চাকমা জনপ্রিয় লোককাহিনী: রাধামন-ধনপুদি

প্রেমের উপর চাকমাদের যতগুলি কাহিনী এবং পালাগান আছে সেগুলির মধ্যে ধনপাদা গ্রামের রাধামন ও ধনপুদি নামক দুজন প্রেমিক প্রেমিকার অনবদ্য প্রেম-কাহিনী নিয়ে রচিত পালাগান “রাধামন-ধনপুদি” একটি অনন্য লোকগীতি।

চাক্‌মা সাহিত্যের এই জুটির নাম রাধামন-ধনপুদি। বিশ্ব সাহিত্যের যেমন চির প্রেমিক-প্রেমিকা হলো- লায়লা-মজনু, শিরীন-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েট জুটি তেমনি চাক্‌মা সাহিত্যেও চির প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি হলো রাধামন এবং তার অপূর্ব সুন্দরী প্রেমিকা ধনপুদি। চাকমা চারণকবি গেংগুলিরা এখনও দিনের পর দিন রাতের পর রাত তাদের নিয়ে রচিত পালাগান ‘রাধামন-ধনপুদি’ সাতদিন সাত রাত এক নাগারে উভাগীতের সুরে গেয়েও শেষ করতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে, চাকমা সাহিত্যের শেষ্ঠ রচনা হলো ‘রাধামন-ধনপুদি’। গেংগুলিরা যখন গ্রাম দেশে চাঁদনী রাতে বাঁশী কিংবা বেহালা বাজিয়ে রাধামন ধনপুদি পালাগান গায়, তখন যুবক-যুবতীরা মনের আনন্দে উল্লসিত হয়ে “এ-হো-হো-হো…” করে উল্লাস ধ্বনি (‘রেঙ’) দিয়ে গায়ককে উৎসাহিত করে। তখন সেই আনন্দধ্বনি পাহাড় থেকে পাহাড় পেরিয়ে দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে আর যুবক যুবতীদের মনে আনন্দের হিল্লোল তুলে তাদের হৃদয়কে সুখের তরঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। রাধামন-ধনপুদি কাহিনীর অনেকগুলি খন্ড, পর্ব এবং অজস্র শাখা-প্রশাখা রয়েছে। যেমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য খন্ড হলো – ১. জুমকাবা, ২. রান্যা-বেরাহ্, ৩. রানি-খুয়া, ৪. ঘিলাপারা, ৫. সনালি বার্গি-ধরা, ৬. ঘিলা-খারা, ৭. ফুল-পারা ইত্যাদি। এই ফুল-পারা খন্ডে রয়েছে রাধামন কর্তৃক ধনপুদিকে ফুল উপহার দেওয়ার কাহিনী ।

কাহিনীটি সংক্ষেপে নিম্নরূপ-

এক চাঁদনী রাতে আলোর বন্যায় যখন পৃথিবী ভাসছে তখন সদ্য যৌবনে পদার্পণ করা ধনপুদি এক অচেনা ফুলের খন্ডিতাংশ হাতে নিয়ে তার প্রেমিক রাধামনকে খুঁজছে। তার মন ঐ অপূর্ব ফুলটির সৌন্দর্যে ও সুবাসে মুগ্ধ। এমন একটি সুন্দর ও পরিপূর্ণ ফুল তার চায়। এ মুল্লকের শ্রেষ্ঠ যুবক রাধামন। সে ছাড়া আর কে এই ফুল এনে দেবে? ধনপুদি মনে মনে তাকে ভালবাসে। এই চাঁদনী রাতে তার মন আরও এক কারণে উথলা। সে শুনেছে কোন এক আদিধন না আদিচরণ নামক ভিন গাঁয়ের হতচ্ছারা এক মদখোর যুবক তাকে বিয়ে করার জন্য পাগল। আর তার বাবা জয়মঙ্গল ও মা কপুদিও তাকে আদিচরণের সাথে বিয়ে দেবার ব্যাপারে রাজী। এখন রাধামনই কেবল তাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে।

রাধামন কেবল ধনপুদির প্রেমিকই নয়, সে সারা দেশে যুবকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বীরও। আর আত্মীয়তার দিক থেকে তার মায়ের বড় বোন মেনকার পুত্র। মেনকার স্বামী নিলগিরিও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাই রাধামন ছাড়া কাউকেই আর তার পছন্দ নয়। ধনপুদি রাধামনের দেখা না পেয়ে প্রথম গেল তাদের নানা চলাবাপের কাছে। চলাবাপ গ্রামের প্রধান হলেও নাতি-নাতনীদের সাথে ঠাট্টা মশকরা ও রসিকতা করার ব্যাপারে তার মত জুড়ি নেই। সে ধনপুদিকে অভিসারিনী বেশে দেখেই বুঝে ফেললো হয়তো সে রাধামনকে খুঁজছে। কিন্তু সে তাই ঠাট্টার সুরে বললো, “ওরে প্রিয়ে, এখান থেকে কেটে পড়ো। এক্ষুনি তোমার নানী চলামা এলো বলে। সে ফুলটি দেখিয়ে বললো, – “নানা, আজ মা জুম থেকে ফিরার পথে এ ফুলটি কুড়িয়ে পেয়েছে। এ ফুলটি কেউই চেনে না, এটির কি নাম?

ধনপুদির মনের ভাব বুঝতে পেরে চলাবাপ নাতনীর সাথে রঙ্গ করার জন্য প্রথমে ঐ ফুলের নাম বলতে চাইলো না। সে ঐ অচেনা ফুলটি না চিনার ভান করতে লাগলো। কিন্তু তার নাতনী ধনপুদির কাকুতি মিনতি, রাগারাগি ও শেষ পর্যন্ত কান্নাকাটির হুমকির ফলে আর না জানার ভান করে থাকতে না পেরে বললো,

-“নাতনী, এ ফুল একটি সেরা ফুল। এ ফুল পারিজাত। এর নাম নাকশাফুল (নাগেশ্বর)। এ ফুল যে যুবতী যৌবনে লাভ করতে না পারে তার জীবনই বৃথা। যৌবনকালে তোমার নানীর জন্য সাগরের তীরের বৃক্ষ থেকে এমন ফুল কত এনে দিয়েছি। তোমাদের ভাগ্যই খারাপ। তোমাদের জন্য কোন যুবকই পশ্চিম দিকের পর্বত ফুগংতলী দ্যমুরাহ্ পেরিয়ে সাগরের তীরে গিয়ে গাছে গাছে ফুটে থাকা ঐ পারিজাত ফুল পেড়ে এনে দেবে না।

এ কথাগুলি চলাবাপ যখন বলে শেষ করলো তখন সে দেখলো ধনপুদি আর সেখানে নেই। ঐ অচেনা ফুলের নাম জেনে অনেক আগেই সে সেখান থেকে রাধামনের খোঁজে আবার বেরিয়ে পড়েছে। তখন তার খোঁপায় গুঁজা ছিল সেই অপূর্ব খন্ডিত ছিন্ন ফুলটি – নাকশাফুল! সে রাতে রাধামনও উথলা প্রাণে ধনপুদিকে খুঁজছিল। তার মনে ভয় এবার হয়তো সে ধনপুদিকে হারাবে। সেও শুনেছে কারা যেন তার বুক থেকে ধনপুদিকে ছিনিয়ে নিতে চায়। তখন তার মনে কত স্মৃতির ভীড়। সে ও ধনপুদি এক সাথে বড় হয়েছে। দিনে দিনে বেড়েছে তার সৌন্দর্য। সারা দেশে খুঁজলেও ধনপুদির মত আর একটি মেয়ে চোখে পড়ে না।

তার হৃদয় ও মন জুড়ে রয়েছে কেবল ধনপুদি, ধনপুদি আর ধনপুদি। সে চাঁদনী রাতে হঠাৎ করে ধনপুদি রাধামনকে খুঁজে পেল। তারপর শুরু হলো ঐ অচেনা ফুল পাবার কাকুতি মিনতি। তার আবদারে শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে রাধামন তাকে ঐ ফুল এনে দেবে বলে প্রতীজ্ঞা করলো। তবেই তার প্রেমিকা ধনপুদির বদন হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠলো। তবে রাধামন এত সহজে তার কথা রাখতে পারেনি। সে ফুল পাড়তে আজ যাবো, কাল যাবো করতে লাগলো। সে বছর ধনপুদির আর খোঁপায় নাক্‌শা ফুল গুঁজা বুঝি হলো না।

এদিকে আদিচরণের সাথে তার বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গেল। তাই আসন্ন বিচ্ছেদের বেদনায় দু’জন প্রেমিক প্রেমিকার হৃদয়ে নেমে এলো বিষাদের ছায়া। এমনি দুঃখের দিনে আবারও একদিন তারা তাদের আশৈশব, কৈশোর ও যৌবনের সাথী কৃঞ্জধন-কুঞ্জবি, মেয়াধন-মেয়াবি, ছেয়াধন-ছেয়াবি, ফুঝুকধন-ফুঝুকবি, নিলংধন-নিলংবি ও কামেচধন-কামেচ্‌বিকে নিয়ে দূর পাহাড়ের জুমে গেল। সেখান থেকে গেল আরো দূরে গভীর বনে, ঝর্ণা ধারে বন্য শাকসব্জী তুলতে আর ছোট্ট নদীতে বেতের তৈরি ত্রিকোণাকার বিশিষ্ট ফাঁদ ‘লুই’ দিয়ে মাছ ধরতে।

তখন ছিল চৈত্র মাস, আর ফুলের সময়। হঠাৎ ধনপুদির ‘লুই’য়ে ভেসে উঠলো- সেই অচেনা ফুলের পাপড়ি, সেই নাগেশ্বর। ধনপুদির রক্তে নতুন করে শুরু হলো উম্মাদনা। এ ফুল তার চাই-ই। সে মরিয়া হয়ে রাধামনকে চেপে ধরলো আজ তাকে নাক্শা ফুল পেড়ে এনে দিতেই হবে। রাধামন বললো, “এ ফুল সাগর তীরেই কোন বৃক্ষে ফুটেছে। হয়তো বাতাসের তোড়ে এ ফুলের পাপড়ি উড়ে নদীর জলে পড়ে এখানে ভেসে এসেছে। এ ফুল কাছে পিছে কোথাও নেই।”

রাধামন অনেক কথা বলে সেদিন ধনপুদিকে শান্ত করলো। তারপর তারা একদিন গ্রাম ছেড়ে রওনা হলে দূরে বহু দূরে। যেতে যেতে তারা পৌছলো ফুগংতলী দ্যমুরাহ্ পর্বতের পাদদেশে। শুরু হলো পাহাড় বেয়ে উপরে উঠা। এক পাহাড় উঠলেই আর এক পাহাড় দেখা যায়। সে পাহাড় উঠলেই আবারও এক পাহাড় এসে দেখা দেয়। তখন পূর্ব দিকে দূরে তাদের গ্রামকে ছবির মত দেখাচ্ছিল। এক সময় তারা পাহাড় বেয়ে যখন পর্বত শিখরে উঠলো তখন পশ্চিম দিকে তাকাতে চোখে পড়লো বিশাল সমুদ্র যেন অন্তহীন, কূল কিনারাহীন! তখন উত্তাল তরঙ্গগুলি তীরের উপর আছড়ে পড়ছিল। আর সেই সুউচ্চ তীরের গাত্রে পাহাড়ী ঢালে খুব উঁচুতে গাছে গাছে ফুটে আছে অপূর্ব সব নাকশা ফুল! কি সুন্দর তাদের সাদা পাপড়ি! আর সুন্দর হলুদ রঙের রেণু ফুলের বুকে!

ধনপুদির যুবতী হৃদয় ফুলের আশায় মাতাল হয়ে উঠলো। এক সময় তারা পাহাড় বেয়ে নিচে এলো। ফুল সব অনেক উপরে। তখন সন্ধ্যা। রাধামন সাগরের তীর থেকে একটু দূরে জলের মধ্যে যেখানে সাগরের জল কিছুটা কম, তাতে গাছ ও বাঁশ দিয়ে একটি জলটঙ্গী তৈরী করে ধনপুদিকে সেখানে রেখে আবার কূলে ফিরে এলো। এবার সে সাগরের সুউচ্চ তীর বেয়ে উপরে ওঠে প্রথমে পুষ্পবৃক্ষের নীচে এলো। এরপর সে গাছের উপরে উঠতে লাগলো। গাছের একটি ডাল গেছে তীর থেকে বেশ দূরে সমুদ্রের দিকে। সেই ডালেই ফুটেছে সেরা নাকশা ফুল। আজ সে ঐ ডাল থেকেই ধনপুদির জন্য সেরা ফুল পেড়ে এনে তার প্রতিজ্ঞা পূরণ করবে।

এমন সময় কোত্থেকে যেন এল এক দৈববাণী। হয়তো বা তার মনেই সংশয়ের সাথে যেন উদিত হলো সে দৈব বাণী – আজ যদি সে ধনপুদির জন্য ঐ ডালের দুর্লভ সব পারিজাত সম নাকশাফুল ছিঁড়ে তবে আজ তার নিশ্চিত মৃত্যু হবে। এদিকে জলটঙ্গীতে অপেক্ষারত ধনপুদির মনেও সেই একই ভাব এলো তাই সে সভয়ে বললো, “প্রিয়তম, নেমে এসো। তোমার মত ফুল থাকতে জগতে আমার অন্য কোন ফুল চায় না।”

আজ রাধামন দৃঢ়প্রতীজ্ঞ, জীবন যদি যায় তবুও সে ধনপুদির জন্য ঐ ফুল পেড়ে এনে দিয়ে তার প্রতিজ্ঞ পুরণ করবে। তখন জোর বাতাসে ফুলসহ ঐ ডাল দুলছিল। আর দুলছিল রাধামনের প্রেমিক হৃদয়ও, হয় ফুল, নয় মৃত্যু! রাধামন তড়িৎ গতিতে ধনপুদির জন্য এক জোড়া নাকশা ফুল ছিঁড়ল; অমনি দৈববাণী ফলে গেল। ঐ ডালে অজ্ঞাত স্থানে লুকিয়ে থাকা এক সাপ রাধামনকে ছোবল মারতেই সে ডাল থেকে ছিটকে সাগরে পড়ে গেল। আর সাগরে পড়ার মূহুর্তে ধনপুদির উদ্দেশ্যে বললো, -“প্রিয়ে, এই জীবনে আর আমাদের মিলন হলো না। বিদায়, প্রিয়ে বিদায়”।

ধনপুদি রাধামনের আর্তনাদ শুনে ও সমুদ্রে পতন দেখে তৎক্ষণাৎ সাগরে ঝাপ দিয়ে রাধামনকে বুকে জড়িয়ে ধরলো আর সাতার কেটে কূলে নিয়ে এলো। সে রাধামনের ক্ষতস্থানে বনের লতাপাতা লাগিয়ে, সারারাত সেবা শুশ্রূষা করে, ইষ্ট দেবতার উদ্দেশ্যে রাধামনের জীবনের জন্য প্রার্থনা করে তাকে ভাল করে তুললো। তখনও মুর্ছিত প্রেমিক রাধামনের মুঠোর মধ্যে ধরা ছিল সেই প্রিয় দুটি ফুল-নাকশা ফুল! অপরূপ! পারিজাত।

সারারাত রাধামন প্রেয়সী ধনপুদির কোলে অচৈতন্য অবস্থায় ছিল। সাগরের জলে, বনের ঔষধে আশ্চর্যজনক ভাবে আপনিতেই এক সময় বিষক্রিয়া থেমে গেল। আর পরদিন ভোরে যখন সে সুস্থ হয়ে চোখ মেললো, তখন দেখলো, উর্ধ্বে উন্মুক্ত আকাশ, সম্মুখে বিস্তীর্ণ বালুকাময় সমুদ্র সৈকত, দূরে সীমাহীন নীল জলরাশি, শিয়রে অপরূপা সে নারী ধনপুদি! রাধামন বহু আকাঙ্খার ফুলগুলি ধনপুদির হাতে তুলে দিল। তারপর তারা দু’জনে যখন গ্রামে ফিরলো তখন চারিদিকে শুরু হয়েছে বিঝু উৎসব। সবাই দেখলো, ধনপুদির খোঁপায় গুঁজা রয়েছে আশ্চর্য স্বর্গীয় পারিজাত ফুল নাকশা।

[সুগত চাকমার লেখা : ধনপুদিকে ফুল উপহার]
[বিপ্লব চাকমা সম্পাদিত : শুভলং ২০০১ইংদ্র:]

লেখক: সুগত চাকমা (ননাধন)

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *