চাকমা সাহিত্য চর্চা : কবিতা, নাটক ও গল্প

প্রাচীনকালে চাকমা ভাষায় বহু রূপকথা, গল্প, ছড়া, ধাঁধা, গীত, ঘুমপাড়ানী গান, বারমাসী, পালাগান প্রবাদ বাক্য, বাগধারা ইত্যাদি রচিত হয়েছিল। চাকমারা রূপকথাকে ‘পজঝন’, ধাঁধাকে বানাহ্, ঘুম পাড়ানী গানকে ওলিদাগনি গীত, প্রবাদ বাক্যকে “দাঘ’কধা” (ডাকের বচন) বলে। এ সকল চাকমা লোকসাহিত্য বেশ চিত্তাকর্ষক বিষয়। চাকমা পালা গানগুলোর মধ্যে রাধামন-ধনপুদি এবং ‘চাদিগাং-ছারা’ অধিক উল্লেখযোগ্য। [চাকমা সাহিত্য] ‘গেংগুলি’ নামক চাকমা চারণ কবিরা গ্রামদেশে সাত রাত সাত দিন ধরে গেয়েও রাধামন ধনপুদি পালাগান শেষ করতে পারে না বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

চাদিগাঙ ছারা পালাগানটি গ্রামে বা কোন গৃহে গাওয়া নিষেধ। ‘চাদিগাঙ ছারা’ শব্দগুলোর অর্থ ‘চট্টগ্রাম ছাড়া’। অনেকের ধারণা এতে আদিতে চাকমাদের চট্টগ্রাম ত্যাগের বিষাদ কাহিনী ছিল। এ কারণেই এটি গ্রাম থেকে দূরে জনশূন্য কোন প্রান্তরে বা জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে গাওয়া হতো । সাধারণ চাকমারা মনে করতো যে, এটি যে গ্রামে গাওয়া হবে, সে গ্রামটি জনশূন্য হয়ে যাবে তাই এখনও চাকমাদের কোন গ্রামে ‘চাদিগাং ছারা’ পালা গানটি গাওয়া হয় না।

চাকমা কবি শিবচরণকে চাকমাদের আদি কবি মনে করা হয়। তাঁর রচিত কবিতা বইয়ের নাম ছিল ‘গোঝেন লামা’। জনশ্রুতি মতে এতে সাতটি ‘লামা’ ছিলা। কবি শিবচরণ রচিত গোঝেন লামা-র অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকটি গীতি কবিতাকে এক একটি ‘লামা’ বলা হয় । এতে সৃষ্টি সম্পর্কে কবির ধ্যানধারণা এবং গোঝেন (স্রষ্টা) – এর প্রতি তার স্তুতি রয়েছে । অতীতে চাকমাদের কেউ কেউ মনে করতো যে, সাধু শিবচরণের সাতটি ‘লামা’ (গীতি কবিতা) অর্থসহ যে আয়ত্ত করতে পারবে সে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী হবে অর্থাৎ ধ্যানের ক্ষেত্রে সিদ্ধিলাভ করবে।

কবি শিবচরণের পরবর্তীকালে শতাধিক বছর ধরে চাকমাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোন সৃষ্টিশীল রচনা লিপিবদ্ধ অবস্থায় এ যাবতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। বিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে ধর্মধন চাকমা-বর্ণে বাংলা ভাষায় ‘চান্দবী’ নামক একজন রমণীকে নিয়ে কাব্য রচনা করেন। অতঃপর ১৯৩০ সালে প্রবোধচন্দ্র চাকমা ওরফে ফিরিংচান ‘আলসি কবিতা’ নামক একটি কবিতার বই প্রকাশ করেন। এই বইটির ‘আলসি মিলার কথা’ নামক চাকমা কবিতাটি ঐ সময় চাকমাদের সাধারণ লোকদেরকে প্রচুর আনন্দ যুগিয়েছিল।

অতঃপর চাকমা রাজপরিবারের সদস্য রাণী বিনীতা রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৩৬ সাল থেকে প্রথমবারের মত গৈরিকা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার নামকরণ করেছিলেন ‘গৈরিকা’। এই পত্রিকাটি অনিয়মিতভাবে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। গৈরিকায় বাংলা এবং ইংরেজী উভয় ভাষায় লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। এতদঞ্চলে গৈরিকা সাহিত্য চর্চা ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীকালে গৈরিকায় লেখক ও কবিদের মধ্যে অনেকে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম চাকমা চিত্রশিল্পী চুনিলাল দেওয়ানের নাম উল্লেখযোগ্য। গৈরিকা প্রকাশের প্রথম দিকে এর সম্পাদক ছিলেন মি: প্রভাত কুমার দেওয়ান ও কবি অরুন রায়। মি: চুনিলাল দেওয়ান গৈরিকায় তাঁর রচিত প্রথম চাকমা কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। ছয়ের দশকে ১৯৬৬ সালে বান্দরবান থেকে ‘ঝর্ণা’ নামে একটি পত্রিকা এবং রাঙ্গামাটি থেকে ‘পার্বত্য বাণী’ (১৯৬৭-৭০) নামে আরো একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিলো।

এ সকল পত্রিকায় স্থানীয় লোকেরা তাদের লেখা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ঊনিশ শ ষাটের পরবর্তী কালে চাকমা রাজ পরিবারের সদস্য কবি সলিল রায় ‘আধুনিক চাকমা গান’ নামে কয়েকটি গান রচনা করেন। এই গানগুলি ঐ একই নামে তাঁর অপ্রকাশিত একটি পাণ্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধর য়েছে। ঐ সময় মি: সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এগুলি থেকে কয়েকটি আধুনিক চাকমা গান চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে প্রচার করেছিলেন। বিশিষ্ট লেখক ও গীতিকার ডাঃ ভগদত্ত খীসাও. এ সময় বেশ কিছু চাকমা আধুনিক ছড়া রচনা করেছিলেন যদিও সেগুলি প্রকাশের সুযোগের অভাবে অপ্রকাশিতই থেকে যায়। তা সত্ত্বেও বিগত শতাব্দীর ছয়ের দশকেও কিছু কিছু চাকমা সাহিত্যের চর্চাহ য়েছিল।

তবে চাকমা সাহিত্যে সত্যিকার ভাবে প্রথম জোয়ার আসে সত্তরের পরবর্তী কালে। এ সময় জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর (জুভাপ্রদ), মুড়োল্যা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী ইত্যাদি গোষ্ঠীগুলো চাকমা সাহিত্য চৰ্চা ও প্রচারের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এতে সাধারণ চাকমাদের মধ্যে চাকমা সাহিত্য জনপ্রিয়তাও স্থায়ী আসন লাভ করে। ঐ সময় থেকে এ যাবতকাল পর্যন্ত বাংলা বর্ণে চাকমা ভাষায় বহু বই ও লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় এবং তার ধারবাহিকতা এখনও চলছে। ১৯৭০ সালে ননাধন চাক্‌মা কর্তৃক রচিত ‘রাঙামাত্যা’ নামক একটি কবিতা বই প্রকাশিত হয়। অতঃপর ১৯৭৮ সালে কবি দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাকমার রচিত ‘পাদারঙ কোচপানা’ (পাতারঙ ভালবাসা) এবং সুগত চাকমা (ননাধন) রচিত ‘রংধং’ নামক কবিতার দু’টি বই প্রকাশিত হয়।

১৯৭৩ সালে ‘দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের রচিত কখনও আনমনে নামক বাংলা কবিতাটি রুশ ভাষায় ‘অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৭ সালে সুহৃদ চাকমা কর্তৃক রচিত ‘বার্গী’, ১৯৯২ সালে কবিতা চাকমা কর্তৃক রচিত ‘জ্বলি ন উধিম্ কিত্ত্যেই ।’ (রুখে দাঁড়াব না কেন!), ১৯৯৫ সালে মৃত্তিকা চাকমা কর্তৃক রচিত “দিগবন’ সেরেত্তুন” নামক কবিতা বইগুলো প্রকাশিত হয়। অন্যদের মধ্যে কবি ফেলাজেয়া, বীর চাকমা, কৃষ্ণচন্দ্ৰ চাকমা, পরমানন্দ চাকমা, রঞ্জিত দেওয়ান ও সমিত রায়ের রচিত বহু কবিতা ও গান ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

চাকমা নাটকের ক্ষেত্রে প্রথম চাকমা নাটক ধেঙাবৈদ্য, (শয়তান ওঝা) ১৯৭৮ সালে রাঙ্গামাটিতে মঞ্চস্থ হয়। এর লেখক সুগত চাকমা (ননাধন)- এর লিখিত অপর নাটক ‘নীল মোন সবন’ (নীল পাহাড়ের স্বপ্ন)- ও ১৯৭৯ সালে রাঙ্গামাটিতে মঞ্চস্থ হয়। ১৯৮২ সালে ডাঃ ভগদত্ত খীসা কর্তৃক রচিত ‘হয় নয় বৈদ্য’ মঞ্চস্থ হয়। তবে এটি ১৯৮২ সালে মঞ্চস্থ হলেও রচনার কালের দিক থেকে এটি ছিল চাকমা ভাষায় রচিত দ্বিতীয় নাটক।

অতঃপর ১৯৮৩ সালে চিরজ্যোতি চাকমা কর্তৃক রচিত ‘আনাত ভাঝি উধে কা মু’ (আয়নায় কার মুখ ভেসে ওঠে), অতঃপর শান্তিময় চাকমা কর্তৃক রচিত নাটক ‘যে দিনত যে কাল’ (যে দিনে যে কালে) ১৯৮৪ সালে, ‘বিঝুরামর সর্গত যানা’ (বিঝুরামের স্বর্গ যাত্রা) ১৯৮৫ সালে ‘আন্ধারত জুনি পা্র’ (অন্ধকারে জোনাকীর আলো) ১৯৮৬ সালে এবং ‘ঝরাপাদার জীংকানী’ (ঝরাপাতার জীবন) ১৯৯৪ সালে রাঙ্গামাটিতে মঞ্চস্থ হয়। শেষোক্ত নাটকটি ১৯৯০ সালে প্রথম খাগড়াছড়িতে মঞ্চস্থ হয়। রাঙ্গামাটিস্থ উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট-১৯৮২ সাল থেকে এসব চাকমা নাটক মঞ্চায়নে আর্থিক সাহায্য প্রদান করতে শুরু করে এবং এখনও করে যাচ্ছ।

মৃত্তিকা চাকমা রচিত চাকমা নাটক ‘দেবঙসি আর কালা ছাবা’ ১৯৮৮ সালে খাগড়াছড়িতে মঞ্চস্থ হয়। তার রচিত অপর নাটকগুলির মধ্যে ‘গোঝেন’ ১৯৯০ সালে রাঙ্গামাটিতে এবং মহেন্দ্রর বনভাঝ (মহেন্দ্রর বনবাস) ১৯৯১ সালের ১৪ জুন তারিখ ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়। অতঃপর ‘এক জুর মান্নেক’ (একজোড় মানিক) ১৯৯২ সালে ও জোঘ্য (যক্ষ) ১৯৯৪ সালে রাঙ্গামাটিতে মঞ্চস্থ হয়। এগুলোর মধ্যে ঢাকায় মঞ্চস্থ চাকমা নাটক ‘মহেন্দ্রর বনভাঝ’ নাটকটির দৃশ্যাবলী প্রথমবারের মত ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছিল।

গত ১৯শে ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯ তারিখ তাঁর রচিত ‘হককানির ধন পানা’ এবং ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনেও ২০০১ সালে ‘এগাত্তুরর তরণী’ রাঙ্গামাটিতে মঞ্চস্থ হয়। নাট্যকার ঝিমিত ঝিমিত চাকমা রচিত ‘অহ্‌দত’ ১৯৯৫ সালে এবং ‘আন্দলত পা্র’ (আড়ালে আলো) ১৯৯৬ সালে রাঙ্গামাটিতে মঞ্চস্থ হয়। চাকমা নাটকগুলোর মধ্যে এটি প্রথমবারের মত মঞ্চের বাইরে আউটডোরে স্যুটিং করে দৃশ্যাবলী ধারণ করা হয়েছিল। ১৯৮৪ সাল থেকে এসব নাটক মঞ্চায়নে জুম ঈসথেটিকস্ কাউন্সিল (জাক)-এর সদস্যরা বহু ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল এবং এখনও করে যাচ্ছে।

এই পর্যন্ত চাকমা সাহিত্যের উপর যে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা হয়েছে তা থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, সত্তরের পরবর্তীকাল থেকে আধুনিক চাকমা সাহিত্যের পথ চলা শুরু হয়েছে এবং তরুণ চাকমা কবি, গীতিকার ও নাট্যকারেরা বিগত তিন দশকে তাদের মনন ও সৃজনীর মাধ্যমে চাকমা সাহিত্যের অঙ্গনে যে অবদান রেখেছেন ও সমৃদ্ধি ঘটিয়েছেন তার সুদূর প্রসারী প্রভাব একুশের নতুন শতাব্দীতেও বহুকাল পর্যন্ত বিরাজ করবে।

রেফারেন্স:
G.A. Grierson 1903: Linguistic Survey of India Vol. V part 1.
Heinz Becharl 1967 : Contemporary Buddhism in Bengal
and Tripura. Educational miscellany. Vol. Iv. Nos. 3 & 4.
Lama, Chimpa and Alaka Chattopaddhya (tr) 1980:
Taranath’s ‘History of Buddhism in India’. Calcutta: K.P.
Bagchi and co.
Md. Ishaque 1974 (ed): Chittagong Hill Tarcts district
gazetteer.
কবিতা চাকমা ১৯৯২ ঃ জ্বলি ন উধিম্ কিত্তেই! (রুখে দাঁড়াব না কেন!) ঢাকা : নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা।
দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাকমা ১৯৭৮ : পাদারঙ কোচপানা (সবুজাভ ভালবাসা)
রাংগামাটি : জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর (জুভাপ্রদ)।
মৃত্তিকা চাকমা ১৯৮৮: একজুর মান্নেক (একজোড়
মানিক) (সাইক্লোস্টাইডকরণকৃত) )
রাঙ্গামাটি । ১৯৯৩ : গোঝেন, রাঙ্গামাটি : জুম ঈসথেটিক্স কাউন্সিল ১৯৯৫।
দিগবন’ সেরেত্তুন । রাঙ্গামাটি : ছড়াথুম পাবলিশার্স।
সুগত চাকমা (ননাধন) ১৯৭০: রাঙামাত্যা, রাঙ্গামাটি : সরোজ আর্ট প্রেস।
১৯৭৮ : রংধং, রাঙ্গামাটি : জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর, (সংক্ষেপে জুভাপ্রদ)
সুহৃদ চাকমা ১৯৮৯ : বার্গী । রাঙ্গামাটিঃ জুম ঈসথেটিক্স কাউন্সিল (জা-ক)
[দৈনিক বাংলার বাণী ২১শে মে ১৯৯৯ সংখ্যায় সুগত চাকমা কর্তৃক লিখিত প্রবন্ধ-চাকমা সাহিত্য চৰ্চা]

লেখক: সুগত চাকমা (ননাধন)

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *