চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অগ্রগতির একটি সংক্ষিপ্ত রচনা

অন্যান্য অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মত চাকমাদেরও নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, ইতিহাস, ধর্ম, ঐতিহ্য ও লোকগাথা। আধুনিক সাহিত্য যেমন- নাটক, সংগীত, কবিতা, নৃত্য, পালাগান, রূপকথা, ছড়া ইত্যাদি রয়েছে। (চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতি)

অধিকাংশ চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী এবং বার্মা, থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকার মতোই থেরোবাদ বা হীনযান বৌদ্ধ ধর্মের রীতি-আচার অনুষ্ঠান উদ্যাপন করেন। যেমন বৈশাখী পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান, একমাস ব্যাপী আকাশ প্রদীপ পূজা, আমরা জানি ত্রিপিটক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ। এই গ্রন্থ তিন অংশে বিভক্ত- বিনয় পিটক, সূত্র পিটক ও অভিধর্ম। ২,৫০০ বৎসর আগে শাক্য রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম ভারতে বুদ্ধ গয়ায় বোধি বৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় গভীর ধ্যান সাধনার পর বুদ্ধত্ব লাভ করেন। কথিত আছে তিনি ৬ বৎসর ধ্যান করেছিলেন। ইদানিং রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে ত্রিপিটক পূজা উপলক্ষে ভিক্ষু সংঘ ও পূণ্যার্থীদের অংশ গ্রহণের মাধ্যমে একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।

অধিকাংশ চাকমা জনগণ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাস করেন। চাকমা সাহিত্যকে কয়েকটি অংশে ভাগ করা যায়। যেমন- পল্লী গাথা, কবিতা, নাটক, ছড়া, প্রবচন, প্রবন্ধ, রূপকথা, প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ, পুঁথি সাহিত্য প্রভৃতি। যেমন- রাধামন-ধনপুদি পালা, চাদিগাঙ ছাড়া পালা, চান্দবী বারোমাস, মেয়েবী বারোমাস, উভগীত, পল্লী চারণ কবি যারা ‘গেঙখুলি নামে’ সুপরিচিত তারা একটা বেহলা বাজিয়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে, পালা-পার্বনে সুদুর প্রাচীন কাল থেকে অদ্যবধি, এই উভগীত ও পালাগান আগ্রহী স্রােতাদের মাঝে পরিবেশন করে থাকেন। বিশেষত জুমের ধান বা ফসল জুম চাষীদের ঘরে উঠার পর যখন গ্রামবাসীদের মন খুশীতে পরিপূর্ণ হয়। প্রাচীন কালে গেঙখুলিরা বিভিন্ন গ্রামে আমন্ত্রিত হয়ে এই উভগীত ও পালাগান পরিবেশন করতেন। অধিকাংশ স্রােতাই যুবক-যুবতী যদিও আন্যান্য গ্রামবাসীদের ও এই অনুষ্ঠান শ্রেুাতা হিসাবে উপস্থিতি থাকতে বাঁধা নেই।

যুবক-যুবতীরা গেঙখুলির গানের সুরে উল্লেসিত হয়ে ‘‘রেং’’ বা এংকুর একটা ইয়াহ্, ইয়াহুঁ শব্দ করে মনের আবেগ প্রকাশ করে থাকেন। উভগীতকে মূলতঃ ইংরেজীতে Love Song বলা হয়। উভগীত কে বা কারা বা কোন সময় রচনা করেছেন তার কাল বা সঠিক সময় নির্ধারণ করা বা নিশ্চিত করে বলা আজ আর সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা নিঃসন্দেহে এই ‘উভগীত’ সুপ্রাচীন বলে গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু দুঃখের বিষয় কালের আবর্ত্তে এবং সমাজের পৃষ্ঠ পোষকতার অভাবে এখন গেঙখুলীদের দুর পল্লী গ্রামেও খুঁজে পাওয়া কঠিন ব্যাপার। তারা লোক চক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছে হয়তো কিছুদিন পর আর কোন ‘গেঙখুলি’ খুঁজে পাওয়া যাবে না, চিরতরে একটি প্রাচীন শিল্পীগোষ্ঠী আধুনিক সংগীতের প্রভাবে অস্থিত্ব হারিয়ে ফেলবে। তার সঙ্গে হারিয়ে যাবে একটি সুপ্রচীন পল্লী শিল্পী গোষ্ঠী। যাদের চাকমা সংস্কৃতির অগ্রগতিতে অবদান অবিস্মরণীয়।

বুদ্ধ বিহার/মন্দির ভিত্তিক ভিক্ষু সংঘের প্রতিষ্ঠার পূর্বে চাকমা সমাজে ‘লুরি’ নামে বৌদ্ধ ধর্মীয় পুরোহিত ছিলেন। লুরিরা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও অন্যান্য পূজা পার্বনে প্রধান ভূমিকা পালন করতেন। এই লুরিরাও একটি বৌদ্ধ ধর্মীয় পুরোহিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তারা এই অনুষ্ঠান পরিচালনার সময় চাকমা বর্ণমালায় লিখিত ‘‘তারা’’ নামে বৌদ্ধধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করতেন। এই ‘তারাগুলি’ চাকমা বর্ণমালায় তাল পাতায় রচিত হয়েছে।

এই ধর্মীয় গ্রন্থ ২৮টি উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হল।- ১। আগর তারা, ২। মালেম তারা, ৩। সাধেং গিরি তারা, ৪। দশ পারামী তারা, ৫। তাল্লিক শাস্ত্র তারা, ৬। বুদ্ধ ফলু তারা, ৭। শাক্য তারা, ৮। জিয়ন তারা, ৯। ত্রিকুদ্দ তারা।

বর্তমানে বুদ্ধ মন্দির ভিত্তিক থেরোবাদ বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘই যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রধান ভূমিকা পালনা করে থাকেন। এই ২৮টি ‘তারা গুলিকে সহজেই প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্য বা Religious literature হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়।

কবি শিব চরণকে চাকমা ভাষায় সর্ব প্রথম লেখক বা কবি হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। সম্ভবত ষোড়শ শতাব্দীতে তিনি গোজেন’ লামা নামে প্রথম ভক্তি মূলক গীত বা কাব্য রচনা করেন। কিন্তু চাকমা সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজিবীদের মধ্যে তার রচনা কাল বা সময়ের অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করেন।

১৯৩৬ সাল থেকে চাকমা সাহিত্যের অগ্রগতির দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু। চিত্র-শিল্পী (Painter) প্রয়াত চুনিলাল দেওয়ান (১৯১১-১৯৫৫ খ্রি:) কলিকাতা আর্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তিনি তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় প্রথম বাংলা কবিতা লিখেন। ‘গৈরিকা’একটি সাহিত্যে পত্রিকা। সেখানে প্রথম চাকমা কবিতাও তিনি লিখেছিলেন। ‘গৈরিকা’ ১৯৩৬ সালে তৎকালীন চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায়ের সহ-ধর্মীনি রাণী বিনিতা রায়ের (১৯০৭-১৯৯০ খ্রি:) প্রত্যক্ষ সহায়তায় রাঙামাটি রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এই ‘গৈরিকা’ নামকরণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি:)। তিনি ১৯১৩ সনে এশিয়া মহাদেশ থেকে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

প্রয়াত রাজমাতা বিনীতা রায়, নিজেও কবিতা, গান,  প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন বাংলা ভাষায়। এই পার্বত্য জেলায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির অগ্রগতিতে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই ক্ষেত্রে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ‘গৌরিকা’ এই পার্বত্য অঞ্চল থেকে প্রথম প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা বা সামিয়িকী, এতে কবি অরুন রায় জন্ম (১৯১৪-১৯৮২ খ্রি:), কবি সলিল রায় (১৯২৮-১৯৮১ খ্রি:), শ্রী বঙ্কিম দেওয়ান, কোকনাদাক্ষ রায় (১৯১১- খ্রি:) পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম নাট্যকার, তিনি ১৯৩৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এম, এ ডিগ্রী লাভ করেন। তার প্রথম নাটিকা ‘‘পথের মায়া’’ ১৯৩৭ সালে‘গৌরিকায়’ প্রকাশিত হয়। বাংলা লিপিতে চাকমা ভাষায় পরবর্তীকালে কোন কোন লেখক চাকমা গান ও কবিতা লিখেছেন। এখনও নবীন কবি ও লেখক, নাট্যকার, চাকমা, বাংলা উভয় ভাষাতে সাহিত্য চর্চা করছেন।

চাকমা সাহিত্যের অগ্রগতিতে অবদান রেখেছেন তার মধ্যে ইতিহাসের লেখক, গবেষক শ্রী বিরাজ মোহন দেওয়ান উল্লেখযোগ্য। (১৯০৯-১৯৭৫ খি:)তিনি ‘পার্বত্য বাণী’ নামে রাঙামাটি থেকে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশনা ও সম্পাদনা করতেন। এই ‘পার্বত্য বাণী’ মাসিক পত্রিকাটি ১৯৬৭-১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। এই পত্রিকাটি নবীন প্রজন্মের লিখকদের লেখালেখিতে উৎসাহ ও প্রমোদনা জাগিয়েছিল। নতুন লেখকদের ও আত্ন-প্রকাশে সুযোগ তৈরী করেছিল। শ্রী বিরাজ মোহন দেওয়ান ‘‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত’’ নামে বাংলা ভাষার একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেন। এই বইটির গ্রন্থকার হিসাবে ‘বাংলাদেশ’ ইতিহাস পরিষদ’ তাকে পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত করেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২/৭৩ সালে এক্ষেত্রে একটা আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিল, বিশেষত তরুন লেখকদের মধ্যে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশেষ করে জ্যোষ্ঠ লেখকদের মধ্যে চাকমা রাজ পরিবারের সদস্য প্রয়াত শ্রী সলিল রায় (১৯২৮-১৯৮১ খ্রি:), কবিতা, প্রবন্ধ, ধর্মীয় সঙ্গীত লিখেছেন। তিনি চাকমা ও বাংলা দুই ভাষাতেই লিখতেন। ইদানীং তার একটি কাব্য গ্রন্থ ‘‘দুঃস্বপ্ন’’ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রয়াত ডা: ভগদত্ত খীসা (১৯৩৩-২০০২ খ্রি:), পেশায় একজন এম,বি,বি,এস ডাক্তার, রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় চিকিৎসক হিসাবে যেমন সুচিকিৎসক ছিলেন, তেমনি চাকমা ও বাংলা ভাষায় একজন সুলেখকও ছিলেন। তার যোগ্য উত্তরসুরী ডা: পরশ খীসা ২ ডিসেম্বর ২০১২খৃষ্টাব্দে তার পিতার বিভিন্ন রচনা যেমন- প্রবন্ধ, যার- সংখ্যা ৩৬টি, ১টা ইংরেজী ছড়া বাকীগুলী বাংলা ভাষায় রচিত, এছাড়া চাকমা ছড়া, চাকমা কবিতা, চাকমা লিমেরিক, চাকমা গীত, চাকমা ছড়া গীত, বাংলা কবিতা, বইটিতে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন ঢাকা থেকে বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় তার কয়েকটা চাকমা লিমেরিক প্রকাশিত হয়েছিল। ‘‘অয় নয় বৈদ্য’’ নামে একটি চাকমা নাটক ও লিখেছেন। এই নাটকটি মূল ফরাসী লেখক মঁলিয়ের, থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন।

প্রয়াত বঙ্কিম কৃঞ্চ দেওয়ান (১৯১৯-১৯৯০ খ্রি:) তার লেখা ‘চাকমা রূপকাহিনী’ বইটি ১৯৭৯ সালে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট, রাঙামাটি থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটি পাঠকের কাছে সমাদৃত হয় এবং দ্বিতীয় সংস্করণও প্রকাশিত হয় ২০০০ইং সনে। রূপকাহিনী লেখায় তাকে অগ্রপথিক আখ্যায়িত করা যায়।এই প্রসঙ্গে শ্রী নন্দলাল শর্মা, প্রাক্তন অধ্যাপক বাংলা বিভাগ- রাঙামাটি সরকারি কলেজ এর লিখিত গবেষণা মূলক বই ‘‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিক’’ বইটি থেকে শ্রী বঙ্কিম দেওয়ান সম্পর্কে তার উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি,- বঙ্কিম দেওয়ান তার ছাত্র জীবন থেকেই চাকমা রূপকথা সংগ্রহ করে বাণীবদ্ধ করার কাজে নিবেদিত প্রাণ। ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের লোক জীবন রসিক সাহিত্যিক বঙ্কিম দেওয়ান, ‘গৌরিকায়’ প্রকাশকাল ১৯৩৬ খ্রি:, ‘জীবন প্রভাত’ ও অন্যান্য চাকমা রূপকথা প্রকাশ করেন। প্রয়াত শ্রী অশোক কুমার দেওয়ান (১৯২৬-১৯৯১ খ্রি:) ‘চাকমা ইতিহাস বিচার’ ও অন্য একটি মোট দু’টি বই লিখেছেন এবং বই দু’টি প্রকাশিত হয়েছে। বই দু’টি গবেষণা মূলক।

তরুন লেখকদের মধ্যে ১৯৮০ সালে বা ৭০ দশকে মধ্যে কয়েকজন বিশিষ্ট ও প্রতিভাবান কবি চাকমা ভাষায় লিখেছেন। তাদের মধ্যে প্রথমে শ্রীঃ দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাকমার (১৯৪৯-১৯৯৬ খ্রি:) কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তিনি ইংরেজী সাহিত্যে এম, এ ডিগ্রী লাভ করেন এবং রাঙামাটি সরকারি কলেজে ইংরেজী বিভাগে প্রভাষক ছিলেন। চাকমা ভাষায় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘‘পাদা রঙ কোচপানা’ ১৯৭৮ সালে এবং বাংলা ভাষায় ‘অন্তর্গত দৃষ্টিপাত’ প্রকাশিত হয়। তার কয়েকটি কবিতা সেই সময় মস্কো থেকে রুশ ভাষায় অনুদিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তিনি রাঙামাটি কলেজ থেকে বিদেশে ‘ইথোপিয়ায়’ ইংরেজী ভাষার অধ্যাপক হিসাবে চাকরিতে যোগদান করেন। তার অকাল প্রয়াণে চাকমা সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তিনি সত্তর দশকের শুরুতে ছদ্মনাম ‘আহ্ননাগা’ নামে প্রবন্ধও লিখেছেন। তার কয়েকজন সাহিত্যনুরাগী বন্ধুরা একত্রে ‘মূঢ়ল্যা’ নামে একটি সাহিত্যিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমি নিজে তার একটি প্রবন্ধ পড়েছি মূঢ়ল্যা থেকে প্রকাশিত সাময়িকীতে। আজ বহু বছর পর সেই প্রবন্ধটি নাম মনে নেই। মনে আছে তিনি প্রবন্ধ লিখায়ও সিদ্ধ হস্ত, হয়তো অনেক অপ্রকাশিত রচনা, কবিতা, প্রবন্ধ তার অকাল প্রয়াণে হারিয়ে গেছে।

কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গবেষক সুগত চাকমা একজন সফল লেখক। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টি. তার চাকমা ভাষায় প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘রাঙা মাত্যা’ ১৯৭০ সালে, দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘রং ধং’ ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। তার উল্লেখ যোগ্য গন্থের মধ্যে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের উপজাতি’ ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত। চাকমা বাংলা কধাতারা (অভিধান) প্রকাশকাল ১৯৭৪ খ্রী:‘পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় ভাষা’-১৯৮৮ সালে রাঙামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত হয়। ‘চাকমা বাংলা অভিধান’ রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর থেকে ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়। খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউট থেকে চাকমাদের আর্থ-সামাজিক বিষয়ক একটি (গবেষণা মূলক) বই প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৮ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃ-ভাষা ইনস্টিটিউট ‘চাকমা ভাষায়’ গবেষণা বা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার বিশেষ অবদানের জন্য তাকে ক্রেস্ট প্রদান করে সম্মানিত করা হয় ২০১৮ সালে। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ থেকে তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। রাঙামাটি পার্বত্য জেলার উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে (যা বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউটে) দীর্ঘদিন পরিচালক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। কয়েক বছর হলো অবসর গ্রহণ করেছেন। তিনি এখনও লেখা চালিয়ে যাচ্ছেন।

শুভ্রজ্যোতি চাকমা। রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠী ইনস্টিটিউটে বর্তমানে গবেষণা কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত। তিনিও প্রবন্ধ ও গল্প লিখেছেন। তার ‘চাকমা জাতির আত্মপরিচয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ’ এই নামে ২০১৯ সালে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে থাকেন। তিনি এখনও লেখা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রয়াত কবি সুহৃদ চাকমা ১৯৫৮ সালে দীঘিনালা থানাধীন বাঘাইছড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বি, এ অনার্স এম, এ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সমালোচক ছিলেন। তাঁর ‘‘বার্গী’’ নামে একটি চাকমা কাব্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন জুম ইসথেটিক্স কাউন্সিল (জাক) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৯৮৮ সালের ৮ই আগস্ট মৃত্যু বরণ করেন। চাকমা ভাষা, সাহিত্য ও ঐতিহ্য নিয়ে তার অনেক প্রবন্ধ বাংলাদেশে এবং ভারতের কলকাতা ও ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ও সাময়িকিতে প্রকাশিত হয়েছে।

শ্রী বিজয় কেতন চাকমা, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ‘‘অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবন্ধ সমগ্র’’ একটি বই প্রকাশ করেছেন। তিনি এম,এন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সভাপতি। একজন বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও কারু শিল্পী।

শ্রী কামিনী মোহন দেওয়ান (১৮৯০-১৯৭৬ খ্রি:) লিখিত ‘পার্বত্য চট্টলের এক দীন সেবকের জীবন কাহিনী’ বইটি আত্ন-জীবনী মূলক হলেও পার্বত্য জনজীবনের সুখ-দুঃখের কাহিনী তিনি প্রাঞ্জল বাংলাভাষায় লিপিবদ্ধকরেছেন। বইটি তথ্যবহুল এবং সুখপাঠ্য। বইটি প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ ইংরেজীতে। দ্বিতীয় সংস্করণ ও প্রকাশিত হয় রেগা প্রকাশনী, রাঙ্গামাটি। প্রকাশনার তারিখঃ ৩০.১০.২০১৮ইং।

জৈষ্ঠ্য লেখকদের মধ্যে অধ্যাপক প্রমোদ বিকাশ কার্বারী। তিনি কবিতার পাশাপাশি গদ্য, সাহিত্য লেখা-লিখি করে যাচ্ছেন। নবীনদের মধ্যে শ্রী বিপম চাকমা সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ বান্দরবান সরকারি কলেজ। তিনি বাংলা ও চাকমা এই দুই ভাষায় লিখেন। তিনি বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক। বাংলা ভাষায় তার একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে।

শ্রী প্রগতি খীসা, কবি, প্রাবন্ধিক। তিনিও চাকমা ও বাংলা ভাষায় লিখে যাচ্ছেন। তার একটি কবিতার বই ও অন্য দুইটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কবি শ্যামল তালুকদার চাকমা ও বাংলাতে কবিতা লিখেছেন। এ পর্যন্ত দু’টি চাকমা ভাষায় ও দু’টি বাংলা ভাষার বই প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে চাকমা বর্ণমালায় শিশুদের জন্য একটি ছড়ার বইও প্রকাশ করেছেন। তিনি এখনও লিখে যাচ্ছেন।

স্মরনিকা চাকমা, প্রভাষক পুজগাঙ কলেজ, পানছড়ি। গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কবিতা লেখেন। বিশিষ্ট কবি প্রাবন্ধিক, ঝুমালিয়া চাকমাও বাংলাতে লিখেন। তাদের লেখা অব্যাহত রয়েছে।

মহিলাদের মধ্যে সর্ব প্রথম আত্মজীবনী মূলক স্মৃতি কথা লিখেছেন প্রয়াত রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের অধ্যাক্ষ মিসেস্ নমিতা দেওয়ান। বইটি বাংলা ভাষায় কিন্তু বইটি আমাদের চাকমা নারীদের তৎকালীন সামাজিক অবস্থান, বিশেষ করে রাঙ্গামাটি শহরের নারী শিক্ষার অবস্থা সম্পর্কে একটি চিত্র পাওয়া যায়।

অবসর প্রাপ্তসিভিল সার্ভেন্ট। শ্রী: সুপ্রিয় তালুকদার, সাবেক পরিচালক, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট) রাঙ্গামাটি। তিনি কয়েকটি বই লিখেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে বইগুলি প্রকাশিত হয়েছে। তার বইগুলির নাম- ‘নানা রঙের দিন গুলো’ প্রকাশকাল ২০০৭ সাল, ‘মায়ানমারে চম্পক নগরের পথে’ প্রকাশকাল ২০১৫ সাল, এই বইটি ইংরেজী ভাষায়ও প্রকাশিত হয়েছে- – Inquest of Champaknagar: The Lost Kingdom of The Chakma, First Published 2020. The Chakma Race: Published by: Tribal Cultural Institute. 1st Publication 2006 A.D. ‘‘নীলিমায় নীল’’ (২০০৫ খ্রি:) প্রকাশিত হয়। এটা তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ।

মিঃ শরদিন্দু শেখর চাকমা- এস,এস, চাকমা নামে সুপরিচিত। তিনি ১৯৩৭ সালে বর্তমান রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়াচর উপজেলার বুড়িঘাট মৌজায় খুল্যবিল গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বি, এ, অনার্স সহ ১৯৫৯ সালে এম, এ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় এম, এ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬১ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ভূটানে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করেন। তিনি সংখ্যালুগু সম্প্রদায় হতে প্রথম অতিরিক্ত সচিবের পদে নিয়োগ লাভ করেন। অবসর গ্রহণের পর লেখা শুরু করেন। ২০১৮ সালে তার প্রকাশিত একটি বই ‘‘স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা’’ তার লিখিত ও প্রকাশিত বই এর সংখ্যা ত্রিশটি উল্লেখ পাওয়া যায়। কয়েকটি উল্লেখ যোগ্য বই এর নাম দেওয়া হলো-

১. আমার দেখা ভূটান (২০০১খ্রি:),  ২. পার্বত্য চট্টগ্রামের সেকাল একাল (২০০২খ্রি:), ৩. The Untold Story.  ৪. মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম (২০০৬খ্রি:), ৫. বিলাত ভ্রমণ (২০০৯খ্রি:) ৬. আমেরিকার ডায়েরী (২০১২খ্রি:), ৭. চাকমা জাতির ইতিহাস (২০১৩ খ্রি:)

জুম ঈসথেটিক কাউন্সিল (জাক) গঠনের ফলে বিশিষ্ট কয়েকজন নাট্যকার, কবি, প্রাবন্ধিক আত্ম প্রকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে কবি, নাট্যকার, গীতিকার, প্রাবন্ধিক এবং একজন দক্ষ সাংস্কৃতিক সংগঠক, চাকমা আধুনিক সাহিত্য এগিয়ে যাওয়ার পেছনে যার অবদান রয়েছে, মৃত্তিকা চাকমা অন্যতম। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি, এ সম্মান ও এম, এ ডিগ্রী লাভ করেন- ১৯৮৪-১৯৮৫ খৃ:। তার রচিত ছোট বড় ১৫টির অধিক চাকমা নাটক দেশের বিভিন্ন জায়গায় মঞ্চস্থ হয়েছে। তৎমধ্যে চারটি নাটক গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তেরটি। এর মধ্যে কাব্য গ্রন্থছ’টি। একজুর মানেক (মঞ্চ নাটক) প্রকাশকাল ১৯৮৮খ্রী: প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘দিক বন সেরেত্তুন’ প্রকাশিত হয় ২ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৫ খ্রী:। তার চাকমা নাট্য সমগ্র (প্রকাশের অপেক্ষায়)। দেশে এবং বিদেশে বিশেষ করে ভারতের কলকাতা, ত্রিপুরা রাজ্যে সাহিত্যিক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেছেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে বর্তমানে জড়িত আছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জুম ঈসথেটিক্স কাউন্সিল (জাক)। তিনি জাক এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ১৯৮১ খ্রি: রাঙামাটিতে ‘জাক’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কর্মজীবনে মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন ১৯৮৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত। ২০২০ সালে তিনি কর্ম জীবন থেকে অবসর নেন। এখনও তিনি লিখে যাচ্ছেন। পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বার ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অগ্রগতিতেও অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছেন বর্তমান অবধি।

ঝিমিত ঝিমিত চাকমা আটটি মঞ্চ-নাটক ও নয়টি গণ-নাটক লিখে মঞ্চস্থ করেছেন। তিনি নিজেও মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন। তিনি বর্তমানে মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়, রাঙ্গাপানি, রাঙামাটিতে প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত আছেন। শান্তি ময় চাকমা চারটি নাটক লিখেছেন এবং মঞ্চস্থ করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন রাঙামাটির মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। দুই এক বছর আগে বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।

কবি শিশির চাকমা, চাকমা ভাষায় ‘তে এব’ নামে একটি কাব্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। ২০১৪ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। তিনি বর্তমানে মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনিও চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স সহ এম, এ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি এখনও লিখে যাচ্ছেন।

তরুণ ও উদীয়মান নাট্যকার নিরুপম চাকমা একজন নবীন নাট্যকর। একদল তরুন-তরুনী তিনি নাট্যনুরাগীদের একত্রিত করে ‘ঝুম ফুল’ থিয়েটার’ নাট্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন ২০ নভেম্বর ২০১৫ খ্রী:। এযাবত তার লিখিত ছয়টি নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। তিনি তার নাট্য শিল্পীদের সহযোগে বিভিন্ন সময়ে, রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউট, এ ঢাকা শিল্পকলা একাডেমী, চট্টগ্রাম শিল্পাকলা একাডেমী, বাঘাইছড়ি ও কাচালং কলেজ, সিজক কলেজ প্রভৃতি জায়গায় সফলভাবে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। তিনি নিজে একজন দক্ষ অভিনেতা। আশা করা যায় আগামীতে তার পরিচালনায় ‘ঝুম ফুল থিয়েটার’ ধারাবাহিক ও নিয়মিত নাটক মঞ্চস্থ করে এই পার্বত্য অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের বিশেষ করে চাকমা সমাজ ও সংস্কৃতির অগ্রগতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবেন।

স্বনামখ্যাত ও সঙ্গীত জগতে জৈষ্ঠ্য জনপ্রিয় চাকমা গায়ক, সুরকার, গীতিকার রনজিত দেওয়ান। তিনি স্কুল জীবন থেকে সঙ্গীত চর্চা শুরু করেন। এখন তার বয়স ষাট উর্ধ- এখনও তিনি সঙ্গীত সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এক সময় বাংলাদেশ বেতারের পাহাড়ীকা অনুষ্ঠানে নিয়মিত চাকমা গান গাইতেন। তার বেশ কিছু গান জনপ্রীয় হয়েছে। তার মধ্যে ‘‘চেঙে মেয়োনী কাচলং’ এই গানটি স্রােতাদের মাঝে বেশ জনপ্রীয় হয়েছে।

রাঙামাটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক প্রয়াত কুমার সুমিত রায়, চাকমা গানে সর্ব প্রথম পাশ্চ্যত্য সুর সংযোজন করেন- তিনি অনেক জনপ্রিয় চাকমা গান লিখেছেন এবং সুর দিয়েছেন- যা আজও খুবই জনপ্রিয়। এক্ষেত্রে তিনি অদ্বিতীয়। তার রচিত ও সুরারূপিত গানগুলি এখনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

রূপায়ন দেওয়ান, একজন সুরকার, গায়ক এবং দক্ষ হারমোনিয়াম ও কী-বোর্ড বাদক। চাকমা গানে গীটার বাজিয়ে সংগীত পরিবেশনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন- উত্তম দেওয়ান (মানি)।

চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, গীটার ও মাউর্থ অর্গান বাদনে স্বীয় বৈশিষ্ট্য পরিচয় দিয়েছেন। মাউর্থ অর্গানে কয়েকটি জনপ্রিয় রবীন্দ্র সঙ্গীত বেশ কয়েক বছর আগে তিনি সিডি প্রকাশ করেছেন। তিনি এখনও সঙ্গীত চর্চা করেন।

তরুনী উদিয়মান শিল্পীদের মধ্যে পনি চাকমা ২০১৯ সালে চ্যানেল আই ৪র্থ স্থান অধিকার করেছিল। মেয়েদের মধ্যে পার্কি চাকমা, ধর্মরত্না চাকমা, অনন্না চাকমা, তিশা দেওয়ান, দিপান্নিতা চাকমা, সুচিন্তা চাকমা, সুচরিতা চাকমা, টিউলিপ চাকমা (মিষ্টি), উমারি চাকমা (রানজুনি), জোনাকি চাকমা। ছেলেদের মধ্যে রুবেল চাকমা, কোয়েল চাকমা, নোবেল চাকমা, বাপ্পি চাকমা, দিপ্ত দেওয়ান (বাপ্পি)। কীবোর্ড (Keaboard)  প্লেয়ার রিংকু চাকমা, কোয়েল চাকমা, রুবেল চাকমা, ধারাচ মনি চাকমা, সৌরভ দেওয়ান, সুবেশ চাকমা।

চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী ‘ঝুম-নৃত্য’ ও ‘বিঝু- নৃত্য’ বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন উৎসবে বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য শিল্পীরা এই নৃত্য পরিবেশন করে থাকেন। ফিফা চাকমা ২০১৪ সালে কোলকাতা রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে নৃত্য কলায় বি, এ, অনার্স ও এম, এ ডিগ্রী লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা শিল্পকলা একাডেমীতে নৃত্য শিক্ষক বা Instructor হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনি টেলিভিশনে বিশেষ প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণ করেন।

পুরুষ নৃত্য শিল্পীদের মধ্যে শোভন দেওয়ান (টিটু) বিভিন্ন নৃত্য প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন সহকারী শিক্ষক। বেশ জনপ্রিয় এলিন চাকমাও  রাঙামাটি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিভিন্ননুষ্ঠানে নৃত্য প্রোগ্রামে অংশ গ্রহণ করে থাকেন। পাশাপাশি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নৃত্যের তালিম দিয়ে থাকেন। মিসেস সুফলা তংচংগ্যা রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠীর ইনস্টিটিউটে নৃত্য শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। উপজাতীয় নৃত্য শিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ অবদান রয়েছে। তারা সকলেই সংস্কৃতির এই মাধ্যমকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

আমি লক্ষ্য করছি চাকমা ভাষায় উল্লেখযোগ্য গদ্য, গল্প, উপন্যাস লেখার এখনও তেমন কেউ নেই। সাহিত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি এখনও শূণ্য পড়ে আছে। সাংস্কৃতির অন্যতম শাখা, সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে, তথাপি সঙ্গীত শিল্পীদের এক্ষেত্রে আরো নিবেদিত ও গভীর সাধনা প্রয়োজন। নৃত্য চর্চায়ও শুধু ঐতিহ্যবাহী বিঝু, জুম নৃত্য ছাড়া আর কোন তেমন আকর্ষনীয় নৃত্য তৈরী হয়নি। এক্ষেত্রে নূতন নৃত্যের উদ্ভাবন প্রয়োজন।

সবশেষে, আমি মনে করি আমাদের বর্তমান চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বয়সে তরুণ, এর সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য আমাদের আরো দীর্ঘপথ যেতে হবে।

লেখক: চাঁদ রায়, বিশিষ্ট সমাজ সেবক।

তথ্যসূত্র: তনাওতা (বিঝু-২০২২), বনযোগীছড়া কিশোর কিশোরী কল্যাণ সমিতি।

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *