একটি ঢ়ড়ংরঃরাব দিক হলো অনেক দেরিতে হলেও ভারত এবং বাংলাদেশ সরকার চাকমাদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে লেখাপড়ার সুযোগ দিয়েছে। সমাজে এখন সব স্থানে সাধারন ঘরের ছেলে মেয়েরা এগিয়ে আসছে। এখন সমাজে মেয়েরা অনেক স্বাধীন। তবে তারা এখনো কিছু মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। মেয়েদের পৈত্রিক সম্পত্তির অধিকার ও বিবাহ বিচ্ছেদে স্বামীর সম্পত্তির অধিকার নেই। এ সকল বিষয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। মনে রাখতে হবে দায়িত্ব পালনে তারা ছেলেদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

মিয়ানমার চাকমাদের সামাজিক অবস্থান:

মিয়ানমারের চাকমারা কিছু দিন আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের চাকমাদের থেকে মোটামুটি বিচ্ছিন্ন ছিল। যা অল্প কিছু খবর পাওয়া যেতো মিয়ানমার ভ্রমনকারী ভান্তেদের মাধমে। মেজর জেনারেল অনুপ কুমার চাকমার মিয়ানমারে রাষ্ট্রদুত হিসাবে নিয়োগের পর থেকে ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। অনেক চাকমা পরিবার মিয়ানমার ঘুরে আসেন। ইয়ংগুনে অবস্থানরত কয়েক জন চাকমার প্রচেষ্টায় ২০১৪ সালের প্রথম দিকে আরাকানী চাকমাদের সাথে আমাদের প্রথম যোগাযোগ শুরু হয়। এর পর বেশ কয়েকটি দল আরাকানের চাকমা অঞ্চল ঘুরে আসেন। ২০১৪ সালের মার্চ মাসে আমি নিজেও একটি দলের নেতৃত্ব দিয়ে ছিলাম। আরাকানী চাকমারা আরাকানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় বিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাস করছে। মিয়ানমারের চাকমাদের রাখাইন ও বর্মীরা দৈনাক বলে ডাকলেও তারা নিজেদেরকে চাঙমা বলে পরিচয় দেয়। বর্তমানে তারা মংডু, বুজিতং, কিয়ক্টঅ ও ম্রাক উ অঞ্চলে বাস করে থাকে। কিছু চাকমা চীন হিল প্রদেশের পেল্লটোয়া অঞ্চলে বাস করে। তাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল না। মূলতঃ তারা কৃষীজীবি। শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা অনেক পিছিয়ে। আরাকান প্রদেশটি মূল বার্মা থেকে অনেক পশ্চাত্পদ। গ্রাম অঞ্চলে কোন হাই স্কুল নেই। একমাত্র সিটউয়েতে কলেজ ও ইঊনিভারসিটি আছে। ভাল ইউনিভারসিটিতে পড়তে হলে ইয়াংগুন মান্দালে যেতে হয়। আর্থিক অবস্থার জন্য চাকমা ছেলেমেয়েরা কলেজ-ইউভারসিটিতে পড়তে পারে না। তাদের সামাজিক অবস্থা ভারত ভাগের সময়ে আমাদের অবস্থার মত। তাদের মধ্যে যারা দুএক জন উচ্চ শিক্ষা নিতে পারে তারা বাহিরে চাকরী করতে গিয়ে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পরে। আমি দেখেছি বুজিতং শহরে বসবাস কারী চাকমা ছেলেরামেয়েরা চাকমা ভাষা বলতে পারে না। তথাপি আশার দিক হলো ৬/৭ শত বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর ও আমরা তাদের সঙ্গে এক ভাষায় কথা বলতে পেরেছি। এত প্রতিকুলতা সত্তেও তারা একেবারে রাখাইন সমাজে বিলিন হয়ে যায়নি। আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তারা এখন শিক্ষার উপর প্রাধান্য দিচ্ছে। তারা এখন বুজিতং ও কিয়ক্ত শহরে কিয়ং ও ছাত্রাবাস করার জন্য জমি কিনেছে। ইয়াংগুন শহরে জায়গা কিনে দুইটা চাকমা কিয়াং প্রতিষ্ঠা করেছে। মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য হওয়ায় কিছু চাকমা ছেলে থাইল্যন্ড ও মালয়েশিয়ায় চাকুরী পাচ্ছে। আরাকানে একমাত্র চাকমারা নিজ চাকমা ভাষা ছাড়াও আরাকানী, বর্মী ও রোহিঙ্গা ভাষায় কথা বলতে পারে। চাকমারা মিয়ানমারের সংবিধান সীকৃত ১৩৫ টি আদিবাসীতে অন্তর্ভুক্ত। রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের অনুকুলে হওয়ায় চাকমা ছেলেরা বর্তমানে পুলিশ, সীমান্তরক্ষী এবং সেনা বাহিনীতে চাকুরী পাচ্ছে। চাকমা মূল ধারার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে তারা খুবই খুশী। আমরা যখন আরকানী চাকমা পাড়া লং সং বেড়াতে গেছিলাম তাদের লেখা Poster দেখেছি, তারা লিখেছে, “We are Chakmas, we are missed, don’t forget us”। তাদের দেয়া আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ, অভিভূত। ঝধসনড়ফযর ডবষভধৎব ঝড়পরবঃু এর অর্থায়নে বুজিতং শহরে একটি মন্দির ও ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। প্রতি বছর কঠিন চিবর দানে আমাদের প্রতিনিধি পাঠানো হয়। কিছু দিন পূর্বে বন্যা দুর্গত আরাকানী চাকমাদের জন্য আমরা এবং অষ্টেলিয়া প্রবাসী চাকমারা কিছু অনুদান পাঠানো হয়েছিল। আশা করি ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকবে। তার প্রতি বছর ৭ জানুয়ারীকে চাকমা জাতীয় দিন হিসাবে পালন করে থাকে।

ভারতের চাকমাদের সামাজিক অবস্থান:

ভারতের চাকমারা মূলতঃ চার প্রদেশে [ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম ও অরুনাচল] বসবাস করে। শিক্ষাদীক্ষায় ত্রিপুরার চাকমার কিছুতা এগিয়ে। কারণ ভারত বিভাগের সময় পার্বত্য অঞ্চল থেকে শিক্ষিত চাকমার একটা অংশ ত্রিপুরায় চললে গেছে। প্রাদেশিক রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেতে পারায় তারা মমোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে। তাই ভবিষ্যতে চাকমা সমাজের উন্নতি কল্পে তাদেরকে অধিক উদ্যোগ নিতে হবে। মিজোরামের চাকমারা শিক্ষায় কিছুতা পিছিয়ে থাকলে ও সংখ্যা ও রাজনৈতিক ভাবে সুবিধাজনক থাকায় ভবিষ্যতে উন্নতির উজ্জল সম্ভবনা আছে। স্থানীয় চাকরী পাওয়ার জন্য তাদের লুসাই ভাষা শিখা উচিত হবে। আমাদের সবাইকে স্থানীয় ভাষা শিখতে হচ্ছে। অরুনাচলের চাকমারা নাগরিকত্ব না থাকায় এবং স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধ থাকায় যে অসুবিধার মধ্যে আছেন তা কাটিয়ে উঠতে আইনী লড়াইএর সঙ্গে রাজনৈতিক ভাবে আরো কৌশলী হওয়া উচিত। তারা অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আগামীতে তাদের ব্যাপারে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সেজন্য সঠিক নেতৃত্ব দরকার। জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রদেশে বসবাস রত চাকমাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। অঞ্চলের বাহিরে বসবাস করা চাকমাদের নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করা কষ্ট সাধ্য হবে। এ জন্য আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। বাসার ভেতরে অবশ্যই নিজ ভাষায় কথা বলতে হবে। যতই কষ্টকর হোক বছরে কম পক্ষে একবার নিজ গ্রামে যেতে হবে। বাংলাদেশী চাকমারা এ অবস্থার ভুক্তভোগী। তারা এই আবস্থা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে।

বিদেশে অভিবাসী চাকমাদের সামাজিক অবস্থা:

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মূলতঃ ৬টি পশ্চিমা এবং উন্নত দেশে বেশ কিছু চাকমা পরিবার বসবাস করছে। ইউরোপের ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ছাড়াও আছে কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র। অষ্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার দেশ দক্ষিন করিয়া। জাপান ও নিউজিল্যান্ডে কিছু চাকমা বসবাস করে। তাদের সামাজিক সমস্যা প্রায় এক; নিজ ভাষা ও সংষ্কৃতি রক্ষা করা। ছেলে মেয়েরা স্থানীয় ভাষায় লেখা পড়া করবে। সচেতন না হলে পরবর্তী প্রজন্মেমর ছেলেমেয়েরা নিজ ভাষা ও সংষ্কৃতি ভুলে যাবে। আমার ভয় হয় হয়ত ৫০ বা ১০০ পরে বিভিন্ন দেশে বসবাস রত চাকমারা এক হলে দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলতে হবে। আমি নিজেই দেখেছি আমেরিকা কানাডা বসবাস রত চাকমাদের অনেক ছেলেমেয়ে চাকমা ভাষা বলতে পারেনা। নিজ ভাষা না জানার জন্য তারা আর দেশে আসতে চাইবে না। ফলে নিজ শিখরের প্রতি তাদের কোন টান তা থাকবে না। তাদের নিজ সমাজের ভিতরে বিয়ে দিতে অসুবিধা হবে এবং অদুর ভবিষ্যতে অভিবাসী চাকমাদের একটা অংশ হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে। এ জন্য আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে। এব্যপারে আমাদের করনীয় অনেক। যেমন-

ঘরে চাকমা ভাষায় কথা বলা।
নিয়মিত ছেলেমেয়ে সহ দেশে আসা
অভিবাসীরা এক সঙ্গে মিলে বিজু বা অন্যান্য উত্সব পালন করা
চাকমা ভাষা দুর শিক্ষনের ব্যবস্থা করা
বিচ্ছিন্ন ভাবে না থেকে দলবদ্দ ভাবে বসবাস করা
ছেলেমেয়েদের নিজ শিকর সম্পর্কে জানানো
ছেলে মেয়েদের নিজেদের জাতীয় পোশাক পরতে উত্সাহিত করা ইত্যাদি।

তবে আশার দিক হলো, প্রতি বছর অভিবাসী চাকমারা বিজু পালন করছে। আমেরিকার চাকমারা নিজস্ব চাকমা কিয়াং প্রতিষ্ঠা করেছে। অষ্ট্রেলিয় চাকমারা বাংলাদেশ থেকে সংগিত শিল্পী নিয়ে যাচ্ছে। অষ্ট্রেলিয় চাকমারা তহবিল যোগার করে বাংলাদেশের মনোঘর স্কুল ও অরুরাচল স্কুলের জন্য সাহায্য পাঠাচ্ছে। তারা মিয়ানমারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ চাকমাদের টাকা পাঠিয়েছে। মিজোরামের চাকমাদের জন্য আন্তর্জাতিক NGO যোগার করেছে। কিছু দিন পূর্বে রাজকুমারী চন্দ্রা থায়ল্যান্ডের ব্যাংককে ভারতীয় এক চাকমা মেয়েকে চিনতে পেরে ছিলেন শুধু পিনন হাদি পরে থাকার জন্য। পরিচয়ে জানতে পারে তারা উভয়েই চাকমা, একজন ভারতীয় ও একজন বাংলাদেশী। এ গুলিই আমাদের শক্তি, আমাদর আশা।

সুপারিশ

আমাদের ভাষা ও সংষ্কূতির উন্নতির জন্য আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ও আদান প্রদান আরো বৃদ্ধি করত হবে। এব্যপারে আমাদের সমন্বিত কর্মসূচী গ্রহন করতে হবে। এক দেশের দল অন্য দেশে যেতে হবে। সম্ভব হলে প্রতিবছর চাকমা সাহিত্য সম্বেলন এবং মেলা আয়োজন করতে হবে। সময় এসেছে চাকমা সাহিত্য চর্চায় আমরা কোন অক্ষর ব্যবহার করবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। দেবনাগরিক, বাংলা অথবা রোমান। এক দিকে আমাদের আবেক, অন্যদিকে যুগের প্রয়োজনে বাস্তব বাদী পদক্ষেপ। উদ্ভূত সামাজিক সমস্যাবলী পর্যালোচনা করে আমাদেরকে সঠিক দিক নির্দেশনা ও সঠিক সিদ্ধান্তনিতে হবে।

উপসংহার:

চাকমাদের অভিন্ন সংষ্কূতির অগ্রগতির প্রধান বাধা চাকমারা ভিন্ন ভিন্ন দেশে বিভক্ত। ভৌগলিক ও রাজনৈতিক কারনে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ সীমিত। সংষ্কৃতি চর্চায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার অভাব। ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব ভঙ্গিমায় সংষ্কৃতি ও সাহিত্য চর্চার ফলে আমাদের মধ্যে বিভেদ ও বৈপরিত্য দেখা দিতে পারে। এখন নামের পূর্বে লেখা হচ্ছে মি, জনাব,দাংগু ও উ [মিয়ানমারে]। রাজনৈতিক ও উপজাতিয় ঐক্যের জন্য বাংলাদেশে বিজুর পরিবর্তে বৈসাবি [বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু মিলিত শব্দ] পালন করা হচ্ছে। বিজুর দিন পাজনের সাথে পোলাও মাংস পাকাতে হচ্ছে। চাকমা বিয়েতে প্রায় শুকরের মাংস পাক করা হয় না। তথাপি আশার দিক হলো বাংলাদেশের সংষ্কৃতির মাঝেও আমরা আমাদের সংষ্কৃতি রক্ষা করতে পেরেছি। বিজু নাচ এখন সর্ব ভারতীয় স্বীকৃতি লাভ করেছে। আমরা আমাদের পোষাক ও পরিচয়ে আর লজ্জা পায় না। নতন প্রজন্ম আমাদের এই অগ্রযাত্রাকে আরো এগিয়ে নিতে হবে।

লেখক: পরিমল বিকাশ চাকমা, লে কর্নেল (অব) ও বিশিষ্ট গবেষক

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *