বাংলাদেশে আদিবাসী, উপজাতি, নৃগোষ্ঠী প্রসঙ্গ

২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ১৪৪টি রাষ্ট্রের ভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ‘জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়। এতে মাত্র চারটি দেশ, যেমন- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র এর বিপক্ষে ভোট দেয়। অপরদিকে বাংলাদেশ, আজারবাইজান, ভুটান, বুরুন্ডি, কলম্বিয়া, জর্জিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, রাশিয়ান ফেডারেশন, সামোয়া ও ইউক্রেন-এই ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে। এটি ছিল বিশ্বের সংখ্যালঘু, নিপীড়িত ও বঞ্চিত আদিবাসী জাতিসমূহের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও তাৎপর্যময় একটি মুহূর্ত। এবার বোধ হয়, যুগ যুগ ধরে অবহেলিত ও ঔপনিবেশিক আধিপত্যের চরম শিকার এই মানুষগুলো দেশে দেশে তাদের মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ এক জীবন নিশ্চিত করতে পারবে।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হয়েছে, ঠিক তার উল্টোটি। বস্তুত জাতিসংঘে ‘আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হওয়ার পরপরই বাংলাদেশে একটি চরম সাম্প্রদায়িক এবং জুম্মসহ দেশের আদিবাসীদের অধিকার বিরোধী একটি গোষ্ঠী এর বিরুদ্ধাচরণ, এমনকি ষড়যন্ত্র শুরু করে। একসময় প্রধানমন্ত্রীও বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতৃবৃন্দ এদেশের আদিবাসীদের সাথে আদিবাসী দিবসের নানা অনুষ্ঠানে সামিল হয়েছেন। আদিবাসীদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। আদিবাসী দিবসে শুভেচ্ছা বাণী দিয়েছেন।

অথচ এখন সরকার ও সেই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটি একাকার হয়ে বলছেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। বাংলাদেশের উপজাতিরা আদিবাসী নয়, বাঙালিরাই প্রকৃত আদিবাসী, ইত্যাদি উদ্ভত কথা। এমনকি সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের বাক স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের অধিকারকেও হরণ করার চেষ্টা করছে। তারা জোর করে বিভিন্ন অফিস-আদালতে, গণমাধ্যমে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করতে নিষেধ করছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ইংরেজি ‘দৈনিক ডেইলি স্টার’এর সাংবাদিক ও বান্দরবান জেলার প্রতিনিধি সঞ্জয় কুমার বড়ুয়ার বিরুদ্ধে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারের জন্য বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি থেকে তিন সেটেলার বাঙালি আলাদাভাবে মামলা দায়ের করেছে।

গত ৯ আগস্ট ২০২০, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২০ উপলক্ষে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাইয়ের ওয়াগ্গাতে এলাকার শ’খানেক ছাত্র-ছাত্রী ও মুরুব্বিরা মিলে এক মানববন্ধন আয়োজন করে। মানববন্ধন চলাকালীন সময়ে সেখানে এসে বাধা দেয় সেনা, পুলিশ, বিজিবি ও গোয়েন্দা বাহিনীর একদল সদস্য। শুধু তাই নয়, তারা অনেক অযৌক্তিক কথাবার্তা যেমন বলেন, তেমনি দুর্ব্যবহারও করেন অংশগ্রহণকারীদের সাথে।

এসময় সেনা, পুলিশ, বিজিবি ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা বলতে থাকেন, ‘দেশে আদিবাসী বলতে কোন শব্দ নাই, যা আছে তারা সবাই উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। সুতরাং তোমরা আদিবাসী দাবি করে অসাংবিধানিক কাজ করতে পারো না। আদিবাসী বলা যাবে না, আদিবাসী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারবে না। দেশদ্রোহী কাজ করতে পারবে না।’ তারা হুমকি দিয়ে আরও বলেন, ‘যে বা যারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চাইবে তারা যেন গ্রেফতার, জেল-মামলার জন্য প্রস্তুত থাকে।’ তবে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ‘মতামত প্রকাশ ও সভা-সমাবেশ করা তো সাংবিধানিক অধিকার, সংবিধানে তো লেখা নেই যে আদিবাসী বলা যাবে না’ ইত্যাদি বললে, বাধাদানকারীরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান সত্যি দুঃখজনক। পৃথিবীতে কোথাও দেখা যায় না যে, সরকার বা সরকারী কোন সংস্থা এই আদিবাসী বা ইন্ডিজেনাস শব্দ ব্যবহারে কোন বাধা সৃষ্টি করছে এবং এজন্য বলপ্রয়োগ করছে। প্রতিবেশী ভারতে বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীদের মধ্যেও আদিবাসীসহ বিভিন্ন নামে ডাকা হলেও এক্ষেত্রে সরকারী কোনো নিষেধাজ্ঞার কথা জানা যায় না।

জাতিসংঘ সূত্রে জানা যায়, শুরুতে যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, তারাও ইতোমধ্যে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। সেসব দেশগুলিও এখন আদিবাসী ঘোষণাপত্রটি সমর্থন করছে। তাছাড়াও, এমনিতে এসব দেশে বসবাসকারী আদিবাসীরা বাংলাদেশের আদিবাসীদের থেকে অনেক অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করে থাকে।

‘আদিবাসী কারা’ প্রসঙ্গ

বস্তুতঃ বাংলাদেশে ‘ইন্ডিজেনাস’ বা ‘আদিবাসী’ কারা তা একটি অমীমাংসিত বিষয়। কিন্তু তারপরও সরকার ও বাঙালি জাত্যাভিমানী-সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন একটি গোষ্ঠী জেনেও না জানার ভান করে আদিবাসী নিয়ে বিতর্কের অবতাড়না করছে। বিষয়টিকে জটিল রূপ দিয়েছে। ‘আদিবাসী’ বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল বা বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সরকার আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করতে চাইছে অথবা তার দায়দায়িত্ব থেকে সরে যেতে চাইছে। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ এবং গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক শক্তি বলে দাবীদার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত সংকীর্ণতার পরিচয় দিচ্ছে।

বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের আদিবাসীরা হুট করে নিজেরাই নিজেদেরকে ‘আদিবাসী’ বলে দাবী করে বসেনি। জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৯৩ সালকে ‘বিশ্বের আদিবাসী জনগণের আন্তর্জাতিক বর্ষ’, ৯ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ এবং ১৯৯৫ সাল হতে ২০০৪ সাল সময়কে ‘বিশ্বের আদিবাসী জনগণের প্রথম আন্তর্জাতিক দশক’ হিসেবে ঘোষণার পর থেকে বিশ্বের ও দেশের অপরাপর আদিবাসীদের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগণও এ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে আসছে। সেই থেকেই এই পরিচয়টি আরও অধিকতর সামনে এসেছে।

বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদেরকে অনেক আগেই ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, উক্ত শাসনবিধির তফসিলে উল্লেখিত বিভিন্ন আইনসমূহের মধ্যে দি ইন্ডিয়ান ইনকাম ট্যাক্স এ্যাক্ট ১৯২২, দি ইন্ডিয়ান ফিনান্স এ্যাক্ট ১৯৪১, দ্য ফরেস্ট এ্যাক্ট ১৯৭২ প্রভৃতির ক্ষেত্রেও ‘আদিবাসী পাহাড়ী’ (indigenous hillmen) শব্দটি উল্লেখ করা হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে, এমনকি সাম্প্রতিক কালেও সরকারের পক্ষ থেকে এবং সরকারী বিভিন্ন দলিলে বাঙালী জনগোষ্ঠী ব্যতীত বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যান্য ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ বলে অভিহিত করা হয়ে আসছিল। বর্তমান সরকারী দল আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও ‘আদিবাসী’ আখ্যাটি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রগতিশীল সাহিত্যিক প্রয়াত আহমদ ছফা ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তার জীবনের প্রথম প্রবন্ধ ‘কর্ণফুলীর ধারে’তে পাহাড়ী মানুষদের ‘আদিবাসী’ হিসেবেই অভিহিত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, এযাবৎ মূলধারার বাঙালি সুধীজন, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ প্রায় সকলেই নির্দ্বিধায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষকে আদিবাসী হিসেবেই অভিহিত করে আসছেন।

২০১১ সালের মে মাসে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের দশম অধিবেশনে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি মোঃ ইকবাল আহমেদ মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশে কোন আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই।’ গত ২৬ জুলাই ২০১১ বিভিন্ন দেশের কুটনীতিক, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে এক ব্রিফিং অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি নাটকীয়ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অধিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে বিবেচনা না করতে এবং তার পরিবর্তে ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী’, ‘ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী’, ‘Ethnic Minority’  হিসেবে অভিহিত করার আহ্বান জানান। দীপু মনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় কোন আদিবাসী নেই। ঐ এলাকার অধিবাসীরা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী।’ জানা যায়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রাক্কালে বাংলাদেশের আদিবাসীদের যাতে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া না হয় তার জন্য সরকারী একটি বিশেষ মহল অত্যন্ত তৎপর ছিল।

বস্তুত সরকার এদেশের সংখ্যালঘু জাতিগুলো ‘আদিবাসী’ নয় এই দাবির পেছনে প্রধানত দু’টি যুক্তি উপস্থাপন করছে। প্রথমত, তারা এ অঞ্চলের আদিম বাসিন্দা নয়। তারা সবাই বাংলাদেশের ভূখন্ডের বাইরে থেকে এসেছে। বাঙালিরাই এদেশের প্রকৃত আদিবাসী। দ্বিতীয় যুক্তিটি হচ্ছে, এ জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়, ভাবমূর্তি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকী সৃষ্টি করবে। প্রকৃত প্রস্তাবে উভয় যুক্তিই খোঁড়া এবং ভিত্তিহীন। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের আদিবাসী জাতির বসবাস রয়েছে। সে সমস্ত দেশের আদিবাসীদের ভূমি ও সম্পদের অধিকারসহ অনেক অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। সেই দেশের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়, ভাবমূর্তি ও সার্বভৌমত্বের জন্য কোন প্রকার হুমকি সৃষ্টি হয়েছে বলে তো নজির নেই। বস্তুত এদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দানের ক্ষেত্রে ‘জাতীয় পরিচয়, ভাবমূর্তি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকী সৃষ্টি’র অজুহাতটি সেই পুরানো অপকৌশলেরই অংশ বৈ কিছু নয়।

অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মরা এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নয়, তারা ছিল অভিবাসী-এই যুক্তিতে জুম্মদেরকে বা অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসমূহকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অস্বীকৃতি জানানো হচ্ছে। সরকার মূলত আন্তর্জাতিক দলিলে গৃহীত ‘ইন্ডিজেনাস’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘আদিবাসী’ শব্দকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেবল ‘আদিম বাসিন্দা’ বা ‘প্রাচীন অধিবাসী’ এই ধারণার সাথে গুলিয়ে ফেলছে বা অপব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। বস্তুত ‘আদি বাসিন্দা’ এই ধারণার সাথে ‘ইন্ডিজেনাস’ বা ‘আদিবাসী’ পরিচয় বা সংজ্ঞার মধ্যে মুখ্যত কোন সম্পর্ক নেই।

প্রসঙ্গক্রমে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বর্তমান ‘ইন্ডিজেনাস’ বা ‘আদিবাসী’ এর সংজ্ঞা স্মরণ করা যাক। এখানে জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোটিয়র জোসে মার্টিনেজ কোবো’র ১৯৮৪ সালে প্রদত্ত সংজ্ঞাটি যা জাতিসংঘ ‘ওয়ার্কিং ডেফিনিশন’ হিসেবে গ্রহণ করেছে তা উল্লেখ করা যাক। এতে বলা হয়েছে যে- ‘আদিবাসী সম্প্রদায়, জনগোষ্ঠী ও জাতি বলতে তাদেরকে বুঝায় যাদের ভূখন্ডে প্রাক-আগ্রাসন এবং প্রাক-উপনিবেশিক কাল থেকে বিকশিত সামাজিক ধারাসহ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে যারা নিজেদেরকে উক্ত ভূখন্ডে বা ভূখন্ডের কিয়দংশে বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক জনগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র মনে করে। বর্তমানে তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীভুক্ত এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইনী ব্যবস্থার ভিত্তিতে জাতি হিসেবে তাদের ধারাবাহিক বিদ্যমানতার আলোকে তারা তাদের পূর্ব-পুরুষদের ভূখন্ড ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ভবিষ্যত বংশদরদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। মোট কথা আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী বলতে তাদেরকে বুঝায় যারা বহিরাগত কর্তৃক দখল বা বসতিস্থাপনের পূর্ব থেকে নির্দিষ্ট ভূখন্ডের মূল অধিবাসীর বংশধর।’

অপরদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কনভেনশন নং ১৬৯ এর সংজ্ঞা অনুয়ায়ী- ‘স্বাধীন দেশসমূহের জাতিসমূহ- যারা এই মর্মে আদিবাসী হিসেবে পরিগণিত যে, তারা ঐ দেশটিতে কিংবা দেশটি যে ভৌগলিক ভূখন্ডে অবস্থিত সেখানে রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্থাপন কিংবা বর্তমান রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্ধারণ কাল থেকে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর বংশধর, যারা তাদের আইনগত মর্যাদা নির্বিশেষে নিজেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অংশবিশেষ বা সম্পূর্ণ লালন করে চলেছে।’

বলাবাহুল্য, উক্ত সংজ্ঞায় কোথাও আদিবাসী হওয়ার জন্য আদিম বাসিন্দা হওয়ার শর্ত নেই। আর প্রাক-আগ্রাসন ও প্রাক-উপনিবেশিক কাল থেকে এবং উপনিবেশ স্থাপন কিংবা বর্তমান রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্ধারণেরও বহু কাল আগে থেকে যে জুম্মরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে আসছে তাতো দিবালোকের মত সত্য। আর জুম্মরাই যে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত প্রাচীন স্থায়ী অধিবাসী- ইতিহাসও তারই স্বাক্ষ্য দেয়। যাই হোক, আদিবাসী বলতে বস্তুত দেশে দেশে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অধিকারী সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীগুলোকেই তুলে ধরা হয়েছে। আর এটা কোন জাতিগত পরিচয়ও নয়। এই অভিধার মধ্য দিয়ে মূলত এ সমস্ত জাতিগোষ্ঠীগুলোর সংকটময় প্রান্তিক অবস্থাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। আর ‘ইন্ডিজেনাস’ ও ‘ট্রাইবাল’- উভয়ই সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেই তুলে ধরে।

আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে ট্রাইব ও আদিবাসীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কনভেনশনে ট্রাইবাল ও ইন্ডিজেনাস শব্দ দুটি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হলেও বস্তুত দুটিকেই এক করে দেখানো হয়েছে এবং মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখানো হয়নি। তার অর্থ হল, আদিবাসী হলে যে অধিকার ভোগ করতে পারবে, ট্রাইব বা ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীও একই অধিকার ভোগ করবে। সুতরাং এদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ স্বীকার না করে যদি ট্রাইব (সরকারী ভাষ্যে উপজাতি) হিসেবেও স্বীকার করা হয়, তাহলেও সরকার আদিবাসী ঘোষণাপত্রে ঘোষিত অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট যেকোনো অধিকার থেকে এদেশের জুম্মদের ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগুলিকে বঞ্চিত করতে পারে না। অথচ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মসহ এদেশের আদিবাসীদের সাথে রাতদিন তাই করে যাচ্ছে।

বস্তুত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই উগ্রজাত্যভিমানী একটি গোষ্ঠী এইসব আদিবাসীদের হয় ‘বাঙালি’, নয় ‘উপজাতি’ পরিচিতি চাপিয়ে দিতে তোরজোর চালিয়ে আসছে। যার কোন ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। চরম আধিপত্যবাদী মানসিকতা ও ঐতিহাসিক হীনমন্যতার কারণেই এমন করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান।

আশির দশকের মাঝামাঝি, যিনি জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোটিয়র হিসেবে ব্যাপক গবেষণা করেছিলেন, যার গবেষণাকে আজ ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, সেই মার্টিনেজ কোবোও পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃতাত্ত্বিকভাবে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলেই স্বীকার করেছেন। তাঁর গবেষণাপত্রে তিনি উল্লেখ করেন- ‘In Bangladesh, the government state that the members of tribal or semi-tribal populations are regarded as indigenous ‘on account of their descent from the populations which are settled in specified geographical areas of the country.’

‘উপজাতি’ শব্দটি পরিত্যাজ্য

১৯ এপ্রিল ২০০৬ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক চিঠিতে ‘আদিবাসী’ শব্দের পরিবর্তে ‘উপজাতি’ শব্দটি লেখার নির্দেশ দেয়। বলাবাহুল্য, এটা একতরফা সিদ্ধান্ত এবং অগণতান্ত্রিক। যাদের কাছ থেকে ‘আদিবাসী’ পরিচয় তুলে নেয়া হবে এবং যাদেরকে ‘উপজাতি’ পরিচয় দেয়া হবে, সেই জাতির মানুষদের মতামতের তোয়াক্কা করা হয়নি।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করার আগে সরকারের সাথে সংলাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ চুক্তি থেকে উপজাতি শব্দটি বাদ দিয়ে ‘জুম্ম’ শব্দটি প্রতিস্থাপিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের প্রবল বিরোধীতা, বিশেষ করে, চুক্তির অন্যান্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ও সামগ্রিক স্বার্থে তারা আপাতত এই বিষয়টি ছাড় দেন। যদিও জনসংহতি সমিতি তার বক্তব্য, সাহিত্য ও দলিলে বহু আগে থেকেই ‘উপজাতি’ শব্দটি পরিহার বা নিরুৎসাহিত করে এসেছে।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ‘উপজাতি’ শব্দটি ঠিক কখন থেকে প্রচলিত তা জানা নেই। তবে মূলত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সরকারী ও প্রশাসনিক দলিল-দস্তাবেজে, কাগজপত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষণীয়। আর সরকার ও প্রশাসনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত লেখক ও ব্যক্তিরাও এটা ব্যবহার করেন।

শুরুতে কোন কোন আদিবাসী বা জুম্ম লেখক ও নেতৃবৃন্দও অনায়াসে এটি ব্যবহার করেন। ধারণা করা যায়, প্রথমত, সরল বিশ্বাসে, দ্বিতীয়ত, হালকা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এবং তৃতীয়ত, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সরকারী বাধ্যবাধকতার কারণে। তবে তারও বহু আগে থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম ও সমতলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে ‘জাতি’, ‘জাতিসত্তা’, ‘আদিবাসী’ ইত্যাদি শব্দগুলি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর এই আদিবাসীরাও নিজেদেরকে সবসময় এক একটি স্বতন্ত্র জাতি বা জাতিসত্তা বা আদিবাসী হিসেবে জেনে এসেছে।

ধারণা করা যায়, বাংলায় ‘উপজাতি’ শব্দটির ব্যবহার খুব বেশি দিনের নয়। শুরুতে বাংলা ভাষায়ও এই ‘উপজাতি’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয় ইংরেজি ‘ট্রাইব (tribe)’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে এবং বিশেষত নৃতাত্ত্বিক অভিধা হিসেবে। ফলে, সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই সময় এই শব্দটি তত ক্ষতিকর বা বিতর্কিত ছিল না।

কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এবং ধীরে ধীরে শাসকগোষ্ঠী এবং উগ্রজাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে এই ‘উপজাতি’ শব্দটি আরও ভিন্ন ব্যঞ্জনা ও নেতিবাচক উদ্দেশ্য নিয়ে উপস্থাপিত হতে থাকে। বিশেষ করে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন নিজেই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের ‘বাঙালি’ বলে আখ্যায়িত করেন, তখন এই শব্দটি মৌলিকভাবে ভিন্ন মাত্রা পেতে শুরু করে। আর পরে যখন সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে পদদলিত করে বাংলাদেশের নাগরিকদের কেবল ‘বাঙালি’ এবং রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ করা হয়, তখন এই শব্দটি কার্যত আদিবাসীদের উপর ইসলামী সম্প্রসারণবাদী আধিপত্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও ঔপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দেওয়ার অন্যতম এক হাতিয়ারে পরিণত হয়।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নদীগুলির জলধারা বঙ্গোপসাগরে অনেক গড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে ও বাঙালি সমাজে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী, ইসলামী সম্প্রসারণবাদী ও ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনা অনেক বিস্তারিত হয়েছে। তাই তারা এখন ‘উপজাতি’ বলতে বোঝেন বাঙালি জাতির ‘উপ’ বা ‘অংশ’ বা ‘শাখা’, যে উপজাতিরা বাঙালিতে পরিণত করার বা হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। বস্তুত এই মানসিকতা বা চিন্তাধারা হচ্ছে, সংখ্যালঘু আদিবাসী জাতিগুলিকে ধ্বংস করে তাদের বাঙালিতে পরিণত করা, যা চরম হিংসাত্মক বলে বিবেচনা করা যায়। সেকারণে তারা নির্দ্বিধায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ‘উপজাতি’, ‘জনাব’, ‘বেগম’ ইত্যাদি শব্দ চাপিয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করেন না।

উপজাতি শব্দটি কি সঠিক?

বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘উপজাতি’ শব্দটির অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে- ‘কোন অঞ্চলের প্রধান জাতির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্রতর জাতি।’ এই অভিধান যাঁরা রচনা করেন, তাঁদের শিক্ষা ও পান্ডিত্য নিয়ে, আমার মত সাধারণ এক আদিবাসী মানুষের প্রশ্ন তোলার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু তাঁরা কী মানসিকতা, বিচার ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এটির সংজ্ঞা দিয়েছেন, তার প্রশ্ন তোলা যায়। কেননা, কোন বিচারেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মসহ দেশের আদিবাসীদের প্রধান জাতি বলে দাবিদার বাঙালির অন্তর্ভুক্ত কোন ক্ষুদ্র জাতি বলে বিবেচনা করা যায় না। তবু কেন বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ না বলে ‘উপজাতি’ বলা হয়ে থাকে?

উপজাতি বলতে যদি বোঝায় ‘কোন অঞ্চলের প্রধান জাতির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্রতর জাতি’ তাহলে পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জাতি ও সমতলের অন্যান্য আদিবাসী জাতিসমূহ কোন প্রধান জাতির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্রতর জাতি? বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে জনমিতিগত ও রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে বাঙালিরাই প্রধান জাতি। কিন্তু আদিবাসী হিসেবে পরিচিত (সরকার যাদের উপজাতি বলে) সেই জাতি বা জনগোষ্ঠীসমূহ কি বাঙালি জাতির অন্তর্ভুক্ত? কোনো নাবালক শিশুও তো তা কোনোদিন স্বীকার করবে না!

এছাড়া বাংলা একাডেমির বাংলা-ইংলিশ অভিধানে ‘উপজাতি’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ দেয়া হয়েছে- subclass, aboriginal tribe ইত্যাদি। অপরদিকে subclass-এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘উপশ্রেণি’। অর্থাৎ প্রধান বা মূল জাতি বা শ্রেণি বা শাখা থেকে উদ্ভুত যা তাই উপজাতি বা উপশ্রেণি বা উপশাখা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মরা ও সমতলের অন্যান্য ভিন্ন জাতিসমূহ কি প্রধান বা মূল বাঙালি জাতি বা শ্রেণি বা শাখা থেকে উদ্ভুত কোন জাতি বা জনগোষ্ঠী?!

বলাবাহুল্য, এসব জাতি বা জনগোষ্ঠীসমূহ নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি জাতি থেকে সম্পূর্ণ ও মৌলিকভাবে স্বতন্ত্র এবং স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ। কাজেই সেই অর্থে তারা কোনোভাবে বাঙালি জাতির, এমনকি পরস্পরের সাপেক্ষেও তারা কোনো জাতির উপজাতি নয়। বরং তারা একেকটি স্বতন্ত্র সংখ্যালঘু জাতি বা জনগোষ্ঠী বা জাতিসত্তা বলে বিবেচনা করা যায়।

বলাবাহুল্য, বাংলা একাডেমির ‘বাংলা অভিধান’ এবং ‘ইংলিশ-বেঙ্গলি অভিধান’ কোনটাতেই যথাযথ ও সুস্পষ্টভাবে ‘ট্রাইব’ বা ‘উপজাতি’ শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে মনে করা যায় না। মূল ‘ট্রাইব’ শব্দের যে অর্থ, সেই অর্থ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা বা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ‘ট্রাইব’এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘উপজাতি’ শব্দটি অনেকটা জোর করে বা দায়িত্ববোধহীনভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদী চিন্তাধারা কাজ করেছে বলেও ধরে নেয়া যেতে পারে।

অপরদিকে, ‘উপজাতি’ শব্দের উৎপত্তি বা ইংরেজি প্রতিশব্দ হিসেবে যদি ‘ট্রাইব’ এর মূল অর্থ ও ব্যাখ্যা খুঁজি, তাহলে সেক্ষেত্রে দেখব যে, ‘ট্রাইব’ এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘উপজাতি’ শব্দটি যথাযথ হয়েছে বলে মনে করা যায় না। Longman Advanced American Dictionary-তে tribe-এর অর্থ নির্দেশ করা হয়েছে- ‍‍“a social group consisting of related families who have the same beliefs, customs, language, etc, and who usually live in one particular area ruled by their leader.” আর Cambridge Dictionary-তে tribe-এর অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে- “a group of people, often of related families, who live together, sharing the same language, culture, and history, especially those who do not live in towns or cities.” উভয় সংজ্ঞার আলোকে বলা যায়, ‘ট্রাইব’ হচ্ছে এমন একটি জনগোষ্ঠী বা সামাজিক গোষ্ঠী যারা পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গঠিত, যাদের রয়েছে একই ভাষা, বিশ্বাস, প্রথা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ইত্যাদি এবং যারা সাধারণত একটা নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করে, শহরে বা নগরে থাকে না, যারা তাদের নেতা দ্বারা শাসিত হয়।

অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’র তথ্য অনুযায়ী, ‘ট্রাইব’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রীক নগর-রাষ্ট্র এবং রোমান সাম্রাজ্য গঠনের প্রথম পর্যায়ের সময়ে। এটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘ট্রাইবুস/ট্রাইবাস (tribus)’ শব্দ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে, ‘একটি জনগোষ্ঠী যারা একটি সমাজ গড়ে তুলছে এবং একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ/পূর্বপ্রজন্ম থেকে উদ্ভুত হয়েছে বলে দাবি করছে।’

উক্ত তথ্য ও সংজ্ঞা থেকেও স্পষ্ট হয় যে, ‘উপজাতি’ শব্দটি এর মূল প্রতিশব্দ ‘ট্রাইব’ থেকেও সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে। ট্রাইব এর ইংরেজি প্রতিশব্দ দেয়া হয় ‘রেস’, ‘এথনিক গ্রুপ’ ইত্যাদি। বাংলা একাডেমির ইংলিশ-বাংলা অভিধানে ‘রেস’ এর অর্থ প্রধানত ‘মানবপ্রজাতি’, ‘নরগোষ্ঠী’, ‘জাতিগোষ্ঠী’, ‘বংশ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বলাবাহুল্য, ‘উপজাতি’র তুলনায় ‘ট্রাইব’ শব্দটি আদিবাসী বা ভিন্ন জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনেক সামঞ্জসপূর্ণ বলে প্রতীয়মান। কিন্তু সরকার ও জাত্যভিমানীদের কাছে, ‘উপজাতি’ শব্দটিই অধিক পছন্দের। এটা যতটা না নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, তার চেয়ে বেশী এদেশের স্বতন্ত্র সংস্কৃতির অধিকারী জাতিসমূহকে ‘হেয় প্রতিপন্ন করা’, ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক জ্ঞান করা’র দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিককালে অনেক আধুনিক নৃতত্ত্ববিদ ‘ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণা থেকে উদ্ভুত’ বিবেচনায় এই ‘ট্রাইব’ শব্দটিকেও প্রত্যাখান করেছেন।

‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ও নয়

সরকার ১২ এপ্রিল ২০১০ ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন’ জাতীয় সংসদে পাশ করে। অভিযোগ আছে, এই আইন তৈরি ও প্রণয়ন করার সময় সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও আদিবাসী নেতাদের কাছ থেকে কোন মতামত নেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকজন নৃবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞের সাথে এ বিষয়ে কথা বলা হলেও, সরকার শেষ পর্যন্ত এককভাবেই ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটি গ্রহণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতামত থাকে উপেক্ষিত।

ট্রাইবের কাছাকাছি শব্দ ‘জাতিগোষ্ঠী, জনগোষ্ঠী, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, জাতিসত্তা, সংখ্যালঘু জাতি, জাতি ইত্যাদি হলেও ‘ক্ষুদ্র জাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’সমূহ এ প্রসঙ্গে যথাযথ বলা যায় না। কারণ, আমার উপলব্ধিমতে ‘ক্ষুদ্র’ শব্দটি একটি ভৌত আকার বা আকৃতি নির্দেশক। কোন জড়বস্তু বা ইতর প্রাণির ক্ষেত্রে তা ব্যবহার্য হলেও, মানুষ বা মানবজাতির ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ অযথাযথ শুধু নয়, অমর্যাদাকরও বটে। অন্তত বাংলা শব্দের ক্ষেত্রে। কেননা, প্রায়োগিক ক্ষেত্রেও আমরা যদি দেখি, কাউকে যখন ‘ক্ষুদ্র বা ছোট’ মানুষ বলা হয় তখন একটা হেয় করে দেখার অবকাশ থাকে। অপরদিকে ‘বড় বা বৃহৎ’ এর সাথে যদি লোক, মানুষ বা জাতিকে জুড়িয়ে দেয়া হয়, সেক্ষেত্রে বড় করে দেখার বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির অবকাশ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া, মানুষকে কখনো তার আকার বা আকৃতি দিয়ে ছোট বা বড় বিবেচনা করা যায় না। মানুষ তার কর্ম, গুণাবলী, জ্ঞানের মাধ্যমেই বড় বলে বিবেচিত হয়। কাজেই মানুষ বা জাতির ক্ষেত্রে এই ‘ক্ষুদ্র বা বৃহৎ’ শব্দদ্বয় বরং বৈষম্যমূলক। তাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বৃহৎ নৃগোষ্ঠী এই পদগুলিও পরিহার্য। সেক্ষেত্রে ‘সংখ্যাগুরু জাতি বা সংখ্যালঘু জাতি’ অধিকতর উপযুক্ত বলে প্রতীয়মান।

শেষ কথা

বস্তুত ‘উপজাতি’ শব্দটি বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত। এমনকি অমর্যাদাকরও। সুতরাং এই শব্দটি পরিত্যাজ্য এবং সংশোধনযোগ্য। ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ পরিচিতিটাও তথৈবচ।

আমি জানি না, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মরাসহ দেশের আদিবাসীদেরকে ‘আদিবাসী’ বললে দেশের বা সরকারের বা যারা বিরোধীতা করছেন তাদের সমস্যাটা কোথায়? আদিবাসী ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আদিবাসীদের সেই অধিকার নিশ্চিত হলে তাদের সমস্যা কোথায়? সেখানে তো কারো অধিকার খর্ব করার কথা বলা হয়নি। আর জুম্মদের ‘জুম্ম’, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, গারো, সাঁওতাল ইত্যাদিকে স্ব স্ব জাতির নামে ডাকলে বা সংখ্যালঘু জাতি ইত্যাদি অভিহিত করলে সরকার ও রাষ্ট্রের অসুবিধেটা কোথায়।

মূলত এক জাতি ‘বাঙালি’ এবং এক ধর্ম ‘ইসলাম’এর দেশ বাংলাদেশ- এই চরম আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী মানসিকতার কারণেই এদেশের ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন সংস্কৃতির আদিবাসীদের ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ ইত্যাদি অগুরুত্বপূর্ণ ও অবজ্ঞাপূর্ণ পরিচিতি চাপিয়ে দেয়া হয়। অপরদিকে আদিবাসীদের নিজেদের আত্মপরিচয়ের অধিকার ও ‘আদিবাসী’ পরিচিতিকে অস্বীকার করা হয়। এইভাবে চলতে থাকলে এই দেশটি একদিন বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য হারাতে বাধ্য।

লেখক: সজীব চাকমা, তথ্য ও প্রচার সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

তথ্যসূত্র: নিধুকটুক-২০২২, বনযোগীছড়া কিশোর কিশোরী কল্যাণ সমিতি

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *