বুদ্ধ ধর্ম ও কৃষ্টি সংরক্ষণে চাকমা রাজন্য বর্গের অবদান

সুপ্রাচীন কাল থেকে চাকমা রাজন্য বর্গ বৌদ্ধধর্ম বিকাশের জন্য তাঁরা বহু দান ও জনহিতকর কাজ করেছেন আলোচ্য লেখাটিতে ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে এযাবত কাল পর্যন্ত তাঁদের অবদান সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করা হলো। [ বুদ্ধ ধর্ম ও কৃষ্টি ]

চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁন (১৮১২-১৮৩২) মৃত্যুরপর রাণী কালিন্দী (১৮৪৪-১৮৭৩) চাকমা রাজ্য শাসনের অধিকারী নিযুক্ত হন। তিনি রাঙ্গুনিয়া রাজ প্রসাদে ২২শে সেপ্টেম্বর ১৮৭৩ সালে পরলোক গমন করেন। রাণীর মৃত্যুর পর হরিশ চন্দ্র রায় ১৮৭৪ সালে চাকমা রাজগদিতে অধিষ্টিত হন। ইংরেজ উপনিবেশিক সরকার তাকে রায় বাহাদুর এবং রাজা উপাধি প্রদান করেন। রাজা হরিশ চন্দ্র বেশী দিন রাজত্ব করতে পারেননি, তিনি ১৮৮৩ সালে রাঙ্গামাটি রাজ-বাড়ীতে পরলোক গমন করেন তখন তার জ্যোষ্ঠ পুত্র উত্তরাধিকারি ভূবন মোহন রায় ৭ বছরের বয়সী নাবালক মাত্র।

চাকমা রাজা হরিশ চন্দ্র রায় বাহাদুর চাকমা রাজ বিহার রাঙ্গামাটিতে ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। রাঙ্গামাটি শহরের নিকটে কর্ণফুলী নদীর পূর্ববতীরে রাঙ্গামাটি রাজবাড়ি ও রাজবিহার অবস্থান ছিল ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। ১৭৯৮ সালে আমরা প্রথম রাঙ্গামাটি রাজবাড়ির উল্লেখ পাই। Francis Buchanan in Southeast Bengal (1798) তার লিখিত বইতে রাঙ্গামাটি চাকমা রাজবাড়ীর বর্নণা করেন।

তার বর্ণনায় উল্লেখ করেন যে, কর্ণফুলী নদীর পূর্বতীরে তখন চাকমা রাজা টব্বর খাঁন বসবাস করতেন। তিনি যদিও রাজ বিহারের কথা উল্লেখ করেননি, তবে এটা অনুমান করা যায় যে রাজ বাড়ির নিকটে রাজবিহার বা কিয়ং ছিল। যেহেতু সে সময় Francis Buchanan তার বইতে কর্ণফুলি নদীর উজানে কাচালং এলাকার একটি গ্রামে অবস্থান কালীন সময় গ্রামবাসীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষু বা মইসাং দেখেছিলেন।

আমরা অনেকেই জানি রাণী কালিন্দী চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গনিয়া উপজেলায় রাজা নগরের প্রথম ১৮৫৬ সালে ইষ্ঠক নিমির্ত বুদ্ধমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং তথায় মহামুনি মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রী সতীশ চন্দ্র ঘোষ ১৯০৯ সালে তার লিখিত চাকমা জাতি বইতে ১৮৯ পৃষ্ঠায় যে বর্ণনা দিয়েছেন তা এখানে পাঠকদের জন্য উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করি।

কালিন্দী রাণী কর্তৃক রাজানগরে মহামুনি মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠার কথা পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে। পরন্ত তাঁহার সংকলিত ইষ্ঠক ময় ক্যংগৃহ প্রস্তুত হয় নাই বটে, তবে সেই বংশ বেত্রনির্মিত তৃনাচ্ছাদিত প্রাচীন কিয়ং অদ্যাপি স্বর্গীয় রাণীর অপূর্ব ধর্ম প্রাণতার সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। রাঙ্গামাটি রাজবাড়িতেও একখানি কিয়ং প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ইহা রাজভবনের পূর্ব পার্শে অবস্থিত। শ্রীযুক্ত দীননাথ ভিক্ষু মহোদয়ের উপর এই মঠের অধ্যক্ষতা রহিয়াছে। এই ‘কিয়ং’ এ (বিহারে) একটি মনোহর বুদ্ধমূর্ত্তি স্থাপিত আছেন। এতদভিন্ন চাকমাদিগের অধিকাংশ স্থায়ী গ্রামেই অধূনা ক্যং এবং বুদ্ধমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। তাহা অন্তত একজন ভিক্ষু বা শ্রমণের তত্ত্ববধানে থাকে।

গ্রামবাসীরা বুদ্ধদেবের সেবার নিমিত্ত যে সমস্ত ভক্তি উপাচার অর্পন করেন তৎদ্বারা মঠাধ্যক্ষগনের ভরণপোষন চলিয়া যায়। সম্প্রতি বর্তমানে সুপারিনটেন্ডডেন্ট মিঃ হাচিনসন মহোদয়ের উৎসাহে রাজা বাহাদুরের তৎপরতায় রাঙ্গামাটিতে একটি বিরাট ইষ্ঠকময় বিহার ও তন্মধ্যে পবিত্র মহামুনি মুর্ত্তি প্রতিষ্ঠাকল্পে তদীয় সার্কেলের প্রজাগন হইতে চাঁদা সংগ্রহীত হইতেছে। তাহাদের আশা আছে প্রতি মাঘী-পূর্ণিমাতে এখানে মেলার বন্দোবস্ত করিবেন।

রাজা ভূবন মোহন রায় ১৮৭৬ সালে ইংরেজীর ৬ মে রাঙ্গামাটি রাজপ্রাসাদে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৭ মে, ১৮৯৭ সালে চাকমা রাজা হিসাবে সরকার কর্তৃক রাজপদে অভিষিক্ত হন। তিনি ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ সালে পরলোক গমন করেন। রাজা ভূবন মোহন রায় ১৯০২ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে দ্বিতল বিশিষ্ট ইষ্ঠক নির্মিত একটি রাজ প্রাসাদ নির্মাণ করেন যা ১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর উপর কাপ্তাই নামক স্থানে বিশাল বাঁধ নির্মানের ফলে কাপ্তাই হ্রদের জলে জলমগ্ন হয়।

রাজা ভুবন মোহন রায় তার রাজত্বকালে এই সময়ে তিনি পুরাতন রাঙ্গামাটি রাজপ্রাসাদ থেকে কিঞ্চিৎ দূরে ইষ্ঠক নির্মিত একটি বিশাল বুদ্ধ মন্দির নির্মান করেন। এই মন্দিরের দেয়ালগুলো খুবই পুরু ছিল। তিনি এই মন্দিরে তৎকালীন বার্মার মান্দালয় শহরে লোক পাঠিয়ে সেখান থেকে অষ্ঠধাতু নির্মিত বুদ্ধমুর্ত্তি আনায়ন করেন এবং নবনির্মিত মন্দিরে স্থাপন করেন।

১৯৬০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, বর্তমান বাংলাদেশে এই বুদ্ধ মূর্ত্তিটি ছিল সর্ব বৃহৎ। এটি গৌতম মুনি নামে পরিচিত। কিন্তুু দুঃখের বিষয় কাপ্তাই হ্রদের জলে এই বৃহৎ মন্দিরটি জলমগ্ন হয়। বাল্যকালে আমার বয়স তখন ৭ কিংবা ৮ বছর আমার এখনও মনে আছে বিশাল গৌতম মুনি মন্দিরে নিকটে ভিক্ষুদের বাসভবন ছিল। ভিক্ষুদের ভবনের নিকটে একটি ছোট পুকুর ছিল। পুকুরটি ঠাকুর পুকুর নামে পরিচিত ছিল। আমরা ভিক্ষুদের ভবনটিকে বলতাম ঠাকুর কিয়ং, বড় মন্দিরটিকে বলতাম বড় কিয়ং। মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ দ্বারে একটি বৃহৎ লৌহ নির্মিত গেইট ছিল।

মন্দিরের চার পাশে ৩/৪ জন লোক ঘুরতে পারে সে রকমে নির্মিত হয়। তবে ১৯৬০ সালে মন্দিরটি জলমগ্ন হওয়ার আগে এই গৌতম মুনি বুদ্ধ মুর্ত্তিটি বর্তমান রাঙ্গামাটি রাজ বিহারে পুনঃস্থাপন করা হয়। ১৯৫৮সালে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের (১৯৩৩-২০১২) আহ্বানে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাথেরো চাকমা রাজগুরু পদে অভিষিক্ত হন। তিনি রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালি ভাষায় ও বৌদ্ধ ধর্মের উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫৬ সালে রেঙ্গুনে অনুষ্ঠিত ২৫০০ তম বুদ্ধ জয়ন্তী উৎসবে যোগদান করেন। তাকে মায়ানমারের বৌদ্ধশাসন কাউন্সিল অগ্রমহাপন্ডিত উপাধি প্রদান করে সম্মানিত করেন। পরবর্তীকালে ২০০৫ সালে ২২ শে এপ্রিল মায়ানমার সরকার তাকে অগ্রমহাসদ্দম্মজোটিকাদজা উপাধি দিয়ে সম্মানীত করেন (Aggamohasaddhammajotikadhaja)। শ্রীমৎ রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো ৫ জানুয়ারি ২০০৮ সালে পরলোকগমন করেন।

তিনি একজন বৌদ্ধ ধর্মীয় পন্ডিত এবং বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে রাজ বিহারে ভদন্ত শীল পাল ভিক্ষু মহোদয় বিহার অধ্যক্ষ হিসাবে অধিষ্ঠিত আছেন। তার উদ্যোগে এবং চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বহু বৌদ্ধ উপাসক-উপাসিকার সহায়তায় ও শ্রদ্ধাদানে বর্তমান অবধি ঐতিহ্যবাহী চাকমা রাজ বিহারে বিভিন্ন ধর্মীয় পুণ্যঅনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে উদযাপন করা হয়।

বর্তমান রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত রাজ বনবিহারে রাজ পরিবারের অবদানের কথা সবার জানা আছে। আশা করি ভবিষ্যতে ও চাকমা রাজ বিহার বর্তমান চাকমা রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্য ও কৃষ্টি রক্ষায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বজায় থাকবে।

[বিশেষ দৃষ্টব্য- এই লেখাটি দেখে দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করায় বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, রাঙ্গামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউটের প্রাক্তন পরিচালক মিঃ সুগত চাকমাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।]

✍ চাঁদ রায়

তথ্যসূত্র: সম্বোধি বার্তা-৮

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *