মোনঘর : একটি প্রদীপ্ত প্রত্যয়

মে ১৫, ১৯৮৩-র ভোর পাঁচটায় মৈত্রীভবনের ছেলেদের সমবেত কন্ঠের সঙ্গীতে আমাদের তিনজনের- আমার, আমার স্ত্রী অর্চনা ও আমাদের আড়াই মাসের সন্তান মাস্টার সুভদ্রর ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমরা ১৪ তারিখের সকালেই মৈত্রী ভবনের লাগোয়া নতুন বাড়ীতে উঠি। আর স্বস্ত্রীক স্কুলে যোগদান করেছি ২ মে। মৈত্রীভবনে সে-সময় ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেনীর ছাত্ররা মোনঘরের আবাসিক ছাত্র হিসেবে থাকতো। তাদের এই ভোরের সমবেত কন্ঠ-সঙ্গীতের গুঞ্জনে সুভদ্রর ডাগর চোখে অপার বিস্ময়। তারা গাইছিল :

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি
ধম্মং শরণং গচ্ছামি
সংঘং শরণং গচ্ছামি
আমা’ জাগা আমা’ ঘর আমা’ বেগ’ মোনঘর ২
সুগে দুঘে ইধু থেই বেক্কুন আমি ভেই ভেই ২
ইধু থেলে এ-জনম পেবং আর গমে পত্র ২
আমা’ জাগা আমা’ ঘর আমা’ বেগ’ মোনঘর ২
নমবুদ্ধ পধ ধরি এয বেগে কাম গরি ২
মধ্য পধে হাদি যেবং ন-থেব’দে কন দর ২
আমা’ জাগা আমা’ ঘর আমা’ বেগ’ মোনঘর ২

তাদের সমবেত কন্ঠের গুঞ্জরণে আমার সর্বশরীর উচ্ছ্বাসে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। সতর্ক হয়ে কান পেতে শুনলাম ভবনের অন্যান্য ছেলে-মেয়েরাও ঐ একই গান গাচ্ছে। তাদের সমবেত কন্ঠের গাম্ভীর্য ও গুঞ্জরণ সারা মোনঘর ধ্বনিত হয়ে প্রাণচাঞ্চলের এক নতুন আবহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তাদের কণ্ঠে এই সমবেত উদ্দীপ্ত সুর আমার হৃদয়ে চিরজাগরক থাকবে। বিশেষতঃ ভোর পাঁচটায় উদীয়মান সূর্যের মতো অন্তরের গভীর প্রত্যয় নিয়ে যে সাধনা ও কন্ঠে আগুয়ান, তা আমাকে বিমোহিত করে এবং এক অনির্বচনীয় আনন্দ ও প্রেরণা সঞ্চার করে। আজ আমি মোনঘরের সাথে এতই একাত্ম হয়ে গেছি, মূল উৎসের কিছু দায় ছেলেদের সমবেত কন্ঠের দুর্বার আত্মপ্রত্যয়ের সেই বিমল কঠিন স্বীকৃতি।

প্রাক-ভূমিকা:

আমি যখন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি, সে-সময়ই শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞানন্দ ভান্তে মোনঘরে শিক্ষক হিশেবে যাবার জন্য প্রস্তাব দেন। আমি তখনও অবিবাহিত। শ্রদ্ধেয় ভান্তের প্রস্তাবে তখন বিশেষ আমলই দিইনি। এর একটা কারণ, অনার্সের পর এম, এ-র বাঁক শেষ করা। দ্বিতীয়ত, আমার বিশ্বাস ( এবং এখনও বিশ্বাস করি), স্কুলে পড়িয়ে আমি নিজে তৃপ্তি পাবো না; আমার প্রয়োজন এরও উপরে। অনার্স পাশের পর এম, এ ভর্তি এবং বিয়ের (জানুয়ারি ৩, ১৯৮২) ২/৩ মাসের অব্যবহিত পরে পাবারিক দুর্যোগে আমি শ্রদ্ধেয় ভান্তে কাছে স্বস্ত্রীক শিক্ষকতার সিদ্ধান্ত জানাই। তিনি বোয়ালখালীস্থ পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আবাসিক স্কুলে যোগদানের পরামর্শ দেন, তখন মোনঘরে শিক্ষকের পদ না-কি শূন্য ছিলো না। শেষ পর্যন্ত বোয়ালখালীস্থ পাঃ চঃ বৌঃ অনাথ আশ্রম আবাসিক স্কুলে যোগদান করি অক্টোবর ১, ১৯৮৩। আমার এম, এ, পরীক্ষাও শেষ হয়। ইতিমধ্যে মোনঘরে ট্রান্সফারের জন্য ভান্তেরা প্রস্তাব দেন। কিন্তু সেখানকার পরিচালক শ্রদ্ধেয় প্রিয়তিষ্য ভান্তে এবং আমার সহকর্মীরা এতে রাজী ছিলেন না। আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা-তো নয়ই। শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আগে আমি ভান্তেদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য সম্পর্কে কিছু শুনেছি। তাদের ইচ্ছা :

১. এখানকার (পার্বত্য চট্টগ্রামের) নিরক্ষর ও গরীব গোষ্ঠীর ছেলে মেয়েদের সাধারণ শিক্ষার সাথে সাথে ধর্মীয় ও কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত করা। এতে একদিকে তারা যেমন সাধারণ শিক্ষা পাবে, অন্যদিকে তেমনি জীবিকাও নিশ্চিত হবে।

২. মোনঘর রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের কিছু আদর্শ অনুসরণে পক্ষপাতী। অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথ যে উপায়ে ও উদ্দেশ্যে শান্তিনিকেতন গড়েছেন ও শিক্ষার্থীদের যথার্থ শিক্ষিত করে গড়ে তোলা ছাড়া, সবদিক দিয়ে অনুপম শিক্ষিত-মানুষ হিশেবে গড়ে তুলেছেন, সেই প্রচেষ্টা কিছু কাজ লাগানো।

কিন্তু এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে, মোনঘর দ্বিতীয় শান্তিনিকেতন হবে; পুরোপুরি রবীন্দ্রনাথের ভাবাদর্শে পরিচালিত হবে। ব্যক্তি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ যেমন অনেকগুলো বিশেষ স্বকীয়তা শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার্য, তেমনি শ্রদ্ধেয় বিমলতিষ্য ভান্তে, শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞালংকার ভান্তে ও শ্রদ্ধেয় শ্রদ্ধালংকার ভান্তের কিছু স্বকীয়তাও সম্মানের সাথে গ্রহণীয়। সন্দেহ নেই যে, রবীন্দ্রনাথের মতো ব্যাপক-বিরাট প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব এঁদের নেই। রবীন্দ্রনাথ আমাদের সবকিছুতেই সূর্যের মতো ভাস্বর, তাই আমরা রবীন্দ্রনাথকে একসঙ্গে সামগ্রিকভাবে ধারণ করতে পারি না। কিন্তু, তার বিরাট ব্যাপক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভাকে তো খন্ড খন্ড করে ধারণ করার ক্ষমতা নিশ্চয় রাখি। পক্ষান্তরে, ভান্তেদের ঐকান্তিক ত্যাগে এখানকার নিরক্ষর ও গরীব ছেলেমেয়েরা বর্তমানে যে শিক্ষার আলো পাচ্ছে, এর চেষ্টা প্রচেষ্টা সামান্য ও নগন্য হিসেবে অবশ্যই বিবেচিত হতে পারে না। তাই, স্বাভাবতই শান্তিনিকেতনের গতি ও প্রকৃতি এবং কর্মধারার সাথে মোনঘরের পার্থক্য থাকবেই। আর মোনঘরের বৈশিষ্ট্য এখানেই। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানব সমাজে মাঙ্গলিকবোধের উদ্ভোধন ও উন্নয়নের জন্য শানিনিকেতনে তার সমস্ত শক্তি ব্যয় করেছিলেন। মোনঘরও বাংলাদেশের বিশেষতঃ পিছিয়ে পড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের এবং বিশ্ব- মানব সমাজের মঙ্গল ও শ্রীবৃদ্ধির লক্ষ্যে গৌতম বুদ্ধের সাম্য-মৈত্রী-অহিংসার আদর্শে উদ্ভোধিত। তাই, আমি এখানকার গুরুত্ব ও ব্যাপকত্ব উপলদ্ধি করে মে ২, ১৯৮৩-এ সহকারী শিক্ষক হিশেবে স্বস্ত্রীক যোগদান করি ।

মোনঘর শিশুসদন ৪ এর ভিত্তি সূচিত হয় ১৯৭৪-এ। কিন্তু এর প্রকৃতকাজ পুরোপুরি শুরু হয় ১৯৭৮-এ। আর আবাসিক স্কুলটি চালু হয় ১৯৮০-তে। কিন্তু এর সমস্ত পরিকল্পনা ভান্তেদের গুরু শ্রদ্ধেয় জ্ঞানশ্রী স্থবিরের পরামর্শে দিঘীনালার বোয়ালখালীতে গৃহীত হয় এরও অনেক আগে। সদনের প্রতিষ্ঠাপর্ব সম্পর্কে এখানে বিশেষভাবে প্রিয়তিষ্য ভান্তে ও শ্রদ্ধালংকার ভান্তের কর্মপ্রচেষ্ঠা সবিশেষ উল্লেখ না হলে সত্যিই অপূর্ণ থেকে যায়। ১৯৭৪-৭৬ পর্যন্ত প্রিয়তিষ্য ভান্তে সদনের জায়গা-জমি সংগ্রহ করেন। এ-উদ্দেশে তিনি রাঙ্গাপানি গ্রামে রাঙ্গাপানি মিলন বিহার, পালিটোল (এ-দু’টো প্রতিষ্ঠান এখনও রয়েছে ) ও ছেলে-মেয়েদের পড়ানোর জন্য বেসরকারী প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এর সাথে সাথে বিমলতিষ্য ভান্তে এখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের অবস্থা দেখে তাঁর গুরু ভান্তে ও সতীর্থভান্তেদের নিকট শিশুসদন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। তিনি এবং প্রজ্ঞানন্দ ভান্তে একসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে বেরিয়ে আসেন, তখন-ই এর প্রতিষ্ঠা পর্বের সমাপ্তি কাজের শুভযাত্রা। প্রিয়তিষ্য ভান্তে এখান থেকে বোয়ালখালীস্থ পা চ. বৌ. অনাথ আশ্রমের পরিচালক হিশেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণের পর ১৯৭৭-এ শ্রদ্ধালংকার ভান্তে মাত্র ৬ জন ছেলে নিয়ে এ-সদনের প্রথম কাজ চালু করেন। এরমধ্যে রাঙ্গাপানি গ্রামের ১/৩ ছেলে। বর্তমানেও উক্ত গ্রামের ছেলে-মেয়ের সংখ্যা একই হারে রয়েছে। ১৯৮০ থেকে এতে মেয়ে ভর্তি ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় অধিবাসী ও জেলার সর্বস্তরের জনগনের সার্বিক সহযোগিতা এবং ভান্তেদের কয়েকজন বিবেকবান বন্ধু- শুভাকাঙ্খীর প্রতিযোগিতা, সর্বোপরি সরকারী সহানুভূতি না থাকলে এ-রকম একটি প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব হতো না। তাই, এদের সকলের সাহায্য ও সহযোগিতা সর্বাগ্রে কৃতজ্ঞতা সাখে স্মরণীয়। বর্তমানে এখানে মোট ৩৬০জন ছেলেমেয়ে রয়েছে, এর মধ্যে ৫০ জন মেয়ে। তারা মোট ৬টি ভবনে থাকে। এখানে অতিসাধারণভাবে অনাড়ম্বর ও ভোগ-বিলাসহীন পবিত্র জীবন-যাপন করার বিধি প্রচলিত আছে। সাধারণতঃ ৫-১০ বছরের গরীব, মেধাবী ও পিতা-মাতা /অভিভাবকহীন শিশু-কিশোররাই এতে স্থান পায়। ভান্তেরা এতে তাদেরকে সাধারণ শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষা প্রদান করে জীবিকার উপযোগী করার চেষ্ঠা করেন। এখানে তাদের জন্য একটি আবাসিক স্কুল, একটি তাঁত কেন্দ্র, একটি কার্পেন্ট্রি সেন্টার, একটি সেলাই কেন্দ্র, একটি উলবোনার কেন্দ্র, একটি কৃষি বিভাগ, একটি পালি কলেজ, একটি চিকিৎসা কেন্দ্র এবং একটি প্রকাশনা বিভাগ রয়েছে।

মোনঘরের আয় ৪ এর প্রধান আয়ের উৎস ভূমি-সম্পদ। মোনঘর আবাসিক এলাকা ১২ একর ছাড়া ২০ একর বাগান জমি, ২৫ এক ধানচাষ যোগ্য জমি রয়েছে। এরপর গার্ডেনিং, ধান মেশিন, তাঁত, পাবলিক ডোনেশন, বিশ্বখাদ্য কর্মসূচী ও সরকারী অনুদান বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রশাসন:

মোনঘরের প্রশাসন অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত। এর পরিচালনা সভাপতি শ্রীমৎ বিমলতিষ্য ভান্তে দর্শনশাস্ত্রে অনার্সসহ এম. এ. (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), সাধারণ সম্পাদক শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ ভান্তে বাংলায় অনার্সসহ এম. এ. ( চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) ও পালিতে এম.এ. (ঢা.বি.), পরিচালক শ্রীমৎ শ্রদ্ধালঙ্কার ভান্তে পালিতে অনার্সসহ এম. এ. (চ.বি.)। তাঁদের সহকারী শিক্ষক হিশেবে আছেন
শ্রীমৎ সুদর্শী ভান্তে (বিহার অধ্যক্ষ ও শিক্ষক), শ্রীমৎ আর্যলঙ্কার ভান্তে, শ্রীমৎ ধর্মালঙ্কার ভান্তে এবং আবাসিক শিক্ষক মিঃ মঙ্গল কুমার চাকমা, মিঃ শান্তিময় চাকমা, মিঃ সুভাষসদয় চাকমা, মিঃ অংক্যাসিন চাক, মিঃ অরুণ কান্তি চাকমা এবং আমি নিজে। এ-ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর উপ-সহকারী রয়েছে। এরা মূলত এখানকারই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা পরীক্ষার্থী। সহকারীরা ও নয়িন্ত্রেণে মূল ছেলেমেয়েদেরকে ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে নীতি-নির্ধারণ পরিচালনা কমিটিকে সহযোগিতা করেন। উপ-সহকারীরা প্রকৃত প্রস্তাবে ছেলেমেয়েদের কোনো আচার-ব্যবহার নিয়ন্ত্রন করে না, তা সম্পন্ন করেন আবাসিক শিক্ষকবৃন্দ (ভান্তেরাও ছেলেমেয়দের কোনো শাস্তিমূলক আচরণ নিয়ন্ত্রন করেন না)। মোনঘরের আভ্যন্তরীণ যাবতীয় ব্যবস্থাপনা তত্ত্বাবধান করেন পরিচালক শ্রদ্ধালঙ্কার ভান্তে। ছেলেমেয়েদের পূর্বোক্ত পরিচালনা/ ব্যবস্থাপনা সহকারীদের কারো অনুমতি ছাড়া কখনও কোথাও বাইরে যেতে পারেনা (এ-রকম অনুমতি উপ-সহকারীরাও দিতে পারে না)। স্কুলে নিয়ম-মাফিক পড়াশোনা ছাড়া প্রতিটি ভবনে ভবন-তত্ত্ববধায়ক রয়েছেন। তারা ছেলেদের যাবতীয় অভাব-অভিযোগ, পড়াশোনা, আচার-ব্যবহার এবং কাজ-কর্মের দেখাশোনা, সম্প্রসারণ ও নিয়ন্ত্রণ করেন। বছরের শেষে, বার্ষিক পরীক্ষার পর এ আবাসিক ছেলেমেয়েরা মোট ১০ দিনের (জানু. ১-১০ পর্যন্ত) ছুটি পায়। এ সময়গুলোতে তারা বাবা-মা বা অন্যান্য আত্মীয়/ আত্মীয়াদের সাথে দেখা করে আসতে পারে। এ-ছাড়া প্রতিটি ভবনে শ্রেণী অনুযায়ী ২-জন শ্রেণী প্রতিনিধি এবং সব শ্রেণীর সমর্থিত ২ জন উচ্চ শ্রেণীর প্রতিনিধি রয়েছে। তারা শুধু মাত্র তাদের সহপাঠী ও সতীর্থদের কার্যকালাপ ও পড়াশোনা সম্পর্কে ব্যবস্থাপনা-সহকারীদের অবহিত করে। নিম্নে শিশুসদনের দৈনিক কর্মসূচীর তালিকা প্রদর্শিত হলো:

ভোর: ৫.৩০ শয্যাত্যাগ, সমবেত সঙ্গীত ও হাতমুখ ধোয়া, ৬.০০ বন্দনা, ৬.৩০ নাস্তা, ৭.০০ পড়া, ৯.০০ কাজ, ৯.৪৫ স্নান, ১০.০০ খাওয়া, ১০.৩০ স্কুল ।
বিকেল: ৪.০০ স্কুল ছুটি, ৪.৪৫ কাজ ও খেলাধুলা, ৫.৪৫ স্নান।
সন্ধ্যে ও রাত: ৬.০০ বন্দনা, ৬.৩০ খাওয়া, ৭.০০ -১০.০০ পর্যন্ত পড়া, ১০.৩০ শয্যাগ্রহণ, কিন্তু তাদের

দৈনিক এ-কর্মসূচী : ঋতু (Season) অনুযায়ী কিছু পরিবর্ত যোগ্য। এবার আমি মোনঘরের অন্যান্য বিষয়গুলোর বিবরণ তুলে ধরছি:

১. মোনঘর আবাসিক স্কুল (১ম-১০ম শ্রেণী/মানবিক বিভাগ ):
মোনঘর শিশুসদনের প্রধান বিদ্যাপীঠ, এককথায় প্রাণকেন্দ্র; এখানে ছেলেমেয়েরা শিক্ষক/ শিক্ষিকাদের তত্ত্বাবধানে পাঠ অভ্যাস করে, দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক ও মানুষের মতো মানুষ হওয়ার সৎপাঠ, সৎচিন্তা, সৎআচার, সৎউপদেশ, সৎগুণ- এক অর্থে মানবীয় মন্ত্র পেয়ে থাকে। কাজেই, ছেলেমেয়েদের উন্নতি-প্রগতি বিনির্মাণে স্কুলটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮০ সালে এ- স্কুলটি পরিপূর্ণভাবে চালু হয়। এর বর্তমান ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা ৪০০-র অধিক। এরমধ্যে বাইরের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৫০-৫৫ জন। বর্তমান শিক্ষকের সংখ্যা মোট ১৮ জন, যার তালিকা পূর্ব সংকলনে পত্রস্থ হয়েছে। স্কুলে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি শ্রেণীতে সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা গ্রহণ ছাড়া, মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ প্রতিটি শিক্ষকের জন্য আবশ্যকীয় এবং ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক। খেলাধুলা ও চিত্রাঙ্কনে ছেলেমেয়েদের জেলা/ বিভাগীয় পর্যায়ে যথেষ্ট সুনাম আছে। গত বছরই এখানকার স্থানীয় অধিবাসী মিঃ কান্ত চাকমা স্কুলের নামে একটি জলভাসা মাঠ প্রদান করেন এবং সেনাবাহিনীর আর্থিক সাহায্যে তা তৈরী হয়। খেলাধুলা পরিচালনায় আছেন মিঃ মঙ্গল কুমার চাকমা ও মিঃ অমল কুমার তালুকদার। স্কুলের পাঠাগারে ৪০০-এর বেশী শিল্প-সাহিত্য-ইতিহাস-বিজ্ঞান-কৃষি-সমাজ-ধর্ম ও জীবনীবিষয়ক এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গল্প-উপন্যাস-কাব্য রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকই শিশুতোষ এবং কিশোরপাঠ্য পুস্তক। উক্ত পাঠাাগারটি বর্তমানে আমারই তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। শ্রীমান বুদ্ধদত্ত শ্রামনের সম্পাদনায়, আমার তত্ত্ববধানে প্রতি মাসে বেরোয় দেয়ালিকা ‘মোনকধা’। প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজিত হয়। এতে ছেলেমেয়েরা তাদের স্বরচিত ও অন্যান্যদের রচিত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ পাঠ/আবৃত্তি করে, সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করে এবং বিতর্কে মেতে উঠে। তাদের এ-অনুষ্ঠান অবশ্য স্কুল কর্তৃপক্ষ আয়োজিত নয়- মোনঘর কর্তৃক। এতে স্কুলের শিক্ষকরাই বিশেষ দায়িত্বে উপস্থিত থাকেন। এ-রকম বিভিন্ন সময়ে মোনঘর খেলাধুলা প্রতিযোগিতারও আয়োজন করে থাকে। এ-ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় পর্ব, বিভিন্ন মনীষীর বার্ষিকী/জয়ন্তী উদযাপন ও বিভিন্ন সম্মানিত অতিথি আগমন উপলক্ষে এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এ-সবে ছাত্রছাত্রীরাই প্রধানতঃ অংশ নেয়। স্কুলের দ্বোতলা ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থা ইতিপূর্বে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সহায়তায় তাতে কনস্ট্রাকশন কাজ চলছে। পালি কলেজ ভবনের সামনে বর্তমানে অস্থায়ী স্কুল ঘর তৈরী হয়েছে এবং তাতে পড়াশোনা চলছে। মূল স্কুল ঘরের কনস্ট্রাকশন শেষ হলে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ চালু হবে। আর, সাথে সাথে একটি সম্পূর্ণ আলাদা হোস্টেল নির্মাণ করে দু-জন শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও পড়ানোর বন্দোবস্ত হবে।

২. মোনঘর তাঁত কেন্দ্র: এটি চালু হয় ১৯৮০-এ। মোনঘরের কয়েকজন ছেলের ঢাকা ও বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরই এর কাজ শুরু হয়। বর্তমানে এতে ১০টি তাঁত চালু রয়েছে, এর মধ্যে একটি সোম-অটো। এতে গামছা, লুঙ্গি, রুমাল, তোয়ালে, বেডসিট, দরজা-জানালার পর্দা, টেবিল ক্লথ, পিনোন, খাদি উৎপাদিত হচ্ছে। মোনঘরের ছেলেদের ব্যবহারের কাপড়ের চাহিদা পূরণই এর মূল লক্ষ্য। গত বছর হতে এর উৎপাদন যথেষ্ট
বেড়েছে। রাঙ্গামাটির আনন্দ বিহার এবং ঢাকায় এসব উৎপাদিত সামগ্রী বিক্রির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বিক্রয় স্থানের অপরিচিতের এবং অসুবিধার জন্য এর বিক্রি ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। স্থানীয় গ্রামের বেকার মেয়েরাও স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য ছেলেরা এখানে ৩ মাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরই নির্দিষ্ট বেতনে কাজে অনুপ্রবেশ করে। বর্তমানে এর কর্মচারী সংখ্যা ২০ জন, ইনস্ট্রাকটর মিঃ অরুণ কান্তি চাকমা এবং সহকারী ইনস্ট্রাকটর মিঃ হিরল কান্তি চাকমা।

৩. কৃষি বিভাগ: এগ্রিকালচার, হটিকালচার, গার্ডেনিং ও নার্সারী এ-বিভাগের অন্তর্ভূক্ত। এর অধীনে ২০ একর বাগান জমি ও ২৫ একর ধান চাষের জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ একর জলভাসা জমি। এ-সবে আনারস, কাঠাল, নারিকেল, সুপারি, লেমন, কলা, পেঁপে ও বিভিন্ন দামী কাঠের গাছ, উন্নতমানের ধান এবং মৌসুমী শাক-সব্জীর উৎপাদন চলে। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এর কাজ চলে। বর্তমানে এ-বিভাগে একটি কীটনাশক ঔষধের স্প্রে মেশিন, একটি পানি উত্তোলনের মেশিন রয়েছে। এর প্রধান কর্মী মোনঘরের ৩০০ শতাধিক ছেলেমেয়ে। তারা এর ইনস্ট্রাকটরের তত্ত্বাবধানে আধুনিক চাষ পদ্ধতি গার্ডেনিং, নার্সারী, সেচ পদ্ধতি সার ও ঔষধ
ব্যবহার, বীজসংগ্রহ ও বীজতলা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় কাজ শেখে। ছেলেমেয়েরা কৃষিক্ষেত্রে মোট ১ ঘন্টা কাজ করে, এটা তাদের জন্য বাধ্যমূলক। হালচাষ ও টুকিটাকি কাজের জন্য ৩ জন কর্মচারী রয়েছে। এ- বিভাগের ইনস্ট্রাকটর রাঙ্গামাটি হর্টিকালচার ও নার্সারী বিভাগের প্রাক্তন সুপারিনটেনডেন্ট মিঃ অজিত তালুকদার।

৪. সেলাই উলবোনা ও কোমড়তাঁত কেন্দ্র: এ-বিভাগটি পুরোনো। মোনঘরের শুরু থেকে এ-বিভাগের কাজ শুরু হয়েছিল। প্রধানতঃ ছেলেমেয়েদের শার্ট, পেন্ট, লুঙ্গি, জামা, ফ্রক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাপড় সেলাই-এর জন্য এ-বিভাগ। বর্তমানে এতে ৬টি মেশিন চালু রয়েছে।
ছেলেমেয়েরা প্রতিটি দলে ৬ জন করে এর শিক্ষানবীশ হয়। ইতিমধ্যে এ-বিভাগ থেকে মোনঘরের ৪ জন ছেলে শিক্ষাগ্রহণ করে সেলাই-এর উপর জীবিকা নির্বাহ করছে। এর ইনিস্ট্রাকটর মিঃ ভবতোষ চাকমা ও সহকারী মিঃ দ্বীজেন্দ্র বড়ুয়া। উলবোনা ও কোমড়তাঁত শুধুমাত্র মেয়েদের। উলবোনার জন্য মোট চারটি মেশিন রয়েছে। এর ইনস্ট্রাকটর মিসেস সূষমা চাকমা।

৫. কার্পেন্টি বিভাগ: গত বছরের শেষ দিকে এ-বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। মুলতঃ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ছেলে এবং উৎসাহী ছেলেরাই এর শিক্ষার্থী। বর্তমানে এতে নিয়মিত শিক্ষার্থী মাত্র ৩ জন।

৬. প্রকাশনা বিভাগ: গত বছর পবিত্র প্রবারণার দিনে প্রখ্যাত জাৰ্মান অর্থনীতিবিদ ই. এফ. শূমেকের Buddhist Economics এর বাংলা অনুবাদ — বৌদ্ধ অর্থনীতি’ (অনুবাদঃ মিঃ শান্তিময় চাকমা ও মিঃ মঙ্গল কুমার চাকমা ) প্রকাশের মধ্য দিয়ে এর শুভ উদ্ভোধন। এ-বিভাগ জাতক, ইতিহাস, ধর্ম, সমাজ, সাহিত্য বিষয়ে এবং মোনঘরের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র, পুস্তিকা ও সংকলণ প্রকাশ করবে। গত ফেব্রুয়ারিতে এ-বিভাগ Monoghar (Hill Home) নামে ১০ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। আগামীতে এ-বিভাগ ছোটদের গৌতম, অশোক, চাকমা জাতি এবং সমগ্র জাতক চাকমা ভাষায় অনুবাদের প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মোনঘর প্রেসের কাজ সম্পন্ন হলেএর কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে এ-বিভাগের দায়িত্বে রয়েছি আমি এবং আমার সহকারী মিঃ শান্তিময় চাকমা।

৭. চিকিৎসা কেন্দ্র: বর্তমান পরিচালক ভবন-সংলগ্ন ছোট ভবনটিই মোনঘরের চিকিৎসা কেন্দ্র। মূলতঃ এখানে প্রাথমিক চিকিৎসার জরুরী ঔষধ ও পথ্য সরবারাহ এবং রোগমুক্তির পর বিশ্রামের কাজ চলে। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসায় না ছাড়লে রাঙ্গামাটির ডাঃ ভগদত্ত খীসা, ডাঃ মিসেস মনীষা চাকমা ও ডাঃ এ. কে. দেওয়ানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা তাদেঁর চেম্বারেই ছেলেমেয়েদের চিকিৎসা করেন। বর্তম নে সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন রেভাঃ
সুদর্শী ভান্তে। তিনি প্রাথমিক চিকিৎসায় যথেষ্ট পারদর্শী। তাকে সাহায্য করার জন্য নিয়োজিত আছে ৫ জন ছেলে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গ্রামের গরীব দুঃস্থ অধিবাসীদেরও এখান থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধ বিনা মূল্যে দেয়া হয় ।

৮. পালি কলেজ: গত বছর একতলা বিশিষ্ট পাকা বাড়ীটি পালি কলেজ হিসেবে উদ্ভোধন করা হয়। এ-কলেজ থেকে সুত্ত, মধ্য ও উপাধি পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে এর নিয়মিত ও অনিয়মিত ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা ১৭২ জন। মূলতঃ পালিভাষা ও সাহিত্য বা ধর্মীয় ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞানার্জন, সচেতনতা, প্রচার ও প্রসার এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষায় রূপান্তরের এ-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় । মোট ৬ জন শিক্ষক ও ১১ জনের একটি
কার্যকরী কমিটি দ্বারা এর কাজ চলছে।

৯. পরিবহণ শাখা: মোনঘরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশী ক্লান্তিকর। পানির উচ্চতা যখন থাকে, তখন মূল শহর (তবলছড়ি/বনরূপা) থেকে মাত্র ২ টি নৌকায় আসা-যাওয়া বাজারের কাজ চলে।ভেদভেদীর চেঙ্গীভেলী প্রজেক্ট থেকে এর দূরত্ব প্রায় সোয়া এক মাইল এবং তাও কাচা রাস্তা এবং বন্ধুর। সুতরাং, এ-পথ দিয়ে যে কোন যানবাহন নিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ। কিন্তু, তবুও মাত্র ২ টি নৌকায় এর পরিবহণের কাজ চালিয়ে রাখতে হয়। এর ব্যবস্থাপক রেভাঃ আর্যলঙ্কার ভান্তে এ-ব্যবস্থা নিয়ে সবসময় ব্যস্ত ও দুশ্চিন্তায় থাকেন। পানির উচ্চতা কমতে কমতে প্রায় এক মাইল নিচে নামতে থাকে। এ-সময় আবার নৌকায় করে যাতায়াত করা খুব সহজ নয়। বাজার করা ছাড়া, মোনঘরের প্রায় ছেলেমেয়ে ও কর্মচারী বিকল্প পথ চেঙ্গীভেলী, কলেজ গেইট, কালিন্দীপুরের পায়ে হাঁটা রাস্তায় আসা-যাওয়া করে।

মোনঘরের বর্তমানের অন্যান্য বিভাগ/ শাখা কেন্দ্রসমূহ উল্লিখিত হল। এবারে ছেলেমেয়েদের আবাসিক ভবনের পরিচয় দেবো:

ক. আলোক ভবন: এ-ভবনে ১ম ও ২য় শ্রেনীর ছাত্ররা থাকে। বস্তুতঃ এ-ভবনে সবচেয়ে ছোটরাই থাকে। এ-ভবনের তত্ত্বাবধায়ক রেভাঃ আর্যলঙ্কার ভান্তে ও সহকারী মিঃ অরুণ কান্তি চাকমা ।

খ. করুণা ভবন: ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্রদের আবাসিক ভবন।

গ. বিহার এলাকা ভবন: ১০ম শ্রেণীর ছাত্ররা থাকে। উক্ত দু’টো ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মিঃ মঙ্গল কুমার চাকমা এবং সহকারী রেভাঃ ধর্মালঙ্কার
ভান্তে ও রেভা, কীর্তিলঙ্কার ভান্তে।

ঘ. বোধিভবন ও সম্প্রসারিত ভবন: মূল বোধিভবনে ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্ররা থাকে এবং সম্প্রসারিত ভবনে ৯ম শ্রেণীর ছাত্ররা থাকে। এর তত্ত্বাবধায়ক মিঃ শান্তিময় চাকমা।

ঙ. পরিচালক ভবন ( অস্থায়ী বালিকা ভবন): এ-ভবনে ১ম থেকে ৫ম শ্রেণীর ছাত্রীরা থাকে। মূলতঃ মোনঘরের আবাসিক ছাত্রীরা এখন প্রাথমিক স্কুলে পড়াশোনা করছে। আগামী বছর এদের কিছু ছাত্রী জুনিয়র স্কুলে পড়বে। পরিচালক রেভা. শ্রদ্ধালঙ্কার ভান্তে এর তত্ত্বাবধায়ক এবং তাঁর কার্যালয়ের পাশে এরা বর্তমানে অস্থায়ী হিসেবে আছে। পশ্চিম- দক্ষিণ দিকে বর্তমানে দ্বোতলা বালিকা ভবনের কনস্ট্রাশনের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। উক্ত পাকা দ্বোতলা বাড়ীর কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে সব বালিকারা ওখানে গিয়ে উঠবে।

চ. মৈত্রী ভবন: এ-ভবনে ৭ম ও ৮ম শ্রেণীর ছাত্ররা থাকে। মোনঘর ও স্কুলে এদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশী। এমন কি, শারীরিক সমতার দিক দিয়েও । বলা হয়ে থাকে যে, এ-ভবনের ছেলেরাই মোনঘর ও স্কুলের প্রাণ-প্রাচুর্যের প্রতীক, মোনঘরের যে কোন কাজ এরা না করলে বা মাঠে না নামলে অন্ততঃ প্রায়ই সব কাজই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ-ভবনের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আমি নিজেই রয়েছি। স্কুলের পূর্বদিকে প্রায় ১৫-২০ হাত নিচের খাদে ৫০ হাত দীর্ঘ ও ১৫ হাত প্রস্থের একটি লম্বা বাড়ী সহ তিনটি ছোট ঘর চোখে পড়ে। শনের ছাউনী দেওয়া উক্ত দীর্ঘ বাড়ীটি হলো ডাইনিং হল, একটি উনুন বা পাকাঘর এবং অপরটি এর কর্মচারীদের থাকার ঘর। এরা সবাইবড়ুয়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। এ-ছাড়া বর্তমানে পরিচালক ভবনের সামনে একটি নতুন ভবনের কাজ শুরু হয়েছে। সম্ভবতঃ এতে বিহার এলাকস্থ ভবনের ছাত্ররাই চলে আসবে। এর পাশেই কৃষি অফিস, নূতন স্টোর রুম ও ধান পাকা গোলার কাজ চলছে। ১ম- ১০ম শ্রেণীর ছাত্ররা একক কক্ষে থাকার এবং পড়াশোনা করার সুযোগ পায় না। তবে ম্যাট্রিক বা ইন্টারমিডিয়েট বা ডিগ্রি ক্লাশের ছাত্র বা পরীক্ষার্থী হলে তাদের জন্য আলাদা করে থাকার এবং পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। মোনঘরের সর্বপূর্বে মিলন বিহার বা ছেলেমেয়েদের প্রার্থনার মন্দির। এ-বিহারের বর্তমান অধ্যক্ষ রেভা. সুদর্শী ভান্তে (শিক্ষক)। দক্ষিণে প্রেসিডেন্ট ভবন ও গেস্ট হাউজ। এ- বাড়ীই মোনঘরের সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষনীয়। এর তলাটাই মাত্র পাকা। আর এর সর্বপশ্চিমে আবাসিক শিক্ষক কোয়াটার।

বর্তমানে পরিবার সহ মোট ৩ জন ( ৩ × ২ ঃ ৬) ও পরিবার ছাড়া মোট ৪ জন আবাসিক শিক্ষক ( ৬+৪ : ১০) রয়েছেন। মোনঘরের অন্যান্য কর্মচারীদেরও ( তাঁত, কার্পেন্ট্রি, কৃষি) এখানে আবাসিক কর্মচারী হিসেবে পরিবারসহ/ পরিবারছাড়া থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

অন্যান্য কার্যক্রম:

মোনঘরের বেশ কিছু সংখ্যক ছাত্র দেশের বিভিন্ন স্কুল ( মূলতঃ বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখায় ), কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। কারিগরী প্রশিক্ষণেও কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকায় রয়েছে। তাছাড়া গরীব/মেধাবী ছাত্রছাত্রীদেরকে নির্দিষ্ট হারে কিছু উপবৃত্তি এবং সমাজ সেবা ও ধর্মীয় প্রচার-প্রসারের জন্য এ-প্রাতিষ্ঠান সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ৪ মোনঘরের কার্যক্রম বর্তমানে সীমিত হলেও, ক্রমশঃ ব্যাপক আকার ধারণ করছে। আগামী ১৫-১০বছরের মধ্যে এখানে একটি কারিগরী স্কুল ও একটি সাধারণ কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারিগরী স্কুলের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে মোনঘরের বেশ কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী বর্তমানে বাইরে প্রশিক্ষণে রয়েছে।এ-ছাড়াও একটি মাস্টার টেইলারিং স্কুল ( এর প্রাথমিক প্রস্তুতি হিশেবে বর্তমানে ঢাকায় ২ জন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণে রয়েছে), একটি টাইপ রাইটিং ও শটহ্যান্ড রাইটিং কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পক্ষান্তরে তাঁত কেন্দ্র, সেলাই বিভাগ, কার্পেন্ট্রি শাখা ও কৃষিবিভাগসমূহ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমান সমস্যা:

মোনঘর প্রতিষ্ঠান বস্তুত এখনো তার শৈশব কাল অতিক্রম করেনি, সে-জন্য এর সমস্যাও অন্তহীন। আর এ-সমস্যাসমূহ প্রধানতঃ আর্থিক ও কর্মীর সদিচ্ছার অভাব। আর্থিক সমস্যার কারণে মোনঘরের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো উত্তম ও সুষম খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, পরিবহণ, পানীয়জল, পড়াশোনা গ্রহণ করতে পারছেনা। অপরদিকে, কর্মী ও কর্মীর সদিচ্ছার অভাবে স্কুলে ঠিকমতো পড়াশোনা ও গৃহীত অনেক পরিকল্পনা সুষ্ঠুভাবে গৃহীত হয় না। পানীয়জল ও চিকিৎসা ছাড়া উপরোক্ত সমস্যাগুলো হয়তো প্রতিষ্ঠান নুন্যতম দিতে পারছে। কিন্তু পানীয় জল এবং একজন স্থায়ী ডাক্তারের সমাধান এখন অত্যন্ত জরুরী বলে মনে হয়। আর, সদিচ্ছার কথা বলচিছ এ-জন্যেই যে, এখানকার সংশ্লিষ্ট শাখা, বিভাগ বা কেন্দ্রের সদস্য সহযোগীরা যদি ঐকান্তিক ভাবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতেন, তাহলে হয়তো এর অন্তহীন সমস্যা কিছু কমে যেতো।

মোনঘর সম্পর্কিত ধারণা:

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন যে, মোনঘর অর্থ কি? এবং এর নামকরণের পিছনে যুক্তিটা কি রকম?

চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী ‘মোনঘর’ শব্দের অর্থ জুমের (shifting cultivation) পাকা ফসল কেটে তোলার একটি অস্থায়ী ঘর । এই অস্থায়ী ঘরে চাকমারা তাদের সারা বছরের কঠিন-নির্মম পরিশ্রমে উৎপাদিত কাঙ্খিত ফসল (ধান, কাপার্স, তিসি, তিল ও বিভিন্ন তরিতরকারী) কেটে তুলে এবং মাড়াই শেষ করে গ্রামের স্থায়ী বাড়ীতে নিয়ে আসে। মোনঘরে তাদের এ-সময়কার অবস্থান প্রায় ( ২/৩ মাস) অত্যন্ত আনন্দের, গভীর প্রাণ-প্রাচুর্যের এবং ভবিষ্যৎ সোনালী সুখ-স্বপ্নে ভরপুর। তাদের এ-সমস্ত কর্ম আশা-আকাঙ্খার প্রতীক এখানকার শিশুসদন মোনঘর; এখানে যারা আশ্রয় পায়, তারা সাধারণ শিক্ষা, কারিগরী শিক্ষা; এককথায় সার্বিক শিক্ষাগ্রহণ বা লাভ করে। তাদের এ-শিক্ষাসম্পন্ন হলে তারা ফিরে পাবে বৃহত্তম বৈচিত্র সংসারের বৃহত্তর কর্মক্ষেত্র। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা এখানে অবস্থান করে বলেই সংসারে বাচার শিক্ষাঃ অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অর্জন করে।
অর্থাৎ, তারা এ-গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষনীয় সময়গুলোতে ভবিষ্যতে যথার্থ মানুষ হিসেবে বাচার সোনালী ফসলই আহরণ করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তাদের আহরণের পদযাত্রা একদিকে যেমন কঠিন সাধনা বা তপস্যায় ক্লিষ্ট, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যতের সুখ-সমৃদ্ধি ও প্রগতিতে আশান্বিত ও উদ্বেলিত।

উপসংহার:

মোনঘরের মতো এমন একটি বহুমুখী প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসাধারণের বহুদিনের প্রত্যাশার ফসল। কিন্তু সার্বিক ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা মোটেই সহজসাধ্য নয়। এরজন্য অসংখ্য বিবেকবান মানুষের বৈষয়িক ও মানসিক ত্যাগ যেমন ভাবে রয়েছে, তেমনি শ্রদ্ধেয় বিমলতিষ্য ভান্তে, শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞালঙ্কার ভান্তে ও শ্রদ্ধেয় আর্যলঙ্কার ভান্তের আত্মত্যাগও মুখ্য। এবং এখানকার সংশ্লিষ্ট সহযোগী কর্মচারী ও স্থানীয় অধিবাসীদের সহযোগীতাও কোনদিকে গৌণ নয়। সকলের আন্তরিক সাহায্য-সহযোগীতায় এর মূল সম্বল। তাই, মোনঘর সকলের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান। এতে সকলের যেমন দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে, তেমনি সকলের অধিকারও আছে। রবীঠাকুরে শান্তিনিকেতন, মহাত্মা পিয়রসন, এন্ড্রুজ, জিয়োসেপ্পে তুচ্ছি প্রমুখ বিদেশী এবং মহাত্মা গান্ধী, আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন, তেজেশচন্দ্র সেন, কুঞ্জলাল ঘোষের মত ব্যক্তি ও প্রতিভা পেয়েছিল। এঁরা তাদের প্রতিভা তাতে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁরা পয়সার দরে তাদের ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভা বিকোননি- বিকিয়েছেন একজন মহৎ মানুষের সংস্পর্শে থেকে অনেকগুলো মহৎ মানুষ তৈরী করে বিশ্বমানব সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে। এখন বলা চলে যে, ‘সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই।’ কিন্তু, এ-ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে একটি প্রতিষ্ঠানকে পিছিয়ে দেওয়া বা ধ্বংস করা আর অনেকজনের আত্মত্যাগ অস্বীকার করা। তা’হলে আমাদের এখানে কি শান্তিনিকেতনের মতো কোনো মহাত্মা-শুভাকাঙ্খী বা আত্মত্যাগী কেউ নেই? ব্যস্ততম যান্ত্রিক সভ্যতায় হয়তো এঁদের প্রজন্ম আর হয়নি, নতুবা হবার অপেক্ষায় আছে, হয়তো আছেও। ‘খোঁজ নিয়ে আসবে নয়, খুঁজে পেতে হবে।’- অন্তত এ-অবক্ষয়ের ক্রান্তিলগ্ন গুলোতে। রবীন্দ্রনাথতো প্রায় প্রত্যেককে খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই, কর্তৃপক্ষের এ-বিষয়টা একটু গভীরভাবে ভাবার অবসর নিশ্চয় আছে। আর আজকের বিশ্ব মেধা বা প্রতিভা এবং সদিচ্ছার মতো মানসিক শক্তিও যে টাকায় বিকোয়, তা কি একবারে ফেলনা? ফেলনা নয় হয়তো এ-জন্যেই যে, তাদরকেও পরিবারে বা অন্য কারোর বা কিছু দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয় বলেই । এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ কোনো দিক দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক হবেনা বলে ভরসা রাখি : মোনঘরের প্রধান প্রাণ কেন্দ্র যেহেতু স্কুলটি, সেহেতু স্কুলের শিক্ষক/ শিক্ষিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অন্য অনেকের চেয়ে কিছু বেশি- এই সহজ সত্যটা সম্পর্কে বোধকরি কারো দ্বি মত থাকবে না। শিক্ষকদের যেমন, তেমনি শিক্ষিকাদেরও। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে শিক্ষিকাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোনঘরের শতকরা ৭০ জন ছেলেমেয়ের বাবা-মা নেই। সেজন্যে তারা মাতৃস্নেহের মতো দুর্লভ ও কাঙ্খিত এবং মানসিক শক্তি বিকাশের প্রয়োজনীয় স্নেহ ও মমতা থেকে বঞ্চিত। এখানে তাদের এই রিক্ততা পূরণ করতে পারেন একমাত্র শিক্ষিকারাই মায়ের মাতৃত্ব দিয়ে-মায়া-মমতা-আদর-যত্ন-সেবা ও সান্ত্বনা দিয়ে। আমার মনে হয়, তাঁরা যদি এ-ব্যাপারে আরও একটু সচেতন বা সদিচ্ছা পোষণ করেন, তাহলে ছেলেমেয়েদের এই মানসিক অপূর্ণতা হয়তো থাকবে না। এ-ক্ষেত্রে শিক্ষয়িত্রীদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শান্তিনিকেতনে শিক্ষয়িত্রী বা গুরুপত্নীরাই ছেলেময়েদেরকে আপন সন্তানেরমতো আদর যত্ন করতেন, খাওয়াতেন, শিখাতেন এমনকি অসুখের সময় সেবা-শুশ্রুষা ছাড়াও অন্যান্য ক্ষতিকারক পরিবেশে ও মানসিকতা থেকে রক্ষা করতেন। বর্তমানে মোনঘরে যারা আবাসিক হিশেবে আছেন, তারা শিক্ষিকা ও শিক্ষয়িত্রী দুই-ই। কাজেই এ-গুরু দায়িত্ব তাদেরকে যথেষ্ট সদিচ্ছার সাথে গ্রহণ করতে হবে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় সদিচ্ছার প্রয়োজন এখানকার ছেলেমেয়েদের। মোনঘর কর্তৃপক্ষ নিজেকে, সমাজকে, বিশ্বকে জানার ও বোঝার এবং যথার্থ মানুষ হিসেবে বাঁচার যে নুন্যতম সুযোগ-সুবিধা নিশানা দেখিয়ে দিতে পারছেন- এটাই তাদের আন্তরিক উদযোগ চেষ্টা ও সদিচ্ছা খুঁজে পেতে হবে। বর্তমানের সামনে যা গ্রহণীয় ও শিক্ষণীয়, তা’ তাদেরকে সমস্ত অন্তর দিয়ে গ্রহণ করতে হবে। আর তাদের এ-গ্রহণের পথ হবে সত্য, সুন্দর ও ধর্ম পথের। মোনঘর প্রতিনিয়ত অফুরন্ত কাজের ক্ষেত্র- কিন্তু এ ক্ষেত্র থেকে তাদেরকে সোনালী ফসল, জীবনের অমৃত আরোহণ করতে হবে। জীবনের সব বয়সে, সবক্ষেত্রে থেকে যেমন বিদ্যা বা জ্ঞান শেখা বা চর্চা করা যায়, তেমনি সব কাজের মধ্য দিয়েও ভগবানকে ডাকা যায়- একথা তাদের সবসময় স্মরণ রাখতে হবে। তাই, আজ জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্রে অগ্রসর হই বুদ্ধ-ধর্ম- সংঘ : জ্ঞান-নীতি বা আদর্শ এবং একতাকে প্রণতি করে। আমাদের এই
আত্ম-উপলদ্ধির পূজাঃ সদইচ্ছা- সাধনা ত্যাগের সুফল সুনিশ্চিত।

লেখক: সুহৃদ চাকমা

১ম প্রকাশ: মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয় বার্ষিকী- ১৯৮৩ ইং।
তথ্যসূত্র: সুহৃদ চাকমার স্মারকগ্রন্থ (২০০৫)

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *