রানী কালিন্দী রাণী

চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হলেও সমাজ নির্ধারিত স্থানীয় মধ্যে মহিলাদের অধিকারও স্বাধীনতা সুপ্রতিষ্ঠিত এবং এখনও বিদ্যমান। চাকমা জাতির উত্থান-পতন সময়েও মহিলাদের অবহেলা করা হয়নি। পাগলা রাজা সাত্তুয়ার কন্যা অঙ্গলি (নাম জানা যায়নি) রাজ্য হারিয়েও রাজ্য উদ্ধার করেন এবং দৃঢ়তার সহিত রাজ্য শাসন ও পরিচালনা করে ‘ধাবানা’ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করতঃ ১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ২০০ বৎসর চাকমা রাজ্য রক্ষা করার পথ সুগম করে যান।

রাজা ধরম বক্স খাঁ (১৮১২-১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দ) এর মৃত্যুার পর তার প্রথমা স্ত্রী রানী কালিন্দী রাণী মহিলা হয়েও ধর্য্যরে সহিত রাজ্য রক্ষা করে যান। রানী কালিন্দী রাণী পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪০/৪১ বৎসর ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নিজ হাতে রাজ্য শাসন করেন। বৃটিশ সরকার প্রথমত: গোলমাল ও চড়যন্ত্র করলেও শেষ পর্যন্ত ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে রানী কালিন্দী রানীকে সরাসরি সরকারী ঘোষণা মোতাবেক রাজ্যাভার দিতে বাধ্য হন। কাচালং এলাকার তালুকদার ও জমিদার লবন্দ খাঁ দেওয়ান এর স্ত্রীও ঈশান চন্দ্র দেওয়ানের মাতা শ্রীমতি ভেলুয়া দেওয়ান স্থানীয়ভাবে নয়, কলিকাতার বড় লাঠের (গর্ভনর জেনারেল) বাস ভবনে ভেলভেদিয়া রাজ প্রাসাদে নিয়মিত নিমন্ত্রণ আমন্ত্রণ লাভ করতেন।

অতি আধুনিক যুগেও চাকমা সমাজে মহিলাদের অবদান ও প্রতিপত্তি স্বীকার করতেই হবে। নানিয়ারচর থানার মিসেস্ বসুন্ধরা দেওয়ান, স্বামী মৃত্যুর পরও ছয়কুড়ি বিল মৌজার হেড্ম্যান চীপ ও নানিয়ারচর বাজারের বাজার চৌধুরীগিরি লাভ ও দক্ষতার সহিত দায়ীত্ব পালন করেন। পাহাড়ীদের হস্ত শিল্প ও বেইন টেক্সটাইল এর সংগঠক ও প্রচারক মিসেস্ মঞ্জুলিকা খীসার অবদান তথা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, সারা বাংলাদেশেও বিশ্বের খ্যাতি রয়েছে। উভয় মহিলা জেলা সদরে, অনেক সময় রাজধানী ঢাকার সরকারী সম্মেলন, সেমিনার ও মিটিং এ নিয়মতি যোগদান করতেন। তাদেরই পূর্ব পুরুষ পথ দিশারী মহামতি রানী কালিন্দী রানীর কৃতিত্ব ও প্রতিভা নিয়ে আলোচনা করা হল।

কাটাছড়ি গ্রামের জুমচাষী গুজং চাকমা ফুরমোন এলাকার সাপছড়ি পাহাড়ে নিয়মিত জুমচাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার ছোট্ট পরিবার ১ (এক) মেয়ে ১ (এক) ছেলে। মেয়ে বড় কিশোরী, ছেলে ছোট নাবালক। গুজং চাকমা স্ত্রীকে নিয়ে নিয়মিত জুমচাষের কাজে যান। সময় গতিকে কাজ বেশী থাকলে মেয়ে কালাবি চাকমাকেও সাথে জুমে নিয়ে যায়। পরিবারের ভাচ্য সুভাগ্য কখন, কিভাবে উদয় হয় কেউ জানেন না।

সেই দিন গুজং চাকমা কাজের ভিরে পরে মেয়ে কালাবিকে জুম কাজে নিয়ে যান এবং ভরা দুপুর পর্যন্ত কাজ করতে থাকেন। কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত কালাবি টং ঘরে (মাচাং) এ উঠে যায়। বিশ্রামান্তে সে সময় এক কিশোর বালক তৃঞ্চান্ত হয়ে পানি খাওয়ার আশায় ঐ টং ঘরে গিয়ে হাজির। চিনে পরিচয় নাই, পানি খেতেতো বাধা নেই। কিশোর বালকটি কালাবি থেকে পানি যাঞ্চা করেন। কালাবি অধ: মনে নারিকেলে হুলে (মালায়) বালকটিকে পানি দেন এবং মাথায় একটু উচু করে থাকায় বালকটির পানে। বালকটিও পানি নিতে গিয়ে বালিকাটির দিকে থাকায়। এইভাবে দুই যুগলের দুই চোক্কু মিলন, দেখা সাক্ষাত অলক্ষে প্রেম। জল পান করে দ্রুত স্থান ত্যাগ, মনে দুরু দুরু, প্রাণে কেমন কেমন। এই বালকটি আর কেউ নয়, মৃগয়ার আশা রাজা ধরম বক্স খাঁ।

রাজা ধরম বক্স খাঁ বাড়িতে গিয়া রাজপ্রাসাদে যান। রাজা নগরের ফিরে ওই ক্ষনিক্ষনে দেখা মুখকানি চোখের চাউনি দেখে অবয়ব খানি ভুলতে পারছেন না। অলোক্ষে যেন কথাটা মনের ভাবটা কাকেই বলেই পেললেন। তারপর কয়েকদিনের মধ্যে রাজ পরিবাবেরর লোকেরা কাটাছড়ি এসে ভুজং চাকমাকে দেওয়ান উপাধি দিয়া কালাবি ও তার পরিবারকে তার রাজানগরের রাজপ্রাসাদে নিয়ে যায় এবং কালাবিকে কালীন্দি রাণী নামকরন করে রাজা ধরম বক্স খাঁ হাতে শুভ পরিনয় সম্পাদন করে দেন বা বিয়ে দেন। এ ভাবে কালীন্দি রাণীর জীবন যাত্রা শুরু হলো।

বিয়ের সময় রাজা রাণীর প্রায় ঊভয়েই কিশোর বয়সী ছিলেন। ১৮১২/১৩ খ্রীস্টাব্দতে তাদের বয়স আনুমানিক যথাক্রমে ১৫/১৬ বৎসর ও ১২/১৩ বৎসর ছিল । বিয়ের পর রাজা ধরম বক্স খাঁ ১৮৩২ খ্রীঃ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং তিনি প্রায় ১৯/২০ বছর রাজত্ব করেন। রাজা ধরম বক্স খাঁ রাজত্ব ও রাজত্বকাল খুবই সংকটময় ছিল।

বৃটিশ সরকার ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতের সকল রাজ্য সমূহ হয় ধ্বংস নতুবা করায়ত্ব করার নানা কোশল অবলম্বন ও ষড়যন্ত্র আরম্ভ করেছেন। ১৭৫৭ খ্রীস্টাব্দে লর্ড ক্লাইভ ও বৃটিশ সরকার বাংলার নবাব সিরাজ উদ্দৌল্লাকে পরাজিত করে সমগ্র বাংলা অধিকার করলেও চট্টগ্রাম প্রদেশের পার্বত্য এলাকার চাকমা রাজ্যটি ১৮৬০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন নাই শুধু মুঘল আমলে দেয়ক পরিমান রাজ্বস্বেই সন্তুষ্ট ছিলেন। এই প্রথ্রা রাজা ধরম বক্স খাঁ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। রাজা ধরম বক্স খাঁ মৃত্যুর পর ১৮৩২ খ্রীঃ থেকে বৃটিশ সরকার আবান নতুন নতুন ফন্দি আতিয়া ষড়যন্ত্র মেতে উতেন।

১) রানী কালিন্দী রাণীর সাথে বিয়ের কয়েক বছর পর ও রানীর কোন সন্তান সন্তুষ্ঠি দেখা না দেওয়াই রাণী কালিন্দীর অনুমতি ক্রমে তার জ্ঞাতী ভগ্নী আতকবীর সঙ্গে রাজা ধরম বক্স খাঁ বিয়ে হয়।

দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহন করে ও রাজা সন্তান লাভ না করায় খুরোকুত্তে গজার সম্ভান্ত পরিবার দোলত খাঁ কন্যার কারিবীর সঙ্গে রাজা তৃতীয় বিবাহ হয়। তৃতীয় স্ত্রীর গর্বে শিখনবি ওরফে মেনকার জন্ম হয়। এতে রাজ পরিবারের ও রাজপ্রাসাদের আনন্দের জোয়ার এসে যায়। স্বপত্নী ও তিন রাণী হলেও রাণীদের প্রতি রাজা ধরম বক্স খাঁ এর আদর যত্ন ও ভালবাসা ক্ষমতি ছিল না। রাজার সংসার সুখের ছিল।

ধরম বক্স খাঁ মৃত্যুর পরে রাজ্যে নানা অরাজকতা ও অশান্তি দেখা দেয়। ইতিমধ্যে মেজ রানী আতকবী নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরন করেন এবং তৃতীয় রাণী কারিবী রানী কালিন্দীর সাথে কোন পরামর্শ না করে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে সোনাই ছড়িতে অস্থায়ী নতুন রাজবাড়ী নির্মান করে রাজকন্যা মেনকা নিয়ে পৃথক হয়ে যান এবং তথাই ওয়াংজা গজা খালা হাঙ্গার গুত্তি সম্ভুত জাতীয় বীর রনুখা দেওয়ানের প্রোপুত্র গোবীনেথ রাজকন্যার বিয়ে দেন। চলবে…..

রাজা ধরম বক্স খাঁ এর মৃত্যুর পর ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে সরকার ধরম বক্স খাঁ এর স্বপৌত্র শুকলাল খাঁ দেওয়ানকে ২৪২১/১৩ আনা ১১ পাই জমা দেওয়ার সত্বে পার্বত্য অঞ্চলকে অর্থাৎ চাকমা রাজ্যটি ইজারাদেন এবং পরে ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে আবার কালিন্দী রাণীর নামে ২৫২৩/২ আনা জমায় ইজারাদেন যাহা ২ (দুই) বৎসর পর্যন্ত বলবৎ ছিল।

ইতিমধ্যে রাণী কালিন্দী রাণী গর্ভনমেন্ট সমীপে পরলোকগত স্বামীর শাসন ক্ষমতা পাইবার প্রার্থনা করেন। পরিশেষে ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে মামলার জোড়ে সরকার রাণী কালিন্দী রাণীকে মৃত: স্বামীর যাবতীয় সম্পত্তির সরবরাহকারী সাব্যস্থ করেন এবং রাজ্যভার অর্পন করেন।

বিধবা নারী হয়ে একক বুদ্ধিতে ধুরন্দর শাসক ক্যাপ্টেইন লুইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া কম কৃতিত্বের কথা নয়। কোন দিকে সরকার এই মহিয়সী নারী সঙ্গে জয়ী হতে না পেরে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে চাকমা রাজ্যটি প্রথম তিন খন্ডে বিভক্ত করেন- উত্তর-পূর্ব অঞ্চল পানছড়ি তৈজং মিজোরামের সাথে- পশ্চিম-দক্ষিণ অঞ্চল ফটিকছড়ি, সীতাকুন্ড, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, কক্স বাজার চট্টগ্রামের সাথে জুড়ে দেন।

শুধু মধ্যভর্তি অঞ্চলটা চাকমা রাজ্য হিসেবে চিন্থিত করে দেন এবং ১৮৬৯ ইংরেজি সনে চাকমা রাজ্যটি আরও দ্বিতীয়বার তিন খন্ডে ভাগ করেন- চাকমা সার্কেল কর্ণফুলী ভেলী, রাঙ্গামাটি, বোমাং সার্কেল, বান্দরবান ও মং সার্কেল মানিক ছড়ি রামগড়। এই ভাবে ব্রিটিশ সরকার চাকমা রাজ্যটি প্রায় ধ্বংস করে দেন এবং চাকমা সার্কেল নাম দিয়ে সামান্য স্মৃতি চিহ্নটি রেখে দেন। রাণী কালিন্দী রাণী সরকারের বিরুদ্ধে বার বার প্রতিবাদ করেন এবং কলিকাতা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। রাণীর সকল আপিল অগ্রাহ্য করা হয়।

লেখক: কুমুদ বিকাশ চাকমা

তথ্যসূত্র: সম্বোধি বার্তা ৭, ৮

Spread the love
RannyePhul

Explore Chakma Literature, Culture & History

https://rannyephul.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *