মৃত্তিকা চাকমা: কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ

সূচনা : কবি পরিচয়

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ প্রকৃতির স্বতঃস্ফুর্ত জীবনবোধের সাবলীল ও সৃজনশীলতার অন্বেষণকারী কবি মৃত্তিকা চাকমা। তার জন্ম বর্তমান রাঙামাটি শহরের উত্তর-পূর্বাংশে৫৯নং বন্দুকভাঙ্গা মৌজার কাগত্যাদোর মুগছড়ি গ্রামে, ১২ জানুয়ারি, ১৯৫৮ সালে এক অভিজাত পাহাড়ি চাকমা পরিবারে। কাপ্তাই বাঁধের সময় শৈশবে উদ্বাস্তু হন কবি। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার লোগাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি, এ অনার্স এম,এ পাশ করেন। ভাষা বিজ্ঞানী ড. মনিরুজ্জামান, ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান (পদ্মভূষণ) এবং ড. রাজীব হুমায়ুনের প্রিয় ছাত্র এবং তাঁদের সান্নিধ্যে থেকে বেড়ে ওঠা কবি শিক্ষকতাকে বেছে নেন পেশা হিসেবে। মিজ এস,আর চাকমা তাঁর জীবন সহযাত্রী সহধর্মিনী। তরুন নাট্যকার দ্যানিস চাকমা ও নিসা চাকমার গর্বিত বাবা এই জীবনবাদী কবি। কবির বাবা যুবনাশ্ব চাকমা ও মাতা রাজলক্ষী চাকমা উভয়েই শেষ জন্ম দুঃখের রূপ স্কন্ড পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন বহু আগে। ইতোমধ্যে কাব্য সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য দেশ বিদেশ হতে সম্মাননা অর্জন করেছেন এই আত্মপ্রচার বিমূখ কবি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর ট্রাইবেল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন কর্তৃক “আদিবাসী কবিরত্ন” অভিধায় ভূষিত করেছে এই স্বনামধন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের আত্মজ কবিকে।

কবির কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা পাঁচ এ উন্নীত হয়েছে ২০১২ সালে। কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-
১। দিগবন সেরেত্তুন-১৯৯৫ (চাকমা কবিতা)।
২। মন পরানী-২০০২ (চাকমা কবিতা)
৩। এখনো পাহাড় কাঁদে-২০০২ (বাংলা কবিতা)
৪। এ্যাঙ্কুর-২০১০ (চাকমা কবিতা)
৫। মেঘ সেরো মনোচুগ (মেঘ-পাহাড়) ২০১২ (চাকমা-বাংলা দ্বিভাষিক কবিতা)।

বৈচিত্র্য সংস্কৃতির পীঠস্থান পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথিতযশা সাহিত্য ও সংবাদ কর্মী শ্রী প্রদীপ চৌধুরী বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের কবিদের কবিতা আলোচনা এবং আলোচিত বিষয়সমূহ গ্রন্থাকারে প্রকাশনার যে মহতি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তারই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই আমার এই আলোচনার মূল কারণ। তবে শুধু কবিদের কবিতা আলোচনা বললে আমার মনে হয় আলোচ্য বিষয়টি হালকা হয়ে যায়। এক্ষেত্রে জনাব চৌধুরী একটি মানদন্ড ঠিক করেছেন তা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে সকল কবিদের তাবৎকালে ন্যুনতম একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে কেবল সে সব কবিদের কবিতা আলোচনা করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হবে। এবং কাব্যগ্রন্থের সত্ত্বাধিকারী কবিরাই হবেন আলোচক। মোট কথা জনাব চৌধুরী যে গ্রন্থটি প্রকাশ করতে যাচ্ছেন সেটি হবে কবির দৃষ্টিতে কবি এবং তার কাব্য আলোচনা। কথার প্রসঙ্গে যদিও কবির দৃষ্টিতে কবি শব্দটি ব্যবহার করার কারণেই আমাকেই আমি কবি হিসেবে দাবী করার বিষয়টি সামনে এসে যায়, নয় কি? সে ক্ষেত্রে বলবো, আমি কবি নই তবে লেখালেখির পাগলামী করতে গিয়ে এ যাবৎকালে আমার ৩টি কবিতা বই (যদিও কবিতা অর্থে কবিতা নয়) প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবতঃ ৩টি কবিতা বইয়ের কারণেই শ্রী চৌধুরীর সজাগ দৃষ্টি হতে এড়িয়ে যেতে পারিনি। আর সে কারণেই কবি মৃত্তিকা চাকমার কবিতার ইন্দ্রজালিক নিগূঢ় তথ্য ও তত্ত্বের ভাব প্রকাশ কতটুকু বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে জানি না। তবে আমার মনোনিবেশ থাকবে কবির কাব্যিক ইন্দ্রজালিক দৃষ্টিপাত সহজভাবে বিশ্লেষণ করার।

দিগবন সেরেত্তুন

কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিগবন সেরেত্তুন’ প্রকাশকাল ১২ জানুয়ারি ১৯৯৫। কাকতালীয়ভাবে কবির শুভদিনও কিন্তু এই ১২ জানুয়ারি। অর্থাৎ কবির জন্মদিনে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ আলোর জগতে চলে আসা তাও আরেক অবাক করা কবিতা। গ্রন্থের সত্ত্বাধিকারী নিসা চাকমা, মুদ্রণ: ছড়াথুম পাবলিশার্স, রাঙামাটি। বাংলা বর্ণে চাকমা ভাষায় মোট ৩৮টি কবিতা নিয়ে, দিগবন সেরেত্তুন আর কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিংবদন্তীতুল্য প্রবাদ প্রতীম কবি সুহৃদ চাকমা নামে। গ্রন্থটি প্রকাশের ১৮ বছর পর ২০১৩ খ্রি. গ্রন্থের ২য় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কবিতার ইতিহাসে এই কোন কাব্যগ্রন্থের ২য় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সেক্ষেত্রে বলা যায় গ্রন্থটি সফলভাবে সমাদৃত হয়েছে পাঠকের মনে।

কাব্যগ্রন্থের নামকরণ

এই কাব্যগ্রন্থ চাকমা ভাষার শব্দবেত্তা ব্যক্তিগণের গোচরে এলই তারা নড়েচড়ে উঠবেন। পাঠ করবেন এবং সত্যানুসন্ধান করবেন দিগবন সেরেত্তুন নামকরণের অন্তরালে কিসের আলামত হাজির করতে চেয়েছেন কবি? দিগবন সেরেত্তুন এর বাংলায় সরল শব্দার্থ উপস্থাপন করা সহজ সাধ্য না হলেও আক্ষরিক অর্থে বহুমাত্রিক সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের পরিভাষায় মৃত্যু হতে একহাত দূরে শব্দটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় অনায়াসে। সে দিনকালের পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক অবস্থাকেই বিবেচনায় নিয়েই কি কাব্যগ্রন্থের এমন শিরোনাম দিয়েছেন? যদি তাই হয় তাতেই আমরা বলবো এই নামকরণ সার্থক হয়েছে নিঃসন্দেহে। অবশ্যই ইতোপূর্বে চাকমা ভাষার কুশলী দুই সাহিত্যজন সঞ্চয় চাকমা (প্রয়াত আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পাদিত তৃণমূল, ২য় সংখ্যা, ১৯৯৫) ও জনেশ আয়ন চাকমা (সদরক, ১৯৯৫, আগরতলা, ভারত) এই কাব্যগ্রন্থের উপর দীর্ঘ সাহিত্য আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে। এই দুই আলোচিত সাহিত্যিক কাব্যের শিরোনামে মর্মার্থ বন্দিপাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস কিংবা বজ্রপাতের রঙিন সৌন্দর্য দেবা পারাগত তে দেঘে পরি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই স্বনামখ্যাত দুই সাহিত্যজন এমনভাবে কাব্যগ্রন্থের আলোচনা করেছেন তার উপর আলোচনা আর কিছুই বাকী আছে সেটি আমি বিশ্বাস করিনা। ইঁদুর সাঁতার কেটে নদী পার হবার ব্যর্থ চেষ্টার মতো অবগাহন করি কবির কবিতার তলহীন গভীর সমুদ্রে-।

চম্পক নগর

চম্পক নগর চম্পক নগর কুধু আঘস?
থান-দ পাজ তুই অহ্লে আমা’ পরান আমা’ বিজগ
আঃবাদী বাদী ভুইও ধান
চম্পক নগর চম্পক নগর কুধু আঘস কুধু তুই?
বেজাদর ইংসের শতাব্দীর লারেয়ত আহ্ঝি গেলে ইধোত্তুন
চম্পক নগর কা আহ্দর শিগোল পিনি আঘস?
মারি পিদি লোরেয়ন, অয়নি যারে যুওত লাগত পেই
বংশ উভোদ গোরি বুগুর পাদা গোরি দোন সারকার
চম্পক নগর কুধু আঘস এক্কা রেনি- চা।
তুই নেই ভিলি বিদি যার অজিরেন যুগ যুগ অত্যাচার
পজ্জন শুনেদাগ আজু নানু, ইহধোত আঘে
এক জনর পঝা বুক্যা, উত্যা লাঙদা পুও করত
বুরোবুরি ধাভা দোন লঙ্গুর তিন থেঙ্গে
পরান বাজনিত যেয়ন নেবা খাজার মাগানা ভাত।
চম্পক নগর আহঝি যেইয়্যা মানেই লক কনে কুধু?
দুনিয়ের মানেই জাগি উত্যন উধি এয আমিও জাগি যেই।
কুরেই এয যে যিদু ছিদি আঘ’
রেনী চহ্ পিত্তিমিয়েন তোলোই বনার হগ বদের
তোগেই চেই আহঝি যেইয়্যা চম্পক নগর ভিধে কুল।
আভা কধা ফেলেইদি জাদ সত্য তোগেই চেই
ভালেত অভালেত তাগ তুগ ফেলেইদি –
চম্পক নগর কুধু আঘে, কিঙিরি আঘে রেনী চেই
এয’ ভেই ছিনে নেযেই শিগোলোর হারুয়ান।

চম্পক নগর (বাংলা)

চম্পক নগর চম্পক নগর তুমি কোথায়?
তোমার বক্ষে লুকিয়ে আছে আমাদের শৌর্য বির্যের ইতিহাস
বিস্তীর্ণ জমির কাঁচা পাকা ধান
চম্পক নগর চম্পক নগর তুমি কোথায়?
জাতিগত যুদ্ধ বিগ্রহে চলে গেছো তুমি স্মৃতির আড়ালে
বলো তো কার শৃঙ্খলে বন্দী কয়েদি তুমি চম্পক নগর
যাকে পেয়েছে যেখানে সেখানেই করেছে নিধন
সমূহে বংশ ধ্বংস করে
ইতিহাসের পাতা থেকে বিলীন হয়েছে একটি লড়াকু জাতি
চম্পক নগর চম্পক নগর তুমি কোথায়?
ফিরে তাকিয়ে দেখো শুধু একবার, শুধু একবার।

কাব্যগ্রন্থে প্রদত্ত সন ও তারিখ অনুযায়ী কবির কবিতাটি রচনা করেন ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯। পার্বত্য চট্টগ্রামের সে কালের উষ্ণ রাজনৈতিক হাওয়া তরুণ্যদীপ্ত কবিকে ভাবিয়ে তুলেছে তা সহজেই অনুমান করবেন পাঠক মহল। এখানে বলাবাহুল্য যে, একজন সৃজনশীল লেখক তার নিজের স্বজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ থেকে সৃষ্টির কাজ অব্যাহত রাখতে প্রয়াসী হন সর্বদা। কারণ একজন সংবেদনশীল লেখক-কবি মাতৃভূমি, জাতীয় উত্থান পতনের কালাতীত ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকেই কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারেন না। বরং এ সবের প্রতি লেখক আরো বেশি গভীরে প্রবেশ সমুদ্রতলের মনি মাণিক্য খোঁজার মত করে সাহিত্যের রতœখনির ভান্ডার খোলাসা করেন কাব্য জগতের বাসিন্দাদের মনে। চম্পক নগর চাকমা জাতির আদি রাজ্য। কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে চাকমা রাজা বিজয়গিরি সৈন্য সামন্ত নিয়ে চম্পক নগর হতে দ্বিগীজয়ের যাত্রায় বের হয়ে পড়েন। তার কোন সঠিক ইতিহাস জানা নেই রাজা বিজয় গিরির উত্তর প্রজন্ম চাকমা জাতির। কিংবা জানা নেই কথিত চম্পক নগরের ভৌগলিক অবস্থানও। তবুও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্মৃতির ক্যানভাসে একাকার হয়ে আছে এককালের শৌর্য বীর্যে পরাক্রমশালী চাকমা জাতির মনের গহীনে। অজানা-অচেনা চম্পক নগর শুধুই চাকমা জাতির আদি আবাসভূমি নয় অপরাজেয় একটি জাতির বীরত্ব ইতিহাসেরও নিশানা। এককালে পরাক্রমশালী চাকমা জাতি স্বদেশ, স্বজাতির নিশানা হারিয়ে দিনে দিনে সংখ্যাধিক্য ক্ষয় হতে হতে এখন ভগ্নাংশের স্তরে এসে পৌঁছেছে। তাই জাতির ক্রান্তিকালের বিরহ, বেদনা ও দ্রোহে এবং অপ্রাপ্তীতে সেই হারানো দিনের ইতিহাসের গৌরব অধ্যায়টি যেন জাতিকে স্মরণ করে দেবার দুর্নিবার আকাঙ্খায় কবি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলতে চান।

‘চম্পক নগর, চম্পক নগর তুমি কোথায়?’ এই চম্পক নগরের কথা শোনে যদি সম্বিৎ ফিরে পেয়ে চাকমা জাতি স্বদেশ ও স্বজাতিকে ভালবাসতে শেখে তাতেই যেন তৃপ্তি লাভ করেন কবি।

অ’ ইনঝীব হিলট্রক্স

দুনিয়েদ আঘদে বন্দাউন তুমি অলর কিয়ে দেঘর কি ন’দেঘর
তমা চোগোত পরের কি ন’ পরের
শুনর কি ন’শুনর দেঘর কি ন’দেঘর
গোদা হিলট্রেক্স এস্যা কয় যুগ কয় বঝর ওই আঘে
জুমপরা আগুন সান দাঙ দাঙ্যা
বনন বনন আঙিযার, আগুন বাস্যা তেল খুনিসান
ভুরুঙ ভুরুঙ কালা ধুমই লেভেই যার।

অ ইনঝীব হিলট্রেক্স (বাংলা)

পৃথিবীর শান্তিবাদী নরনারী সকল-
তোমরা সবেই চুপ হয়ে আছো কেন?
তোমরা আদৌ কি দেখছো
কিংবা তোমাদের চোখ কান সজাগ রেখেছো কি?
কত যুগ যুগ ধরে পাহাড়
কাঁদছে অব্যক্ত করুণ মর্ম ব্যথায়-
জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে,
যেন আগুনে ধরা খনিজ তৈলখনি।
আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে বিষাক্ত কালো ধুঁয়ায়
পাহাড় যেন আজ ইতিহাসের রোম নগরী।

আমি আগেই বলেছি একজন সৃষ্টিশীল লেখকের দেশত্ববোধের চেতনা তার সমগ্র সাহিত্যকর্মের আয়তনে সর্বাপেক্ষা শক্তিধর চেতনা যা কিনা মানুষের শক্তির অপরিমিততার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। জয় করে নেয় জীবন ও জগতকে। তেমনই একটি অমিয় শক্তিমান কবিতা অ’ ইনঝীব হিলট্রেক্স (অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম)। কবিতায় শব্দ বুনন তাক করেছেন বিশ্বের শান্তিবাদী মানুষের দিকে। কবিতার প্রতিটি বর্ণমালা, শব্দ ও বাক্য যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চাই সে কালের পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈরীময় পরিস্থিতিকে। মানুষের অন্তর্গত যে জগৎ আছে সেই জগতের সাথে কবি মিলাতে পারেন না তার স্বদেশকে। আর এজন্য কি কবি বলতে চেয়েছেন অ’ ইনঝীব হিলট্রেক্স (অবিবেচক হিলট্রেক্স) নাকি শান্তিবাদী মানুষেরাই অবিবেচক? এ জবানী বেরিয়ে আসুক কবির কবিতা পাঠককুলের হৃদয় থেকে।

অঝা পাদর মিছিল

মুওর ভাপ কধক আর বুবর স্ববন ওই থেব
কমলে পিত্থিমি নিজেজ সমারে সাঙ- খেব
পিত্থিমি নিজেজ মিঝিলে মিঝিলে
সাঙ খেই দুনিয়ের বোয়ের সমারে বেই যার
নিজেজ কমলে তুইও সেজান কিজেক সারিবে?

অঝা পাদর মিছিল (বাংলা)

হৃদয়ের উঞ্চ হাওয়া আর কতোদিন-/থাকবে বোবা স্বপ্ন হয়ে,
কখন পৃথিবীর আলো বাতাস মিছে যাবে নিঃশ্বাসের সাথে
এই পৃথিবীর আলো বাতাসের ঝলগায় ঝলগায়
বুকের জমাট বাঁধা নিঃশ্বাস মিশে গিয়ে
কখন সৃষ্টি করবে বিকট তরঙ্গমালা।

এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, কবি সাহিত্যিকরা তাঁদের জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে এসে কারো না কারো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকেন। সাহিত্য জগতে এটি দোষনীয় নয়। কবির এই কবিতা বৈশ্বিক ও বিশ্বমানবিক চিন্তা চেতনার মস্তিস্ক প্রসূত ফসল। কবির শৈশবকাল কেটেছে ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা সবুজ বর্ণিল পরিচ্ছন্ন গ্রাম পরিবেশের সমারোহে। গ্রাম জনপদে বেড়ে উঠেছেন পাহাড়ের সংঘাতময় কঠিন আবেশ পরিক্রমায়। তাই কবি শয়নে স্বপনে ও জাগরণে অনাবিল নৈপুণ্য বিশ্ব মানবিক চেতনাবোধ অন্তরে লালন করেছেন খুব স্বাভাবিকভাবে। বিশ্ব চেতনাবোধ, নন্দন চেতনার সামগ্রিকতা ও পৃথিবীর মুক্ত আলো বাতাসে জীবনকে অনুভব করার তাড়নায় উদ্বেলিত হয়ে উঠেন। কবি আশির দশকের কবির কাব্যের প্রথম পাঠে বাজিমাত করে আকাশ ছুঁয়েছেন এটিই যেন দাবি করে কবির কবিতা। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন না হয়ে এই বিশাল আকাশ উন্মুক্তথাকুক সর্বদা, পৃথিবীতে বয়ে যাক শান্তির সুবাতাস। সেই সাথে মানুষের বহুমাত্রিক জ্ঞানের পরিধি সীমাবদ্ধতায় স্থিত না থেকে ছড়িয়ে পড়–ক বিশ্বময় গণমানুষের অন্তরে এই সুতীব্র আকুতি জানান দিয়ে যায় কবির কাব্য ভাবনা। কবির শাণিত চেতনায় সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো এবং অন্যায়কে ধিক্কার জানানোর বহমান সংস্কৃতি বহন করার আদিরূপ হিসেবে গেঁথে থাকুক সবারই অন্তরে। তাইতো কবি প্রশ্ন রাখতে চান- নিজেজ কমলে তুইও সেয়ান্যা কিজেক সারিবে?

নাদংসা মিলের কোচপানা এল

মুই কোচপানা শিক্কং কজমা বঝত
জীংকানির বেল উত্তে আ’ পত্তে
দেঘা অহ্ল’ এগ নাদংসা মিলের সমারে
এভে কোচপানা শিঘিলুং ছরাপারত্তুন তুগনত।
কোচপানা শিক্কঙ কোচপানা জান্যঙ
এবার আঝার ভাঙনী এযোক জুরনী এযোক
ম’ সংসার পদত মুই লদ্ দোং, মুই আহধঙর
সেই -ই মুই লুমিম্মোই, ধনু হিস্যা মুর হামত।

বাংলা
কৈশোরে ভালবাসতে শিখেছি আমি
জীবনের শুরুতে এবং পড়ন্ত বেলায়
কাছে এলো এক ছন্নছাড়া যুবতী
তখনই ভালোবাসার ঢেউ বয়ে যায়
ঝর্নার পাড়ে পাড়ে কিংবা পৃথিবীর শেষ সীমানায়।
————————————-

শিখেছি ভালবাসতে, জানা হয়েছে নিখাদ ভালবাসা
যতই আসুক ভাঙা গড়ার দুঃস্বপ্ন
তবুও আমি গড়বোই আমার স্বপ্নের সংসার
আমার পথেই আমি নিমগ্ন থাকবোই
যেন তাক করা বাঁকা ধনুকের মতো করে।

কবি যেন এখানে ধনী-গরীব শ্রেণী বিভেদ কিংবা চলমান সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। একজন উঁচু সমাজপতি কিংবা ধনাঢ্য ঘরের মেয়েকে নয় গাঙময় ভালবাসার ঢেউ উপচে গেছে একজন ছন্নছাড়া যুবতী মেয়েকে দেখে। কিন্তু কবির সামগ্রিক ভাব বিবেচনায় শৈল্পিকতার রূপক অর্থে ছন্নছাড়া মেয়েটিকে হাজির করছেন তা বুঝতে যেন কারোর দায় হবার কথা নয়। আসলে কবি ভালবাসতে চেয়েছেন বিপন্ন মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে। ৬০ দশকের উদ্বাস্তু মানুষের মর্মর ব্যথা, যন্ত্রণা এবং অনিশ্চিত জীবন প্রবাহ আপাদমস্তক মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন কবি। আর এতেই কি জীবনের জয়গান শোনাতে ভাঙা গড়ার দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে জীবন ও জীবিকা বিপন্ন মানুষদের ভালবাসতে চান কবি? কবি বিপন্নজীবন মানুষের পাশে থেকে এসব মানুষদের প্রাণ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে চান তার নিখাদ ভালবাসার বন্ধনে বেঁধে। আর এখানেই কবির ছন্নছাড়া মেয়ের প্রেম-ভালবাসার সার্থকতা।

এভাক্কে সিউনর উধিজে

ভালক দিনর ভাদ গোরাজ বাঝি আঘে নোরোলি
অসঞ্জুগ থিয়েলে সুগ নেই বলে সুগ নেই
ডাক্তার বৈদ্য তোগা তোগি
গম অল’ একদিন
মনে অয় ওভোলা আদামত্তুন ফিয্যাগোই
————————–

কাজেই এভাক্কে সিউনর উধিজে
এলে চুধো থেঙ নয় জোদা দিএ্যা
নোরোলির ভাদ গোরাজ থেলা দিএ্যা নয়
এলে ডাক্তর বৈদ্য নিনেই
যুদি ন’অয় সালেন ব্যাধিয়ানি পারঅভ’
ক্যান্সার নয় দ অন্য কন’ ঘাদক ব্যাধিয়ে।
উঝ অহ!
কোই লঙর থেঙর হুচ ফেলেবা বুঝিনে।

বাংলা
বহুদিন ধরে ভাতের গ্রাসগুলো আটকিয়ে পড়ছে কণ্ঠ নালিতে
উঠতে বসতে বেসামাল যন্ত্রণায় কাতর-
ডাক্তার-কবিরাজ খুঁজতে খুঁজতে
আরোগ্য হলো একদিন
তাও যেন পুনঃজন্ম ফিরে পাওয়া
অতঃপর আগন্তুক প্রজন্মের উদ্দেশ্যে-
বলে যেতে চাই বেজায় খালি পায়ে নয়
নয়তো সরু কণ্ঠনালী
ডাক্তার-কবিরাজ নিয়ে হাজির হবে
যদি তা না হয় রোগটি গ্রাস করে ফেলবে
সেটি হয় ক্যান্সার না হয় কোন দুরারোগ্য ব্যাধি।

কবি এই সমাজের চারপাশকেই নিয়ে তৃপ্ত নন। কবি আশায় বুক বাঁধেন এ ভেবে যে, এ পাহাড়ে নব বসন্তের সোনালী সূর্য উদিত হবে একদিন। ফিরে আসবে সেই বসন্তের হিমশীতল বাতাস। তখন তৃপ্ত হবে কবির অতৃপ্ত মন। কারণ কবি বিশ্বাস করেন আগন্তুক প্রজন্মদের হাত দিয়েই রচিত হবে এক নব জাগরণের ইতিহাস। তারা এসে গাইতে শুরু করবে জীবনের জয়গান। তখনই রচিত হবে এক অনিন্দ্য সুন্দর ও সুখকর জীবন এবং জগত। আর সেই সুখের আবহে রোমাঞ্চিত হবে সকল মানুষের অতৃপ্ত হৃদয়। তাই তো তাদের অপেক্ষায় দিন গুনেন কবি। কবি আরো বিশ্বাস করেন সারা পৃথিবীর মানুষ একমুঠো ভাতের জন্য সংগ্রামরত। এসব মানুষের ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা করেই রাজনীতির নামে বা অন্য কোন লেবাসে যারা তাদের শোষণ ও অত্যাচার এবং নিপীড়ন করে আসছে তারা জানে না যে এই পৃথিবীর মুক্তি ও শান্তির প্রত্যাশী মানুষগুলো জেগে উঠলে তাদের অস্থিত্ব রক্ষা করা কঠিন হবে। এমনতর অবস্থায় শান্তি প্রত্যাশীর মানুষের সাথে একাত্মতা পোষণ করেন কবি। এ সব নিরন্ন মানুষের কষ্ট, যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করেই তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করাটাই যদি হয় সাম্য ও ন্যায্যবাদের বিশ্বাস তাহলে সেক্ষেত্রে কবি অনেক বেশি সাম্যবাদী। মানুষের যাপিত জীবনের বাস্তব চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় কবির কবিতায়।

জীবনবাদী সাহিত্যের কাফেলা এই কবি। কবির প্রায়ই কবিতায় পৃথিবীর ভূখা, বঞ্চিত, অবহেলিত মানুষের বেদনার কথা বর্ণিত হয়েছে। সেসব মানুষের বেদনা ও বঞ্চণার কথা বলা হয়েছে তার কবিতায়। দল, মত, ধর্ম, বর্ণ ও জাতপাতের বাইরে এসে কবি নির্মাণ করতে চান শ্রেণি ও বৈষম্যহীন এক অনাবিল পরিচ্ছন্ন মানব সমাজ। আর তাদের সুখেই তখনই তৃপ্ত হতে চান কবি।

দিগবন সেরেত্তুন

মুই লোরবো লরানা মর জনম্মো
মর থেঙ যার পদ আহধি চোগ যার ইধোদি
আহ্ধ যায় ধুলেনে মন যার তাগিনে
মুই লোরবো লরানা মর দিন্নো
সেনে কন উরোচপুন দোত্য
মানঝে য্যা কভার কোদোক আজলে মুই লোরবো।

বাংলা

আমি সংগ্রাম, সংগ্রামই আমার জীবন
নিবিষ্ট মনে হেঁটে যাই সংগ্রামের পথ ধরে
আমার সংগ্রামের ঋদ্ধমন বলছে
আমি লড়ে যাবো, লড়বোই
যে যা বলবে বলুক, আমি লড়বোই।

কবির ভাষায় ময়ালের কালো থাবায় বন্দী পাহাড়। বন্দী মানুষের বিবেকও পাহাড় জুড়ে উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস। কখন মুক্ত হবে পাহাড়। ফেলবে মুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাস সে ভাবনায় উতাল করে তোলে কবিকে। স্বদেশ, স্বজাত নয় সার্বজনীনতা এবং বিশ্ব মানবতা কবির কবিতার মূল অনুষঙ্গ। পাহাড়ের মানুষের জীবন টিকে রাখার সংগ্রামে কঠিন বাস্তবতার কথা ফুটে উঠেছে কবির কবিতায়। কবি ও কবিতা একটি সহজবোধ্য শব্দমালা। তবে মৌলিক সাহিত্যের কবি হয়ে উঠা সময় এবং ইতিহাস সাপেক্ষ। বলা যেতে পারে কঠিন থেকে কঠিনতর বিষয় ও বটে। কবিই পারেন নিত্য নতুন সৃষ্টিশীল জগত নির্মাণ করতে। অতিক্রম করতে পারেন বহুদূর। যুদ্ধ ও ঘোষণা দিতে পারেন সৃজনশীল অনবদ্য সাহিত্য। জগত সৃষ্টি করবেন বলে। কিংবা একটি যুদ্ধ ঘোষণা দিতে পারেন একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে’। আর সেই ফুলটি দেখার জন্য অতিক্রম করে যেতে পারেন যোজন যোজন পথ। আর কবির সেই ফুল দেখতে যাওয়ার গল্প মনে রাখবে চিরকাল। যুগে যুগে বলাবলি করবে সেই কীর্তিমানের কথা এবং ইহজগত ত্যাগ করলেও সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ চিন্তা করে আহা এই কবি একটি ফুলকে দেখতে গিয়েছিলেন সুদুর পর্বতমালায় এবং একটি ফুলকে বাঁচানোর জন্য গিয়েছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। এসব মানুষেরা পরে জানবেন কবি এভাবে স্বাধীন কোনদিন। আমাদের জন্য শুধু লিখে গিয়েছেন কবিতা। আর সেই সব কবিতা পড়েই তাদের মনে হবেই কবি গিয়েছিলেন যুদ্ধের ময়দানে আর ফুলকে বাঁচানোর জন্য কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র। তারপর একদিন লিখে গিয়েছিলেন কবিতা। এভাবে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকেন কবি এবং তাঁর কবিতা। কবি ও কবিতার প্রতি মানুষের ভালবাসা ফুরিয়ে যায় না কোনদিন। ফুরোই না কবিতার প্রতি মানুষের আনন্দ। আর যদি ফুরিয়ে যায় শেখ সাদী, বায়রন, রবীন্দ্রনাথ, নবীন চন্দ্র সেন, কাজী নজরুল এবং সুহৃদ চাকমার বার্গী কবিতা ও দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের ‘পাদারং কোচপানা’ কবিতা মানুষ আদৌ পড়ছে কেন? কোথায় সেই অদৃশ্য যাদুর কাঠি? যাদু শক্তি এখানেই কবিতা সমাজ জীবনের দর্পণ। কবিতা অসত্য ও অনিয়মের বিরুদ্ধে হাতিয়ার এবং কবি মূল্যবোধের প্রতীক। কবিতা যৌক্তিকতা ও দায়বদ্ধতার মহিসোপান। কবিতা মুক্ত চিন্তা চেতনার, স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রতা ও স্বাধিকার কায়েমের সিঁড়ি এবং কবি ও কবিতার জন্য আছে এক নিজস্ব জগত। কবির কবিতা পাঠকগণই সেই রাজ্যের বাসিন্দা। নেই এ রাজ্যের কোন সীমা রেখা। আর সেই সীমানাবিহীন কবিতা রাজ্যের বাসিন্দারা যুগ যুগ ধরে বুকে ধারণ করে রাখেন কবি ও তার কবিতাকে।

কবির ‘দিগবন সেরেত্তুন’ কাব্যগ্রন্থটি সাহিত্য ও শিল্প বোদ্ধাগণ কে কোন দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেছেন বা করে এসেছেন সেই নির্ধারণী সীমারেখায় পৌঁছানো আমার কাজ নয়। তবে আমার দৃষ্টিতে ‘দিগবন সেরেত্তুন’ কাব্যগ্রন্থটি ইতোমধ্যে লুফে নিতে সক্ষম হয়েছে কবিতা জগতের অধিক্ষেত্রকে। কাব্যগ্রন্থটি মননে, ছন্দে, শিল্পরূপ অলংকরণে দ্রোহের ভাস্বরতায় শক্তিমান একটি শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। আর কাব্যগ্রন্থের পদচারণার প্রথম কদমেই যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে অসত্য ও অন্যায্য এবং অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে।কবির প্রকাশিত আরো অনেক কাব্য ও নাট্যগ্রন্থ রয়েছে। আমি চেষ্টা করবো উক্ত অনালোচিত কাব্য ও নাট্যগ্রন্থ সমূহ পরবর্তীতে আলোচনা করতে।

লেখক: প্রগতি খীসা, বিশিষ্ট কবি, গীতিকার, সংগঠক ও সমাজ কর্মী, রাঙামাটি।

তথ্যসূত্র: নিধুকটুক-২০২২, বনযোগীছড়া কিশোর কিশোরী কল্যাণ সমিতি

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *