পার্বত্য চট্টগ্রাম: এ সময়ের তরুণ কবি ও কবিতা

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত এগারো ক্ষুদ্রজাতিসত্তার প্রত্যেকেরই লোকায়ত সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপট রয়েছে। প্রধানত গীতিকবিতা, নৃত্য এবং লোক-আঙ্গিকের নাট্যক্রিয়াই ওদের অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম। চাকমা ও তনচংগ্যা সমাজে বর্তমানে খুবই বিরল—অথচ এক সময় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ছিল গেঙ্গুলি, গেঙ্গুলি বা গেঙহুলি গায়কদল। শব্দটির অর্থ: চারণ বা যাযাবর গায়েন। এরা লোকসমাজের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার নানামাত্রিক অভিজ্ঞতাকে কথার মালা গেঁথে দর্শনীয় অঙ্গভঙ্গিসহ পরিবেশনে ছিল রূপদক্ষ। কথার স্ফুরণের সঙ্গে অঙ্গ সঞ্চালনে যে দ্বিমাত্রিক দ্যোতনার সৃষ্টি হয় তাতে লোকমানসের অনেক অব্যক্ত অনুভূতি প্রকাশের পথ পায়। তবে সৌন্দর্যসৃষ্টি বা সূক্ষ্ম নান্দনিক জগতে দর্শক-শ্রোতাকে সম্পৃক্ত করার কোনো প্রয়াস এ-গানের মর্মে কদাচিৎ থাকে। (পার্বত্য চট্টগ্রাম: এ সময়ের তরুণ কবি ও কবিতা)

এর বিগলিত লক্ষ্যই হলো: উপস্থিত জনমানুষের স্মৃতিতে বিধৃত দূর কি নিকট অতীতের ঘটনাবলিতে নতুন অভিঘাত সৃষ্টি করে জীবনের আবর্তনময় বাস্তবতায় আবারও অবগাহিত হওয়ার জন্যে অনুপ্ররেণার সঞ্চার করা। সে-অর্থে গেঙ্গুলি, গেঙ্গুলি বা গেঙহুলিরা ছিল বাংলার কবিয়াল বা কবিওয়ালাদের উত্তর পুরুষ। এদের (কবির) লড়াইয়ে খুব সমসাময়িক আশা-হতাশা আর বিপর্যয়-বিপর্যাসের কথামালা উচ্চারিত হতো বলে এককালে বাংলাদেশে কবিয়াল বা কবিওয়ালাদের লোকপ্রিয়তা ছিল অসামান্য। মারমা সমাজে পাঙখুঙ নৃত্যাভিনয়ের প্রচলন ছিল। এ নাট্যক্রিয়ায় মুখোশের ব্যবহার অপরিহার্য।

বিভিন্ন পশু, জন্তু-জানোয়ার বা বন্যপাখির স্থানীয় শিল্পীর বানানো মুখোশ পরিহিত অংশগ্রহণকারীদের পাঙখুঙ অভিনয় দূর-দূরান্তের মারমা গ্রামসমূহে পালা-পার্বণে এখনও মাঝে-মধ্যে দেখা যায়। ত্রিপুরা সমাজের সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপট অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ। ভারতের বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্যের ১৯৪৯ সালের পূর্ববর্তী প্রায় তেরো শ’ বছরের মাণিক্য রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতাধন্য এই ত্রিপুরা সংস্কৃতি। এর রাজন্যবর্গ কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা সংস্কৃতির সংস্পর্শে থেকে মাতৃভাষা ককবরক এবং ভাষা ও সাহিত্যের উন্নততর অবয়ব নির্মাণে অবদান রাখেন। এ রাজদরবারে ককবরকের সমমর্যাদায় বাংলাভাষাও ছিলরাজভাষা। সেই উত্তরাধিকার বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের ত্রিপুরাসমাজ যথাসাধ্য বহন করে চলেছে আজো। ফলে সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে ওদের রুচি ও সৌন্দর্য চেতনা সহজেই নজর কাড়ে আগ্রহী মানুষের।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ম্রো, খুমি, লুসাই, বম, চাক, খিয়াঙ ও পাঙখোদের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে জীবনকে একঘেয়েমি থেকে মুক্ত করে অনাগত দিনের জন্যে বিপুল স্পৃহা নিয়ে কাজে যুক্ত হওয়ার আবেদন আছে। দৃষ্টান্তমূলক কৃত্যাদি আছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নিজস্ব বর্ণমালা বা ভাষাগত চিন্ময় সম্পদে এদের অধিকাংশেরই পাকাপোক্ত কোনো ভিত নেই। বর্মিভাষা ও বর্ণমালার গৌরব নিয়ে মনোজাগতিক সন্তুষ্টিতে দিনাতিপাত করলেও পার্বত্য মারমাদের সমৃদ্ধ বা উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্যসম্ভার নেই। চাকমা সমাজ খুব কাছের অতীত সময় থেকে নিজেদের ভাষাচিন্তা ও ভাষাকাঠামোকে একটা সর্বজনগ্রাহ্য রূপ দিতে প্রয়াসী হলেও তা এখনও সুগঠিত আকার-আকৃতি পায়নি। বিষয়টি নিয়ে চাকমা শিক্ষিতমহলে প্রচুর বাকবিতণ্ডা, মতভেদ, মতবিরোধের অস্তিত্ব রয়েছে। তন্‌চংগ্যা ভাষা ও সাহিত্যের রূপ-অবয়বের সংগে চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের গভীর সাযুজ্য থাকায় অনেকে বিশ্বাস করে যে, এরা একই জাতিসত্তার দু’রকম উদ্ভাসন মাত্র।

অন্যদিকে চাক ও মারমা ভাষার সমিলতা অনেককে অবাক করলেও তা আসলেই বাস্তবতা। আবার, নিজস্ব বর্ণমালা না-থাকা ম্রো, খুমি এবং বম লুসাই-পাঙখোদের কথ্যভাষার মৌলভিত্তি এক, অভিন্ন। শুধু স্থানিকতার তারতম্যে কিছু গরমিলের দেখা মেলে। এসব সত্ত্বেও পার্বত্য আদিবাসীদের লোকায়ত সাংস্কৃতিক ভুবন বেশ বৈচিত্র্যমণ্ডিত। লেখা বাহুল্য, এই বৈচিত্র্য মুখে-মুখে আর বংশ পরম্পরায় একালেও প্রবহমান। ঠিক এভাবেই এ অঞ্চলে লোকগান বা গীতি কবিতার একটা সমৃদ্ধ ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে।

এ ধারাটি সমকালীন শিক্ষায় আলোকিত তরুণ আদিবাসী কবিদের রচনায় কখনো-সখনো বেশ ফুটে ওঠে। মাতৃ কি বাংলাভাষায় ওরা যখনই তদ্গত ভাবুকতাকে ভাষিক রূপ দেয়—তাতে গীতলতা দুর্লক্ষ্য নয়। আর অধিকাংশ কবিতায় তারল্য, তাৎক্ষণিকতা আর নরনারীর প্রেমাত্মক প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ দুর্মরভাবে অবস্থান নেয়। সামাজিক বা ব্যক্তিগত বিয়োগাত্মক ঘটনা আদিবাসী সমাজে দুর্লভ হওয়ার কথা নয়। তথাপি গভীরতম ভাবাবেগের মহত্তম অভিপ্রকাশ বিশেষ নেই। এর মূল কারণ একটাই। তা হলো: ভাষাগত বুনিয়াদ পার্বত্য আদিবাসী সমাজে এখনো তেমন গড়ে ওঠেনি। যদিও তাদের মধ্যে এ বিষয়ে সফলতা অর্জনের সর্বাত্মক প্রয়াস রয়েছে, যা আগেও একটু ইঙ্গিত করেছি।

এখানে সংগৃহীত তরুণ কবিদের কবিতায় সমকালীন মনো ও বহির্জাগতিক সংকট সমস্যার ছবি আছে। সিংইয়ং ম্রো’র কবিতা প্রকৃতি অনুধাবনাকে আলিঙ্গন করে পল্লবিত হয়েছে। তার কবিতাপাঠে এক ঝিমধরা আরণ্যিক প্রতিবেশ পাঠকের বোধে জেগে ওঠে। বান্দরবানের ম্রো-সমাজের আচার-আচরণ, পূর্বপুরুষবাহিত সংস্কার-বিশ্বাসের একেবারে গোড়ার দিককার প্রবণতাগুলো সিংইয়ং ম্রো’র কবিতার উপজীব্য হয়েছে। উল্লেখ্য, পার্বত্য বান্দবানে সেই আদ্যিকাল থেকে বসবাসরত ম্রো-জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিংইয়ং ম্ৰোই এখন পর্যন্ত একমাত্র কবি। সমাজ সংস্কারক সাধু মেনলে ম্রো উদ্ভাবিত ম্রো বর্ণমালার প্রসার, ম্রো-ভাষা শিক্ষা ও উন্নয়নে সিংইয়ং ম্রো একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।

মুক্তা চাকমা, নতুনময় চাকমা, নির্মল কান্তি চাকমা, কর্মধন তন্‌চংগ্যা ও সুগম চাকমা পার্বত্য রাঙামাটির সন্তান। মুক্তা চাকমা হিল চাদিগাঙ (পার্বত্য চট্টগ্রাম); কর্মধন তনচংগ্যা পহর জাঙাল (আলোকিত পথ); নির্মল কান্তি চাকমা ক্লেঙ (সিঁড়ি); সুগম চাকমা রানজুনি (রঙধনু) নামের অনিয়মিত স্থানিক সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করেন। উশ্যেপ্রু ও আলোড়ন খীসা পার্বত্য খাগড়াছড়ির যথাক্রমে মারমা ও চাকমা আদিবাসী তরুণ৷ উশ্যেপ্রু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আলোড়ন খীসা কমপিউটার বিষয়ে অধ্যয়নরত। চেদনা (চেদনা) নামক সাময়িকপত্র সম্পাদনা করে উশ্যেপ্রু তরুণ পাহাড়ি সাহিত্যপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। চেদনা’র কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে ।

অংশৈসিং মংরে ও মংশৈচিং চাক যথাক্রমে পার্বত্য বান্দরবানের মারমা ও চাক জনসমাজের সাহিত্যকর্মী। মংরে পার্বত্য লিটল ম্যাগাজিন সমুজ্জ্বল সুবাতাস-এ [হাফিজ রশিদ খান ও চৌধুরী বাবুল বড়ুয়া সম্পাদিত] কবিতা ছাপিয়ে সমকালীন সাহিত্য- পরিবেশে পরিচিতি পেয়েছেন। মংশৈচিং চাক বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি উপজেলার বাসিন্দা। অতি সম্প্রতি তার কিছু গদ্য ও কবিতা স্থানীয় সাহিত্যপত্রিকাগুলোতে ছাপা হয়েছে।

সিংইয়ং ম্রো’র কবিতা

প্রিয়তমাসু

ও আমার প্রিয়তমা-আমার মনোহারিণী
আজ শীতের ক্লান্ত
জোছনার বিনিদ্র রাতে
দেখাও তোমার অদ্ভুত মুদ্রার বিমোহ নৃত্যু;
ঝাপসা জোছনায় স্নাত করো
তোমার বিমুগ্ধ রূপের সুধায়;

তোমার সযত্নলালিত ওই স্তনযুগল যেন
উইয়ের ঢিবি—ওই
পাকাবেলের বোঁটায় সিপাহি
বুলবুলির মুখ!
ও আমার প্রিয়তমা—তোমার ঠোঁটজোড়া
জ্বলন্ত অগ্নিশিখা;
কোমরদোলানো অঙ্গাভরণ যেন
বুনোকলার পাতা—হাওয়ায় দোলে;

আমাকে মাতাল করে দাও তোমার রূপের মাধুর্যে—
আহা আমি কি সত্যি পাবো
উষ্ণতার আলিঙ্গন!
আমার জীবনের অপূর্ব আনন্দ!

অরণ্যের পদাবলি

বনাবৃত ঝরনার কলধ্বনি অপরূপ ঘুমায় তন্দ্রালোকে;
আকাশচুম্বী বৃক্ষরাজি-মৃত্তিকা-অরণ্য
জেগে থাকে চাঁদের আলোয় ।

দূর পাহাড়ের সীমান্ত – অপার যৌবন
ডাকে পিছু স্মৃতির মণিকোঠায়।—
রঙিন প্রজাপতি কি ডানা মেলে নিয়ে যাবে
আমায় ওই দূর অজানায়!

মন হারিয়ে যায়, প্রাণ জুড়িয়ে যায়
অরণ্যের অজানা অকিডসুবাসে,
উড়ে যেতে চায় মন নীলিমায়
চৈতি বসন্তের মৃদু হাওয়ায়।

জ্যৈষ্ঠে পেখম মেলে বনময়ূরী
বৃষ্টিকে আমন্ত্রণ জানায় বর্ষা আগমনের বার্তায়
অপরূপ সাজে অরণ্যের পারলার
অচিরেই দূর হবে গ্রীষ্মের বর্বরতা।

অঘ্রানে নবরূপে জাগে জুমপাহাড়
আসে নবান্ন-উৎসব আরণ্য জনপদে;
জুমঘরে ধান শুকোয়
ষোড়শী-কিশোরীদল
গুনগুন গান গায় উদোম রোদে।

আঁধারে দীপ্তি ছড়ায় অলস জোনাকিরা—
নেচে বেড়ায় কার্তিক-পূর্ণিমায়;
নিভৃতের জোছনা-চাঁদোয়াতলে
শস্যভরা জুমিয়াপাড়া নীরবে ঘুমায়।

আমার স্বপ্নগুলো
শ্রাবণের জুমঘরে আঙ্কামাঙগুলো এখন
উলঙ্গ পাহাড়ের গায়ে নিভৃতে কাঁদে;
বংথাপ পাখির নীড়ের মতো
ছাউনিবিহীন মৃত্তিকাখণ্ডে
আছে শুয়ে অগ্নিবৃষ্টিতে।

নগ্ন পাহাড়ের ওই পাথরগুলো
পরিহাস করে সারাক্ষণ;
আধমরা বৃক্ষগুলো আকাশকে
দেয় অভিশাপ
ক্রোধে, আক্রোশে।

ঘুমন্ত আঙ্কামাঙগুলো কুরভাঙ পাখির
নীড়ের মতো
পুত্মা আগডালে ঝুলে আছে ভীতপ্রদ
হাওয়ায়—
ক্লোউ তারা ওয়ারখুইলেঙ কেরেক
বিলাপ করে সারারাত ।

ওরা জোছনায় নিজেদের প্রকাশ করতে
অপারগ হয়ে চাঁদকে
অভিশাপ দেয়
গভীর অভিমানে ।

ম্রো-শব্দসমূহের বাংলা অর্থ: আঙ্কামাঙ – আমার স্বপ্ন। বংথাপ – একধরনের বুনো পাখি, জুমপোড়ার শেষে উদোম মাটির ওপর বাচ্চা দেয়। কুরভাঙ – কালো ঈগল, এরা রাতে বিকৃত স্বরে ডাকে। পুত্মা – ধুন্দল গাছ। ক্লোউ – সপ্তর্ষীমণ্ডল। ওয়ারখুইলেঙ – ধ্রুবতারা। কেরেক -নক্ষত্র।

মুক্তা চাকমা’র কবিতা

উপলব্ধি

যেখানে আপন-পর অনেকে আশ্রয়হীন হয়ে আছে
সেখানে পারবো না আমি
নিশ্চিন্তে কারো কাছে মুখ গুঁজে থাকতে;
কৈশোর থেকে তারুণ্যে পা রাখার সময়
মনের অলিগলিতে যে-প্রেম
ঘাপটি মেরেছিল
সংগ্রামী সুহৃদের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়েছে তা।

মৃত্যু মাথায় অহর্নিশ হেঁটে চলেছি
যে কোনো সময় প্রতারণা গুম করতে
পারে আমাকে—তাই
মায়ায় জড়াতে চাই না আর
এ অনিশ্চিত জীবনে—
হৃদ্যতায় বাঁধতে চাই না কাউকে ।

তবু কেনো স্নিগ্ধ বচনে চোখের পলক নেড়ে
আষ্টেপৃষ্ঠে
ভালোবাসা জানাও আমাকে?
কবিতা আমার
কবিতা আমার, প্রিয় কবিতা
ভোরের শিশিরের মিষ্টি সোহাগের মতো
অবিরত তার স্নিগ্ধরসে সতেজ হই—
ওকে নিয়ে জীবনের স্বপ্নজাল বুনি;
বুঝিনি কখন-সময়ের কোন ভাঁজে
ওর ভালোবাসার দুর্বোধ্য পথের
গুপ্ত চোরাবালিতে আটকে গেছি।

ইতোমধ্যে আমার কবিতার বাড়ন্তা সংসার
হয়েছে এলোমেলো—
অলস, অবিবেচকের দুষ্ট ইশারায়
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কবিতা আমার
সমাজ, সংসার থেকে।

এখন কবিতা আমার গুমোট মনোকষ্টে
ভেতরে-ভেতরে দগ্ধ হচ্ছে;
এখন কবিতা আমার স্পর্শকাতরতায়
ছটফট করছে;
এখন কবিতা আমার অসংগত বলাৎকারে
লজ্জিত, ঘৃণিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত
এখন কবিতা আমার সন্তান জন্ম দেবে বলে
প্রসববেদনায় কাতর
কিন্তু পারছে না নতুন কিছু জন্ম দিতে।

উশ্যেপ্র’র কবিতা

মাতৃভাষা

গ্রাম্য মেঠোপথে আমার চলাচল
জানি না আমার পরিচয়ের কথামালা
বেঁচে থাকায় কীসের অঙ্গীকার
সর্বদা টানাটানির জীবন যার!

একুশের রঙে মাতৃভাষাকে ভালোবাসার কথা
অথচ চমকে ওঠে হৃদয়-মন;
লুপ্তপ্রায় আমার মায়ের ভাষা—
সব কিছু ম্রিয়মাণ;

ক্ষুদ্র আমি অথচ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত
আমার ইতিকথা-
ভালোবাসি আমার মায়ের রূপকথা
পাহাড়ি ঝরনার পবিত্র জল, প্রেমময়
আদিবাসী মেয়ের ভালোবাসা।

স্বপ্নের প্রান্তরে
আজো আমি চেয়ে থাকি স্বপ্নের প্রান্তরে
চেতনায় নতুনের মুগ্ধতার গান গাই;
কঙরই পাখির সুরে নেচে ওঠে প্রাণ—
আমার অস্তিত্ব ফিরে পাবো একদিন।

জুমখেতে মুখরতা ছড়িয়ে পড়বে আবার
মুক্ত পাখি উড়বে পাহাড়ের ঢালুতে;
পাহাড়ি কিশোরী ছুটে যাবে ঝিরি-ঝরনায়
সজীবতা ফিরে আসবে নতুন করে।

জুমিয়া নারীর সন্তান বীজ বুনে বীরদর্পে
ফসল ফলাবে-
পাহাড়ের শান্তিময় পদধ্বনি আবার শুনতে পাবো
নবরঙে জীবন গড়ার প্রস্তুতিতে ।

সিদ্ধান্ত

না, আমি আর থাকবো না
দোষেভরা এদেশে
মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যাবো আমি
নিঃসঙ্গ এক সংজ্ঞাহীনতার দেশে।

আমাকে আর মায়ার বন্ধনে রেখো না
ভালোবাসার নামে
ছলনার আশ্রয় নিয়ো না
দুঃখকে সুখ বলে
অশান্তিকে শান্তি বলে
যুদ্ধ করো না আর
আমি আর থাকবো না—
যেখানে রক্তের খেলায় মেতে ওঠে মানুষ ।

নতুনময় চাকমা’র কবিতা
জীবনকে ভালোবেসে
তুমি পাহাড় দিয়েছো বলে
আমরা ভ্রাতৃত্ববন্ধনে মণ্ডিত;
উদার মনে জীবন গড়তে চলতে-ফিরতে শিখেছি ।

তুমি ঝরনা দিয়েছো বলে
আমরা সাহিত্য-গানে গুণান্বিত;
বলতে শিখেছি, কর্মী হতে শিখেছি
দুর্দিনে দুঃসময়ে অজানায় পথ খুঁজে
নিতে শিখেছি ।

তুমি আগুন দিয়েছো বলে
আমরা জ্বলছি আকাশে-বাতাসে
বাঁচতে শিখেছি-মরতে শিখেছি
অগ্নি-বারুদে জীবনকে বাজি রেখে—
স্রেফ জীবনকে ভালোবেসে।

নির্মল কান্তি চাকমার কবিতা

ভালোবাসা

সে খুব লাজুক সে খুব গম্ভীর
খুব হাসিখুশি
প্রথম যেদিন তাকে দেখলাম
সেই থেকেই ভালোবাসি।

সে ছিল অপরূপ, খুবই সুন্দরী
কাঙ্ক্ষিতা রমণী
তাকে না-দেখলে ঘুমাতে পারি না
একটিও রজনী।

সে অভিমানিনী, অহংকারিণী
দেখতে নমনীয়া
তাকে যেখানে দেখি
জুড়ায় আমার হিয়া যদি
কবি, তোমার কবিতায় কী আসে যায়?

যদি না-থাকে খেটে-খাওয়া মানুষের মুখে হাসি
যদি সন্তানের চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করতে হয়
যদি ভূমিহীনভাবে বেঁচে থাকতে হয়
অন্যের করুণার পাত্র হতে হয়
শিল্পী, তোমার ছবিতে কী আসে-যায়?

যদি না-মেলে দু’চোখে আমার স্বপ্ন
যদি না-মেটে ক্ষুধার্তের আহাজারি
যদি স্কুলপড়ুয়া শিশুকে জুমে যেতে হয়
যদি স্বপ্ন-ভবিষ্যৎ হারিয়ে যায়
শিল্পী, তোমার গানে কী আসে যায়?

যদি না-শোনো ছেলেহারা পিতামাতার অব্যক্ত গল্প
যদি না-শোনো শীতে কষ্ট-পাওয়া ভিখারীর কান্না
যদি একটি স্বপ্ন
একটি ভবিষ্যত
হারিয়ে যায়?

তোমাকে খুঁজি
তোমাকে খুঁজি আমি
পড়ন্ত বিকেলে যখন সূর্যটা বিদায় নেয়
আগামীদিনের সোনালি প্রত্যাশায়;
কর্ণফুলীর তীরে, সুবলঙ ঝরনায়
কিংবা গিরিশোভা রেস্তোরায় ।

তোমাকে খুঁজি আমি
আলোকিত জোছনায়
ঝরো-ঝরো বৃষ্টি দিনে
গ্রীষ্মের খরতাপে
রাঙামাটির বনরূপায়, পর্যটনের
ঝুলন্ত ব্রিজে
তোমাকে খুঁজি আমি
বিয়ের অনুষ্ঠানে, সুন্দর,
শাড়ির আঁচলে…

স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ
এখনো আমার চোখে ভাসে
বিস্তীর্ণ মাঠে স্বপ্নিল ফসলে ভরা
মাঝখানে নদীশোভিত ঘিলাতলী-
কর্মঠ নারীপুরুষ উন্নতির চেষ্টায় সাধনারত,

চোখে পবিত্রতার ছাপ অথচ
তাদের মনে, তাদের বুকে
কী যেন হাহাকার—কী যেন নেই অনুভূতি;
তবু আমি মোহিত
এমনই একটি জায়গা খুঁজেছি নিরন্তর
কিন্তু পেয়েও না-পাওয়ার মতো
দেখেও না-দেখার মতো
কারণ ওরা হাড়ভাঙা জীবন নিয়ে বেঁচে আছে।

কর্মধন তনচংগ্যার কবিতা

স্যারের কবিতা বাতাসে ওড়ে

একটা প্রকাশনা হবে— মোমের আলোর প্রকাশনা
রাত বারোটা পর্যন্ত লেখা পাঠানোর জন্য
পোস্টারিং করেছি অনেকে।

লেখা আসতে লাগলো ছোটবড় অনেক
প্রথম সৃষ্টির প্রকাশ।
একদিন স্যারকে বললাম, একটা
লেখা দিতে হবে;
ইদানীং লেখা কমিয়ে দিয়েছি
অনেক দিন লেখি না—কোথাও দেয়া হয় না-
তবে তোমাকে দেবো ।
অবশেষে স্যারের কবিতা বাতাসে উড়ে যায় ।

তিনটা জীবন
একটা জীবনের ভেতর আরও দুটো জীবন
গড়িয়ে-গড়িয়ে রাস্তা পার হয়-
সামনে বিশাল গর্ত—পেছনে কৃষ্ণগহ্বর,
মাঝখানে দুটো জীবন আমার অপেক্ষায়।

মোম জ্বালিয়ে গর্তের পূর্ণতার চেষ্টা করেছি
বৃষ্টির আলোয় কৃষ্ণের শূন্যতা পূর্ণতা পেয়েছে
উর্বর হয়নি।

নাসা বিজ্ঞানীর গবেষণা আর
আদালতে মামলার ফলে এ যাত্রায়
ভালোবাসার জীবন পেয়েছি
তারপরও লাভ হয়নি।

উপর-নিচ সমান্তরাল
পাহাড়ে উঠতে-উঠতে আমার বয়স
দ্বিগুণ বেড়ে যায়, কিন্তু
উঠতে যেয়ে যে-বয়স বেড়ে যায় অর্ধেক
ওঠা হয়ে গেলে নিচে তার
অর্ধেক রয়ে যায়;

ওপরে উঠবো নাকি নিচে নামবো?
ওপর-নিচ কষতে-কষতে
অর্ধেকেই থেমে যায় আমার সব কিছু!

সুগম চাকমা’র কবিতা

রাঙামাটি

রাঙামাটি—আমার প্রাণের মা
জন্ম দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে সে
বেড়ে ওঠার সাহস দিয়েছে, বুকের
রক্ত দিয়ে মানুষ করেছে সে ।

রাঙামাটি—আমার কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা-
সুখদুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকবার ঠিকানা;
রাঙামাটি আমার পাহাড় আঁকড়ে থাকার সাথি।

নতুন সূর্য আনে সে
সুখের দিন গাঁথে সে
নতুন গল্প লেখায় এ রাঙামাটি ।

আমার ইচ্ছে নেই

আমার ইচ্ছে নেই বর্ণিল শহরে মিশে যাওয়ার,
সাহেব হয়ে জীবন কাটানোর,
দশজনে বিশিষ্ট হওয়ার ।

আমার ইচ্ছে নেই—
দীর্ঘশ্বাসের ওপর দাঁড়ানোর
মানুষের পেটে লাথি মেরে পেট ভরানোর
তাদের মাঝে নেতা হওয়ার ।

আমার ইচ্ছে নেই—
এ পৃথিবী ছেড়ে স্বর্গে যাওয়ার
গিরিপথ ছেড়ে সমতল পথে হাঁটার
জুমচাষ ছেড়ে হালচাষ করার ।

আমার ইচ্ছে নেই-
জীবনের উপাখ্যান বদলে ফেলার
নতুন কোনো গল্প রচনার
নতুন কোনো কবিতা লেখা।

আলোড়ন খীসার কবিতা

কালের হাল ক্রান্তিকালে

মা ও মাটির সম্মতি পেলে
আদরাবিষ্ট আঁতুড়ালয়ে জড়াবো তোমার ঘাম,
ঘনরক্তের পুরাণাচারে উৎরাই
ভেঙে বের করবো
উত্তরাধুনিক পুঁজিপতিদের প্রতিভূ!

স্বপ্ন এবং তদ্বিষয়ক
ছায়াসংগীর কাঁধ ধরবো ঠেসে
লাল-হলুদ আগুন অসমতল—
স্পার্ক ছড়াবে দ্যুতিময়।

বিভীষিকার আত্মা বালতি-বালতি কান্না ঝরাবে।
চিকচিক পেসাবে নষ্ট করবে নীল ভেজানো পায়জামা ।
পোষমানা শ্বাপদেরা পালাচ্ছে, পালাবে
বিবিধ সন্ত্রাস অক্সিজেন হবে
আমি হাঁ-করে মুঠো-মুঠো অক্সিজেন খাবো
যেখানে শ্বাপদসংকুল নয়;
আত্মার চাষাবাদ হবে চেকপোস্টে ।

নারীকণ্ঠী ইন্দ্রিয়সমূহ
ব্যাঙের গরগরানো শুনে এবার বুঝতে পারি
বর্ষা বেশি দূরে নয়—
এই তো কয়েক ক্রোশ মাত্র;
আকাশে শর্টসার্কিট হলে
পঞ্চেন্দ্ৰিয় জানান দেবে
মেঘ প্রসব করবে পানি

পাখিদের অস্থির পরিবর্তিত ছায়া
আমার অবয়ব স্পর্শ করে চলে গেলে বুঝবো
নতুন আরেকটি দিনের শুরু।

উদর কিংবা নিম্নাঙ্গে
দীর্ঘস্থায়ী-ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি ফুঁড়ে উঠলে
কোনো খারাপ লাগা অস্থির মাত্রায় চাপলে বুঝবো
ভেতরে হয়তো-বা কিছু রসায়ন চলছে।

আমি বোবা, কালা, মূঢ়
অথবা তার চেয়ে বেশি কিছু;
পাঁচফুট বাই চারফুট ইটের শেলাইয়ের ভেতর
দিগন্ত পাথার খুঁজে আমি
স্বপ্নাবিষ্ট আবেগে মুদিত হই;

সংস্কৃতির অন্তর্চাপ কিংবা বহির্প্রেরণার ঢেউয়ের ধাক্কা
আমার বালিয়াড়ি থেকে দূরে
সহস্র কিলোমিটার
বিবিধ প্রক্রিয়ায় ক্ষান্ত হয়
চেতনা ও মুক্তি নামক অদ্যুৎ শব্দ দুটি
ওলফস্টোনক্র্যাফট-ক্লারা-সিমোনরা
মিথ হয়ে
পড়ে থাকে চেতনায়, মৃত!

অংশৈসিং মংরে’র কবিতা

বলো, ভালোবাসার কী স্বাদ পাও তুমি
জানি মাংসে পচনধরা ফসিল তোমার কাছে মূল্যহীন
শিল্পীর তীক্ষ্ণ অনুভূতিতে তুলে ধরা
শৈল্পিক রূপ, দেহ নিয়ে তুমি আত্মমগ্ন
তুমি রূপ বোঝো,
শিল্প বোঝো না।

শিল্পের মর্ম তোমার কাছে অর্থহীন, অপাঙক্তেয়।
মিনতি করি ভালোবাসা আর শিল্পকে
এক করে দেখো না-
ভালোবাসতে শেখো, শিল্পকে শ্রদ্ধা করো
ভালোবাসার প্রলেপ মেখে শিল্পকে
বাঁচিয়ে রেখো অনন্তকাল…

মংশৈচিং চাক-এর কবিতা

ইচ্ছে

ইচ্ছে করেছিলাম তোমাকে আমি
হৃদয়ে সাজিয়ে রাখবো সারাটা জীবন;
হঠাৎ চলে গেলে তুমি
হৃদয়ের ফুলদানিটা শূন্য করে।
আজ আমি হয়ে গেছি সাহারা মরুভূমি।

তুমি বেছে নিয়েছ একটা সুন্দর সিঁড়ি
তোমার নাম ধরে যদি
দীর্ঘতম চিৎকারে ভুবন কাঁপিয়ে তুলি
আসবে না প্রতিধ্বনি আমার কানে।

আজ আমি বুঝেও বুঝি না
চিনেও চিনি না কিছু।

বেছে নিলাম যন্ত্রণাময় ক্রন্দন
আর কাঁচা হাতের এই
কবিতা আমার!

সজীব চাকমা’র কবিতা

প্রজেকটের যুগ

আমরা আছি এখন প্রজেকটের যুগে
আমরা হাঁটছি এখন প্রজেকটের পথে
আমরা বিভোর এখন প্রজেকটের স্বপ্নে
আমরা কীভাবে পায়খানা করবো
আমরা কীভাবে গোসল করবো
আমরা কীভাবে পানি পান করবো
আমরা কীভাবে অর্থ উপার্জন করবো
ক্রমাগত সব যাচ্ছে তার হাতে।

সন্তান-সন্ততিদের কীভাবে কেমন শিক্ষা দেবো
কীভাবে জীবিকা অর্জন করবো
কীভাবে বৃক্ষরোপণ করবো
কীভাবে মৎস্য, পশু-পাখিদের রক্ষা করবো-
এসব কিছুই কেমনে, কীভাবে যে ভুলে গিয়েছিলুম
এসব কিছুই এখন তার বিবেচনাধীন,
তারই তত্ত্বাবধানে!

ইঁদুরবন্যা ঠেকাতে গেলে
দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করতে গেলে
তীব্র শীত থেকে বাঁচতে হলে
প্রখর খরা থেকে রেহাই পেতে হলে
বর্ষার প্রবল বন্যা রুখতে চাইলে
যেতে হবে তার দপ্তরে, তার ঘরে।

তুমি কি বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক-বিষু-বিহু উদযাপন করবে?
নৃত্যগীত করবে?
ঘিলে খেলা-নাদেংখেলা খেলবে
কবিতা, লেখালেখি ছাপবে
সব, সব কিছুই তার ওপর, তার কাঁধে।

সমাজে কে কবি হবেন, কে লেখক-কবি হবেন
সমাজে কে বুদ্ধিজীবী, নেতা; সমাজপতি হবেন
সমাজে কে স্বপ্নদ্রষ্টা, অগ্রপথিক হবেন
সমাজে কে বিচক্ষণ, কে অপদার্থ হবেন
সবকিছুই এখন তার বুদ্ধি-বিবেচনায়, তার কর্মযজ্ঞে।

তুমি আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চাও
মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাও
মিছিল-মিটিং-আন্দোলন চাও
সব, সবকিছুতেই সেই এখন সহায় হবে
আমরা কীভাবে ভালবাসবো
কে-কাকে ভালবাসবো, কীভাবে কেমন স্বপ্ন দেখবো
কীভাবে আমাদের জীবনকে সাজাবো
কী-কী আমরা অর্জন করবো
কী-কী আমরা হারাবো বা বর্জন করবো
কীভাবে, কী করবো
সব সবকিছুই তার ধাঁচে হবে এই পাহাড়ে
আমরা হাঁটছি এখন সেই প্রজেকটের যুগে।

লেখক: হাফিজ রশিদ খান
তথ্যসূত্র: আদিবাসী জীবন আদিবাসী সংস্কৃতি (২০০৯)

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *